ঢাকা, বুধবার 3 April 2019, ২০ চৈত্র ১৪২৫, ২৬ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সবকিছুতেই রাজনীতি

গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে সংঘটিত অগ্নিকান্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়ে নোংরা দলীয় রাজনীতি করার চেষ্টা হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভবনের মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ফ্লোরে অবস্থিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ বেছে বেছে বিশেষ দু’জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে এরই মধ্যে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, তারা বিএনপি করেন। অর্থাৎ পুলিশ তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রেফতার করেছে। অন্যদিকে ভবন এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা নাকি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মি বলে ছাড় পেয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, রেডিও, টিভি ও দৈনিক পত্রিকার মালিক হলেও এবং সেগুলোর নিয়মিত কার্যক্রম চালু থাকলেও পুলিশ নাকি তাদের খুঁজে পাচ্ছে না!
এটা অগ্নিকান্ডকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহের একটি দিক। ওদিকে আসল দলীয় রাজনীতি শুরু হয়েছে সাহসী বীর হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠা পঞ্চম শ্রেণির দরিদ্র ছাত্র নাইম ইসলামকে নিয়ে। বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন নেভানোর চেষ্টা চালাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা যখন হিমশিম খাচ্ছিল, ঠিক তেমন এক কঠিন সময়ে নাইমকে ব্যস্ত দেখা গেছে ভিন্ন ধরনের এক চেষ্টায়। ফায়ার সার্ভিসের পানির পাইপ ফেটে বা ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে সব পানি বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেটা দেখে শিশু নাইম রাস্তা থেকে পলিথিন যোগাড় করে আনে এবং সে পলিথিন দিয়ে পাইপ চেপে ধরে বেরিয়ে যেতে থাকা পানি আটকানোর চেষ্টা করে। এতে অনেকাংশে কাজও হয়। সব পানি পাইপ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেনি। এর ফলে আগুন নেভাতেও অনেক সাহায্য হয়েছিল।
সেই থেকে নাইম নামের শিশুটিকে নিয়ে সারাদেশে আলোড়ন ওঠে। গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তার বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসের প্রশংসা চলতে থাকে। খবর জেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন বাংলাদেশি শিশুটিকে তার লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য পাঁচ হাজার ডলার বা প্রায় চার লাখ টাকা উপহার দেয়ার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণাও আলোড়ন তোলে। আরো অনেকেই শিশুটিকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে থাকেন। আর ঠিক তখনই শুরু হয় নোংরা দলীয় রাজনীতির। আওয়ামী লীগ করেন এমন একজন অভিনেতা শিশু নাইমের একটি ইন্টারভিউ নেন এবং জিজ্ঞাসা করেন, এত টাকা দিয়ে সে কি করবে? টিভি দর্শকদের স্তম্ভিত করে নাইম উত্তর দেয়, সম্পূর্ণ টাকা সে এতিমখানায় দান করে দেবে! এবার ওই আওয়ামী অভিনেতা অমন চিন্তা ও সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চান। শিশুটি জবাব দেয়, এতিমখানায় দান করবে কারণ বেগম খালেদা জিয়া এতিমখানার অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। মেরে খেয়েছেন!
আবারও আলোড়ন ওঠে সারাদেশে। দরিদ্র নাইমকে দিয়ে নোংরা রাজনীতি করানোর অভিযোগে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। জীবন নাশের কথিত হুমকিতে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন আওয়ামী অভিনেতা। নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এমনকি তার প্রাণ বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানান। অন্যদিকে অন্য কয়েকটি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে শিশু নাইমের কাছে এতিমখানার অর্থ আত্মসাৎ এবং বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কিত বক্তব্যের কারণ জানতে চাওয়া হয়। জবাবে সে সরাসরি বলেছে, কথাটা বলার জন্য তাকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল! শিশু নাইমের এ ইন্টারভিউটিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তোলে এবং ‘ভাইরাল’ হয়। সমাজের বিবেকবান সকল মানুষই শিশু নাইমকে নিয়ে রাজনীতি করার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়েছেন।
আমরাও মনে করি, দরকার যখন ছিল অগ্নিকান্ডে নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া এবং সরকারের কাছে সাহায্যের জন্য দাবি জানানো, একজন আওয়ামী অভিনেতাকে দিয়ে তখন অত্যন্ত ঘৃণ্য কাজ করানো হয়েছে। আমরা এভাবে দলীয় রাজনীতি করার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। উল্লেখ্য, একই শিশু নাইম এবং তার মা ও মামাসহ স্বজনরা জানিয়েছে, দরিদ্র বলে তাদের নগদ অর্থের খুব প্রয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর ঘোষিত পাঁচ হাজার ডলার বা চার লাখ টাকা পেলে তাদের অনেক উপকার হতো। অন্যদিকে একজন অভিনেতাকে দিয়ে আওয়ামী রাজনীতি করানো হয়েছে বলে ওই প্রবাসী তার সাহায্যের ঘোষণা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কোনো দল রাজনীতি করবে জানলে তিনি সাহায্যই করতে চাইতেন না। তাছাড়া এতিমখানাকেই যদি দিতে হয় তাহলে দেয়ার কাজটুকু তিনি নিজেও করতে পারেন। অর্থাৎ কেবলই নোংরা দলীয় রাজনীতির পরিণতিতে একজন দরিদ্র শিশু প্রায় চার লাখ টাকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
আমরা মনে করি, দরিদ্র শিশু নাইমের এই ঘটনা থেকে সকলেরই শিক্ষা নেয়া দরকার। সেই সাথে দরকার প্রতিটি বিষয়ে রাজনীতি করা থেকে বিরত থাকাও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ