ঢাকা, বৃহস্পতিবার 4 April 2019, ২১ চৈত্র ১৪২৫, ২৭ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সহিষ্ণুতার মাঝেই মানবতা এবং সমাধান

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় সারাদেশের মানুষ শোকে স্তব্ধ। ক’দিন আগেও যে ভবনটি মানুষের কোলাহল ও কর্মচাঞ্চল্যে ছিল মুখরিত, সেই ভবনটি এখন স্তব্ধ। ভবনজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ এবং শোকগাঁথা। পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, অনেক করুণকাহিনী। ‘নব বিবাহিতা মিথি এখন না ফেরার দেশে’, ‘আমি আর বাঁচব না, আমার জন্য দোয়া করিও বাবা, ‘পুড়ে অঙ্গার ফজলে রাব্বি, জাফরের বাড়িতে মাতম’- এগুলো হলো প্রতিবেদনের শিরোনাম। অগ্নিকাণ্ডের পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসছে নানা অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার চিত্র। যেমন ‘এফআর টাওয়ারটি ভুল নকশার ফসল’; ‘অগ্নিসংকেত বাজেনি, তীব্র ধোঁয়ায় প্রাণহানি’; ‘অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বনানী এফআর টাওয়ারে’। ‘সাড়ে ১১ হাজার ভবন ঝুঁকিতে’- এসবই হলো দায়িত্বহীন আচরণের শিরেনাম। জানিনা, এতবড় মর্মান্তিক ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ববোধের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন ঘটবে কিনা। আর যারা কর্তৃপক্ষ আছেন, তাঁদেরও নিজেদের কাজের মান উন্নয়নে পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
মন খারাপ করা বাস্তবতার মধ্যেও আশাবাদী হওয়ার মত ঘটনা আছে। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অসীম সাহস আর বুদ্ধিমত্তার গুনে শুধু নিজে নন, ৩০ জন সহকর্মীকে নিয়ে বেঁচে ফিরেছেন বকুল নামের একজন। হতাশার ভুবনে এমন উদাহরণ আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারে আশাবাদের বাতাবরণ। আশাবাদের আরো ঘটনা আছে। মানবিক কাজের জন্য পুরস্কার পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের সেই আলোচিত শিশু নাঈম। গত বৃহস্পতিবার এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের নির্বাপণ তৎপরতার সময় পানির পাইপের লিকেজে পলিথিন পেঁচিয়ে ধরেছিল শিশু নাঈম। এই দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ফেসবুকের নিউজফিডে ঘুরেফিরে এই ছবি আসে। পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র নাঈমের এই কাজ দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ওর মানবিক কাজে খুশি হয়ে উপহারস্বরূপ ৫ হাজার ডলার প্রদানের ঘোষণা দিলেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের যুবক ওমর ফারুক সামি। পাশাপাশি দরিদ্র বস্তিবাসী নাঈমের পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়ার কথাও জানালেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সামি।
মানবিক উপলব্ধির কারণে পুরস্কৃত হলো শিশু নাঈম। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ পরিবেশের মধ্যেও বিজয়ী হলো মানুষের মানবিক চেতনা। এমন চেতনা যেমন প্রয়োজন বনানীর এফআর টাওয়ারে, তেমনি প্রয়োজন আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়, শাসন-প্রশাসনে এবং বিশ্বসভ্যতায়ও।
তবে মানবিক শিশু নাঈমকে নিয়েও রাজনীতি করা হলো। পঞ্চম শ্রেণির এই দরিদ্র শিশুর জটিল রাজনীতি বোঝার কথা নয়।  টিভি উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় শিশু নাঈমের সাক্ষাতকার নেয় এবং তারপরই সৃষ্টি হয় বিতর্ক এবং প্রশ্ন। সাক্ষাতকারে নাঈম জানায়, সে পুরস্কারের অর্থ এতিমখানায় শিশুদের দান করতে চায়। এর কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, কয়েক বছর আগে বেগম খালেদা জিয়া এতিমদের টাকা লুট করে খেয়েছেন তাই এই টাকা সে এতিমদের দিতে চায়। কিন্তু এর পরে এক সাংবাদিক তার সাক্ষাতকার নিলে সে জানায়, নিজের লেখাপড়ার জন্য তার অর্থ সাহায্য প্রয়োজন। নাঈম  আরো জানিয়েছে, জয়ের সাক্ষাতকার অনুষ্ঠানে তার এতিমখানায় অর্থদান করার বিষয়টি আগেই তাকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল। ভাবতে অবাক লাগে, রাজনীতি এমন নিকৃষ্ট হয় কেমন করে? মানবিক একটি শিশুকে নষ্ট করার এ কেমন প্রয়াস? এমন তৎপরতায় তিক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছেন পুরস্কার ঘোষণাকারী ওমর ফারুক। তিনি বলেছেন, পুরস্কারের  টাকা যদি শিশুটি এতিমখানায় দিতে চায়, তবে সেই কাজটি আমিই  করতে পারবো। নষ্ট রাজনীতি শিশু নাঈমের ক্ষতি করলো। তবে ওর মানবিক চেতনাকে আমরা এখনো সম্মান করি।
আমরা তো সমাজবদ্ধ হয়েছিলাম মানবিক প্রয়োজনে, মানবিক চেতনায়। মানবিক চেতনা লুপ্ত হয়ে গেলে সমাজ আর সমাজ থাকে না, ফলে ফুরিয়ে যায় সমাজের গুরুত্বও। আমরা এমন এক সময়ে একথা উচ্চারণ করছি, যখন জনপদের-সমাজ এবং বিশ্বসমাজ প্রশ্নবিদ্ধ। বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের সময় আমরা উপলব্ধি করেছি মানবিক চেতনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অগ্নিনির্বাপণ কাজে এগিয়ে এসেছিল পঞ্চম শ্রেণীর ছোট্ট শিশু নাঈমও। জীর্ণ বস্তিতে বসবাস করলেও মানবিক চেতনায় সে ছিল উজ্জ্বল। ফলে ফায়ার সার্ভিসের পানির পাইপের লিকেজে পলিথিন পেঁচিয়ে সে অগ্নিনির্বাপণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে উদ্যমী হয়েছিল। পঞ্চম শ্রেণীর এই দরিদ্র শিশুটি আর কীইবা করতে পারে? সে তো তার মত করে এগিয়ে এসেছে। মানুষের প্রয়োজনে, সমাজের প্রয়োজনে আমরা সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসি, তাহলে আমাদের সমাজের চেহারায় পরিবর্তন আসতে পারে। তখন হয়তো আমরা বলতে পারবো, মানুষ মানুষের জন্য।
মানবিক চেতনার প্রকাশ আমরা লক্ষ্য করেছি নিউজিল্যান্ডের দুই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়ও। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীসহ সাধারণ মানুষ মজলুম মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ছিল তাদের স্পষ্ট উচ্চারণ। তার পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদ। যার গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছিলেন প্রিয়তমা স্ত্রী, তাকে ক্ষমা করার ঘোষণা দিয়েছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি বললেন, ‘মানুষ আমার কাছে জানতে চাইছে, স্ত্রীর খুনীকে আমি কীভাবে ক্ষমা করতে পারলাম? এই প্রশ্নের অনেক জবাব আমি দিতে পারি, সে সবের দরকার নেই। মহান আল্লাহ বলেছেনÑÑ আমরা যদি একে অন্যকে ক্ষমা করি, তিনি আমাদের ভালবাসবেন। মানুষের কত ধর্ম, কত বর্ণ, কত সংস্কৃতি। কিন্তু সব মানুষই এক একটা ফুলের মতো। আর সবাই মিলেই আমরা একটা সুন্দর বাগান।’ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারানো বাংলাদেশী হোসনে আরা আহমেদের স্বামী ফরিদ আহমেদ। তাঁর বক্তব্য হৃদয় ছুঁয়ে যায় নিউজিল্যান্ডের বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের। ২৯ মার্চ শুক্রবার তারা সবাই জড়ো হয়েছিলেন ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি পার্কে। হামলায় হতাহতদের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় স্মরণসভা। এতে যোগ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্নসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষ। জেসিন্ডা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিশ্ব এখন উগ্র সন্ত্রাসবাদের চক্রে আটকে গেছে, তবে এর সমাধান মানবতার মাঝেই নিহিত।’
ফরিদ আহমেদের বক্তব্যে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ সুরটাই ধ্বনিত হয়েছে। আর জেসিন্ডা বললেন, মানবতার মাঝেই সমাধান। আসলে ‘বৈচিত্র্যের-ঐক্য’ চেতনার মধ্যেই রয়েছে মানুষের শান্তিপূর্ণ বসবাসের নিশ্চয়তা। বৈচিত্র্যের ঐক্যকে মেনে নিলে দূর হতে পারে সন্ত্রাস ও বর্ণবাদের উগ্রতা। মানুষের মধ্যে চিন্তা-চেতনা, ধর্মবিশ্বাস তথা জীবনদর্শনে পার্থক্য থাকতে পারে। জোর করে কারো মতাদর্শ পাল্টানো যাবে না। অন্তর্নিহিত গুনে যেটা টিকে থাকবার, সেটাই টিকে থাকবে। এই সহিষ্ণুতা মানবিক এবং এটাই মানবতার পথ। স্বয়ং ¯্রষ্টা যখন তার বিরুদ্ধাচরণকারীদেরও আলো-বাতাস এবং খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তখন আমরা ভিন্নমতকে দাবিয়ে রাখার কে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ