ঢাকা, মঙ্গলবার 2 April 2019, ১৯ চৈত্র ১৪২৫, ২৫ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বৈচিত্র্যের ঐক্যচেতনাই মানবিক

আমরা তো সমাজবদ্ধ হয়েছিলাম মানবিক প্রয়োজনে, মানবিক চেতনায়। মানবিক চেতনা লুপ্ত হয়ে গেলে সমাজ আর সমাজ থাকে না, ফলে ফুরিয়ে যায় সমাজের গুরুত্বও। আমরা এমন এক সময়ে একথা উচ্চারণ করছি, যখন জনপদের-সমাজ এবং বিশ্বসমাজ প্রশ্নবিদ্ধ। বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় আমরা উপলব্ধি করেছি মানবিক চেতনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অগ্নিনির্বাপণ কাজে এগিয়ে এসেছিল পঞ্চম শ্রেণীর ছোট্ট শিশু নাঈমও। জীর্ণ বস্তিতে বসবাস করলেও মানবিক চেতনায় সে ছিল উজ্জ্বল। ফলে ফায়ার সার্ভিসের পানির পাইপের লিকেজে পলিথিন পেঁচিয়ে সে অগ্নিনির্বাপণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে উদ্যমী হয়েছিল। পঞ্চম শ্রেণীর এই দরিদ্র শিশুটি আর কীইবা করতে পারে? সে তো তার মত করে এগিয়ে এসেছে। মানুষের প্রয়োজনে, সমাজের প্রয়োজনে আমরা সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসি, তাহলে আমাদের সমাজের চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে। তখন হয়তো আমরা বলতে পারবো, মানুষ মানুষের জন্য।
মানবিক চেতনার প্রকাশ আমরা লক্ষ্য করেছি নিউজিল্যান্ডের দুই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়ও। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীসহ সাধারণ মানুষ মজলুম মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ছিল তাদের স্পষ্ট উচ্চারণ। তার পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদ। যার গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছিলেন প্রিয়তমা স্ত্রী, তাকে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়েছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বললেন, ‘মানুষ আমার কাছে জানতে চাইছে, স্ত্রীর খুনীকে আমি কীভাবে ক্ষমা করতে পারলাম? এই প্রশ্নের অনেক জবাব আমি দিতে পারি, সে সবের দরকার নেই। মহান আল্লাহ বলেছেন- আমরা যদি একে অন্যকে ক্ষমা করি, তিনি আমাদের ভালবাসবেন। মানুষের কত ধর্ম, কত বর্ণ, কত সংস্কৃতি। কিন্তু সব মানুষই এক একটা ফুলের মতো। আর সবাই মিলেই আমরা একটা সুন্দর বাগান।’ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারানো বাংলাদেশী হোসনে আরা আহমেদের স্বামী ফরিদ আহমেদ। তাঁর বক্তব্য হৃদয় ছুঁয়ে যায় নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের। ২৯ মার্চ শুক্রবার তারা সবাই জড়ো হয়েছিলেন ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি পার্কে। হামলায় হতাহতদের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় স্মরণসভা। এতে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষ। জেসিন্ডা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিশ্ব এখন উগ্র সন্ত্রাসবাদের চক্রে আটকে গেছে, তবে এর সমাধান মানবতার মাঝেই নিহিত।’
ফরিদ আহমেদের বক্তব্যে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ সুরটাই ধ্বনিত হয়েছে। আর জেসিন্ডা বললেন, মানবতার মাঝেই সমাধান। আসলে ‘বৈচিত্র্যের-ঐক্য’ চেতনার মধ্যেই রয়েছে মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাসের নিশ্চয়তা। বৈচিত্র্যের ঐক্যকে মেনে নিলে দূর হতে পারে সন্ত্রাস ও বর্ণবাদের উগ্রতা। মানুষের মধ্যে চিন্তা-চেতনা, ধর্মবিশ্বাস তথা জীবনদর্শনে পার্থক্য থাকতে পারে। জোর করে কারো মতাদর্শ পাল্টানো যাবে না। অন্তর্নিহিত গুনে যেটা টিকে থাকবার, সেটাই টিকে থাকবে। এই সহিষ্ণুতা মানবিক এবং এটাই মানবতার পথ। স্বয়ং ¯্রষ্টা যখন তার বিরুদ্ধাচরণকারীদেরও আলো-বাতাস এবং খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তখন আমরা ভিন্নমতকে দাবিয়ে রাখার কে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ