ঢাকা, বৃহস্পতিবার 4 April 2019, ২১ চৈত্র ১৪২৫, ২৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দেশ পানি বিপর্যয়ে

শুকনো মওসুমের শুরু হতে না হতেই পানির অভাবে সমগ্র উত্তরাঞ্চলে কৃষির সেচকাজে ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটেছে। যমুনা, ঘাঘট, তিস্তা, করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্রসহ ১৫টি নদ-নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ায় মাইলের পর মাইলজুড়ে শুধু বালুভূমি ছাড়া এখন আর কিছুই চোখে পড়ে না। সব নদ-নদীর গতিপথ বন্ধ হয়ে গেছে। নদী নির্ভর সেচ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটায় ইরি-বোরো মওসুমে কৃষকরা পড়েছে চরম বিপাকে।
গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, অন্যান্য বছর বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত নদ-নদীগুলোতে কিছুটা পানি থাকলেও চলতি বছরের ফাল্গুণ মাসের শুরু থেকেই হঠাৎ পানি কমতে শুরু করেছে এবং বৈশাখের অনেক আগেই সকল নদ-নদী শুকিয়ে বালুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ১৫টি নদ-নদীর কোনো একটিকেই এখন শুকনো ও সরু খাল ছাড়া আর কিছু বলার উপায় নেই।
এমন অবস্থায় ইরি-বোরো সেচকাজ তো বাধাগ্রস্ত হচ্ছেই, একই সঙ্গে নদ-নদীর মূল গতিপথেরও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, জামালপুর ও সারিয়াকান্দিসহ বেশ কয়েকটি জেলার নদীপথ এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। লঞ্চ তো বটেই, চলাচল করতে পারছে না এমনকি ট্রলার এবং সাধারণ নৌকাও। ফলে ব্যবসা ও চাকরিসহ কোনো কাজেই স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করতে পারছে না মানুষ। কোনো কোনো এলাকায় যাতায়াতের জন্য ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও বালুর কারণে সেটাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ওদিকে মারাত্মক নাব্য সংকটের কারণে চারদিকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর।
এভাবে সব মিলিয়েই উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার লাখ লাখ মানুষের জীবনকে চরম বিপদ ও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও গাইবান্ধার বালাসিঘাট থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজীবপুর, কর্তিমারী এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ ঘাট, ঘুটাইল ও ইসলামপুর পর্যন্ত বছরের এই সময়ে নৌ চলাচল থাকতো স্বাভাবিক। ইরি ও বোরোসহ সব ফসলের চাষাবাদেও সেচের সুবিধা পাওয়া যেতো।
কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে অবস্থায় ব্যাপক এবং ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন ঘটেছে। গজলডোবার উজানে তিস্তা-মহানন্দা খালের মাধ্যমে দুই হাজার ৯১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধের ভেতরে পানি পবেশ করে। এই বিপুল পরিমাণ পানি দিয়ে বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, কুচবিহার ও মালদহ জেলার দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হয়।
ফারাক্কা, তিস্তা, গজলডোবা ছাড়াও ভারত বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ছোট-বড় আরো অনেক বাঁধ নির্মাণ ও চালু করেছে। এসব বাঁধের কারণেই শুকিয়ে গেছে বাংলাদেশের ১৫টি নদ-নদী।
অভিন্ন ও সীমান্তবর্তী নদ-নদীর ব্যাপারেও ভারত একই নীতি ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এসব নদ-নদীর কোন্্টিতে বাংলাদেশ বাঁধ নির্মাণ বা ড্রেজিং করতে পারছে না। ভারতের গজলডোবা বাঁধের কারণে যমুনার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। তিস্তা, মহানন্দা, মনু, কোদলা, খোয়াই, গোমতি ও মুহুরিসহ আরো অন্তত ১৫টি নদ-নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। এভাবে ফারাক্কার পাশাপাশি ছোট-বড় বিভিন্ন বাঁধের মাধ্যমে ভারত পানি সরিয়ে নেয়ায় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় অভিন্ন ৫৪টির মধ্যে ৪০টি নদ-নদী শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এখন পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। বর্তমান সময়েও বাংলাদেশ ভারতের একই নীতি ও কৌশলেরই অসহায় শিকারে পরিণত হয়েছে।
আমরা মনে করি এবং একথা আগেও বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে যে, সর্বব্যাপী পানি সংকটের এই ক্ষয়ক্ষতি থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে উজান থেকে আসা নদীগুলো থেকে ন্যায্য হিস্যা লাভে বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়া দরকার। এ ব্যাপারে দেশপ্রেমিক সব রাজনৈতিক দলগুলোকেই উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের এই সুবিধা স্পেনসহ অনেক রাষ্ট্রই বিভিন্ন সময়ে আদায় করেছে। সরকার পানি বণ্টনের বিষয়টি দ্রুত সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আমরা চাই, উত্তরাঞ্চল যেন মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার করুণ পরিণতি বরণ না করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ