ঢাকা, রোববার 21 April 2019, ৮ বৈশাখ ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সংগ্রামী তারুণ্যের প্রেরণা শাহীন

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

বাবা মারা গেছেন ৪ বছর বয়সে। দাদা ও নানার বাড়ির সকল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত এখন পর্যন্ত। অসহায় মা গরু, ছাগল, হাঁস, মুরুগি পালন ও মানুষের বাসায় কাজ করে বড় করেছেন তার দুই সন্তানকে। ছোট থেকেই মায়ের এ সকল কষ্ট দেখে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন রাজশাহী কলেজে অনার্সে পড়ুয়া ছাত্র শাহীন আলম।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা বেলপুকুরিয়া থানার ছত্রগাছা গ্রামের মৃত কামাল হোসেনের ছেলে শাহীন। তৃতীয় শ্রেণি থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হয়েছেন। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়নি। ক্লাস নাইনে থাকতে স্কুলের ড্রেস না পড়ে আসায় এক শিক্ষক বলেছিলেন ড্রেস কেনার টাকা নেই তো পড়াশুনা করার কি দরকার? বলার কারণ ছিলো শিক্ষকের আত্মীয়ের মেয়ে ক্লাসে সব সময় ২য় হয় আর শাহীন হয় প্রথম। ছোট থেকেই গ্রামে মানুষের জমিতে ধান লাগানো, ধান কাটা, পেঁয়াজ লাগানো, রসুন লাগানোসহ বিভিন্ন কৃষিকাজ করে পরিবার ও পড়াশনা চালিয়েছে শাহীন।

কয়েক বছর থেকে এলাকায় কৃষি জমির মালিকরা কৃষি জমি কেটে পুকুর খনন করায় কাজ কমে গেছে। তাই কাজের অভাবে উপায় না পেয়ে চার বছর থেকে চালাচ্ছেন ভ্যান গাড়ি। ছয় বছর আগে ড্রাগ কোম্পানি দরিদ্র্যতার কারণে শাহীন আলমের পরিবারকে একটি গরুর বাছুর দিয়েছিলো। সেই বাছুর পালন করে বড় করে বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকায়। পরিবারের জমানো টাকা বলতে এটাই। এর মাঝে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে কিনে ফেলেন একটি ভ্যান গাড়ি। বানেশ্বর, পুঠিয়া, শিবপুরসহ পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্নস্থানে নিজেই ভ্যান চালান। শত বাধা পেরিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় ৪.৪৪ এবং ইন্টারমিডেয়েট শেষ করে ৪.৪০ রেজাল্ট নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন শাহীন। কিন্তু  অসুস্থ মায়ের ওষুধ কিনতে কোচিং ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না হলেও চান্স পায় রাজশাহী কলেজে। ভূগোলে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও ব্যবহারিক ক্লাস বেশি থাকায় ভেবেচিন্তে ভর্তি হয় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে। অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে ভোরে ঘুম থেকে উঠে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শাহীন। হাটের দিনগুলোতে ভাড়া বেশি হয় তার। এদিকে কলেজের ক্লাস ধরেত হবে। নিয়মিত ক্লাস না করতে পারলেও ৭০% ক্লাস করার নিয়ম।

প্রতি সপ্তাহে হাটের দিন বাদে অন্য দিনগুলোতে সকাল নয়টা পর্যন্ত কাজ শেষ করে চলে আসে বানেশ্বরে। কলেজ বাসে ধরে যায় রাজশাহী কলেজে যায় ক্লাস করতে। বিকেলে আবারো ভ্যান চালাতে হবে তাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া হয় না। দুপুরে বাসায় এসে খাবার খেয়ে আবারো ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শাহীন আলম। ভ্যান চালানোর ফাঁকে ফাঁকে করে চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশুনা। সকালে বিকেলে ভ্যান চালানোয় রাতে শরীর থাকে ভীষণ ক্লান্ত। পড়তে বসলে ঘুম চলে আসে। তবুও রাতে কয়েক ঘণ্টা পড়ে ঘুমিয়ে পড়তে হয়।

শাহীনের বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়। বাসায় অসুস্থ মা আর মানসিকভাবে অসুস্থ ছোট ভাই। পরিবারের সকল কিছু একাই সামলাতে হচ্ছে তাকে। মায়ের ওষুধ কেনা, নিজের পড়াশনার খরচসহ গোটা পরিবার চালাতে হচ্ছে। অন্যদিকে পড়েছে ভিন্ন সমস্যায়।বাসাবাড়ির জমি না থাকায় ঘর এখন অন্যের ভিটায়। ভিটার মালিক ভালো হলেও এখন এক চক্র জমিটি কিনে নেবার উদ্যোগ নিয়েছে।

তাই থাকার জায়গা নিয়েও আচ্ছে দুশ্চিন্তা। আর একবছর পরেই শেষ হবে অনার্স পরীক্ষা। অনার্সের পড়ার সাথে সাথে চাকরির পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে শাহীন। বিকেলে ভ্যান চালানোর ফাঁকে বানেশ্বর বাজারে শিখছে কম্পিউটার। বাসায়ও ভ্যান চালানোর ফাঁকে ফাঁকে কলেজের পড়ার পাশাপাশি শুরু করেছে টুকটাক চাকরির পড়াশুনা। টাকার অভাবে অসুস্থ মাকে নিয়ে পড়েছে ভীষণ দুশ্চিন্তায়। আশায় আছে অনার্স পাস করেই ছোটখাটো একটি চাকরির বা ব্যবসার। অনার্স পাস করে যেন তাকে আর ভ্যান চালাতে না হয়।

শাহীনের হাইস্কুলের শিক্ষক ছত্রগাছা হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানালেন, ‘ছেলেটির বাবা ছোটকালেই মারা গেছে। সে আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিলো। ছোট থেকেই খুব মেধাবী ছিলো। প্রতিটি ক্লাসে সে প্রথম থাকতো। ছোটকালে দেখতাম মানুষের জমিতে কাজ করে পড়াশুনা ও পরিবারকে চালাতে। এখন মা ও ছোট ভাইসহ পরিবারের তিন জনের সকল কিছু তার কর্মেই চলছে’।

বর্তমানে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে তার বিষয়ে জানালে আর্থিক সহযোগিতা ও কলেজে একটি বৃত্তির আশ্বাস দিয়েছে রাজশাহী কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর হবিবুর রহমান।সমাজের বিত্তবানদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সূত্র: সোনার দেশ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ