ঢাকা, শনিবার 6 April 2019, ২৩ চৈত্র ১৪২৫, ২৯ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নিউজিল্যান্ডে হামলায় মুসলিম বিশ্বে রক্তক্ষরণ

এইচ এম আব্দুর রহিম : নিউজিল্যান্ডে আটাশ বছর বয়সী উগ্রবাদী ব্রেন্টন ট্যারান্টকে আদালতে হাজির করা হলে ও তার মধ্যে কোন অনুশোচনা দেখা যায়নি। সে ক্রাইস্টচার্চের দুটো মসজিদে হামলা চালিয়ে ৪৯ জন মুসলমানকে ঠা-া মাথায় হত্যা করে। আদালদে হাজির করার সময় তাকে উদ্ধত ও অহংঙ্কারীভাব পরিলক্ষিত হয়। সে হাসছিল আর আঙ্গুল দিয়ে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণবাদী প্রতীক দেখায়। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকা-ের ঘটনাটি বিশ্বনেতাদের শোক ও নিন্দা প্রকাশ পেলে ও বেশ কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যা আগামীতে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। এটা একটি নতুন মাত্রা, যা নতুন করে ¯œায়ু যুদ্ধতে প্রভাব ফেলবে। এটা বর্ণবাদী আচরণের নতুন এক রূপ। বিশ্বব্যাপী নতুন করে এক ধরনের বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
 মার্কিন মুল্লুক থেকে আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের দেশগুলোতেও বর্ণবাদী আচরণে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জন্ম হচ্ছে উগ্রপন্থী সংগঠনের, যারা এক ধরনের ঘৃণার রাজনীতি জন্ম দিয়ে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। ক্রাইস্টচার্চে ব্রেন্টন ট্যারান্ট যে ৪৯ জন নিরীহ মুসলমান নাগরিককে হত্যাকা- সাধারণ ঘটনা বলে ধরে নিলে আমরা ভুল করব। এটা বিশ্বব্যাপী ‘হেইট ক্যাম্পেইন বা ঘৃণার প্রচারণায়’ অংশ বিশেষ। এর মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। ধর্মীয় মুসলমানদের ঘৃণা করা এবং ধর্মীয় বিভক্তির সৃষ্টি করে ‘সুবিধা’আদায় করা।
 হত্যাকারী ব্রেন্টন টারান্ট একজন উগ্র দক্ষিণপন্থী বর্ণবাদী মানুষ। তিনি প্রচ-ভাবে মুসলিম বিদ্বেষী। তিনি চান বিশ্বব্যাপী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। ট্রাম্প তার অনুপ্রেরণার উৎস। এ কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। এর আগে যে সব জায়গায় মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে সেই সব জায়গা থেকে এই হত্যাকা-ের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তিনি ১৭ মিনিট ধরে এই হত্যাকা- চালিয়েছেন। আগ্নেয়াস্ত্র বদল করে এই হত্যাকা- চালিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময় ধরে হত্যা কা-টির ঘটনা কারো নজরে পড়ল না কেন? প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সতর্ক হলো না কেন? এটা কি প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতা, নাকি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধন। মার্কিন সমাজ মূলত অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু পৃথিবীর এক নান্বারে পরিণত হয়েছে, এর পিছনে অভিবাসীদের অবদান। ট্রাম্প নিজে এই অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তার স্ত্রীও অভিবাসী।
 একটা বড় অংশ শ্বেতাঙ্গ। কৃষ্ণাঙ্গ; চৈনিক কিংবা এশিয়ান অভিবাসীদের অবদান ছোট করে দেখা যাবে না। ট্রাম্পের এক নন্বর টার্গেট হল যুক্তরাষ্ট্র্র থেকে অভিবাসী, বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসীদের বের করে দেয়া। ব্রেন্টন টারান্টের মতো হত্যাকারীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে থাকবে। হত্যাকারী ব্রেন্টন‘ব্লাকসান’(কালো সুর্য)নামে একটি নব্য নাজি সংগঠনের সদস্য। এই নব্য নাজীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংগঠিত হচ্ছে! এরা নাজি মতাদর্শকে গ্রহণ করেছে নাজিবাদ কে আদর্শ হিসাবে মানছে। এমনকি তাদের সিন্বলও গ্রহণ করছে। এই নাজিবাদী সংগঠনগুলো সভ্যতার প্রতি হুমকি। ১৯৯২ সালে জন্ম নেয়া কমব্যাট ১৮ নামে একটি সংগঠনের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া উগ্রপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী এই সংগঠনের এখন ইউরোপের ১৮টি দেশে সংগঠিত হয়েছে। এদের মূল কর্তৃত্ব হল শ্বেতাঙ্গ। কর্তৃত্ববাদ, ইসলাম বিরোধী ও শক্তিশালী একক নেতৃত্ব। এদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিবাসী প্রসঙ্গটি। ২০১৫-১৬ সালে ইউরোপে ব্যাপকভাবে সিরিয়া অভিবাসী আসায় পুরো ইউরোপের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয় জার্মান চ্যান্সেলার এঙ্গেলা মার্কের প্রায় ১০ লাখ সিরীয় অধিবাসীকে জর্মানিতে আশ্রয় দিলে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হলেও তিনি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণ করে ছিলেন। মুসলমান এই অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে ইউরোপে আগমনকে কেন্দ্র করে কট্টর ডানপন্থী দলগুলো শক্তিশালি হয়। শুধু তা-ই নয়, ফ্রান্স, জার্মানিতে ও ইটালিতে তারা এখন ক্ষমতার কাছাকাছি।
২০১৭ সালের নির্বাচনে জার্মানিতে উগ্র নব-নাজি সংগঠন অলটারনেটিভ ফর জার্মানিতে উগ্র নব্য-নাজি সংগঠন অল্টারনেটিভ ফর জার্মান পার্টিকে তৃতীয় স্থান পেয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। এটা ছিল একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। এক সময় একেবারেই অপরিচিত দল এখন ক্ষমতার কাছাকাছি। তারা যদি পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার স্বাদ পায় ইউরোপে এক নতুন  যুদ্ধের সূচনা হতে পারে। শুধু জার্মান নয় ফ্র্যান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থান, ইতালিতে নর্দান লীগের ক্ষমতার অংশিদার, হাঙ্গেরিতে ‘জব্বিক’ কিংবা নরডিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’ পুরো নরডিকভুক্ত দেশগুলোতে (সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক) যেভাবে নব্য-নাজি সংগঠন কর্মকা- বিস্তার লাভ করেছে যে কোন শুভ বুদ্ধির মানুষের জন্য চিন্তার কারণ। এরা ইউরোপে হেইট ক্রাইমের জন্ম দিয়েছে। একক সন্ত্রাসী ঘটনার জন্ম দিয়ে নিজেদে অবস্থান জানান দিচ্ছে। উগ্র সংগঠনগুলো ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। মুসলমান অভিবাসীদের জন্য ব্রেক্সিটের জন্ম। আগামী দিনে এসব নব্য-নাজিবাদী সংগঠনের জন্য ইউরোপ এবং বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে এবং পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বসনিয়া-হারজেগোভিনার পরিস্থিতি আজও মানুষ স্মরণ করে। তখন উগ্র সার্বীয় জাতীয়তাবাদ বসনিয়া হারজেগোভিনা থেকে মুসলমানদের উৎখাত করেছিল। হাজার হাজার মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশুকে উগ্র সার্বরা (ধর্মীয়ভাবে অর্থডক্স খ্রিস্টান) হত্যা করেছিল। ১৯৯৫ সালের ১২ জুলাইয়ের ব্রেনিসার গণগত্যার খবর আমরা স্মরণ করতে পারি। এই হত্যাকান্ডের জন্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সার্ব যুদ্ধবাজ কমান্ডার রাটকো ম্লাদিকের বিচার হয়ে ছিল। আজ ব্রেন্টন টারান্টের অপরাধ গণহত্যার কথা স্মনণ করিয়ে দেয়। নামায়িক বিশ্বরাজনীতিতে ৯/১১-এর ঘটনা একটি বড় ধরনের ঘটনা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম বিদ্বেষী যে ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে ছিল, তা আজও চলমান। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষ জেনেছে আল কায়দা নামে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের নাম। ২০০১ সালে ১১ই সেপ্টেন্বর যে ঘটনা ঘটেছিল, তার রেশ এখন ফুরিয়ে যায়নি। একের পর এক ‘ঘটনা’ ঘটে চলেছে। আফগানিস্থান দখল, ইরাক লিবিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন, আই এসের উত্থান। এসব মূলত একই সূত্রে গাঁথা অর্থাৎ মুসলমান দেশগুলোর নেতৃত্বশূন্য করা, সারা বিশ্বে ইসলাম বিদ্বেষী মনোভা ছড়িয়ে দেয়, ইসলাম কে বিশ্বের বুকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে তুলে ধরা। দীর্য ১৭ বছর আগে যে ‘স্ট্্র্যাটেজি’ রচিত হয়েছিল তা আজ রয়ে গেছে।
সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্ট কর্তৃক ৪৯ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করা এরই সর্বশেষ উদাহরণ। এর মধ্যে দিয়ে স্ট্র্যাজেডির এখানেই শেষ এ কথা বলা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা আরো ঘটতে পারে আগামী দিনে। এটা ঠিক বিশ্ব নেতারা এর নিন্দা জানিয়েছেন কিন্তু এই ‘হেইট ক্রাইম’ বন্ধে কোন বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেনি। এমনকি ইসলামিক ঐক্য সংস্থার মতো সংগঠন এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামকে পশ্চিমা বিশ্বে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে সে ব্যাপারে ওআইসি সম্পূর্ণভাবে উদাসীন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের উত্থান ‘এ্যন্ট্রি ইসলামিক’ সেন্টিমেন্টকে আরো উসকে দিচ্ছে। পশ্চিমাবিশে^ এক নাম করা লোক গত ১৫ ই মার্চ পত্রিকার নিবন্ধে লিখেছেন, আইএসআই বা ইসলামি সন্ত্রাসী পরিচালনা করত ট্রাম্পবাদ কি তার স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিস্থাপিত হয়েছে ? অর্থাৎ ট্রাম্পের মতবাদ কি উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ‘হেইট ক্রাইমে’ এর জন্ম দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে ট্রাম্প যদি শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ আগের অবস্থান থেকে সরে আসতেন তাহলে হয়ত বা বিশ্বে হেইট ক্রাইম’ অনেক কমে যেত। ক্রাইস্টচার্চেও ঘটনা আমাদের জন্য এক ‘ওয়েক আপ কল’ অথাৎ জেগে উঠার সময় বাংলাদেশ জাতিসংঘে সোচ্চার হতে পারে। ওআইসিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ