ঢাকা, রোববার 7 April 2019, ২৪ চৈত্র ১৪২৫, ৩০ রজব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

একের পর এক আগুন

এফআর টাওয়ার আগুন -ফাইল ফটো

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : উচুঁ আর নীচু, দ্বিতল থেকে বহুতল, অলি আর গলি, বস্তি থেকে রাজপ্রাসাদ, কাঁচাবাজার কি পাকাবাজার-এমনতর স্থাপনাসহ যত স্থাপনাই গড়ে ওঠেছে রাজধানী ঢাকার বুক চিরে কোনটাই নিরাপদ নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে-সবই যেন অগ্নি ঝুঁকিতে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে সেই ঝুঁকির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েকমাসে যে সব স্থানে আগুন লেগেছে তার পর্যালোচনায় যে  চিত্রটি ভেসে ওঠে, তাতে দেখা যায় একটু অসতর্কতাতেই আগুন লাগছে, আর এই আগুনের হাত থেকে কারও রেহাই নেই। জানমালের ক্ষতি ঘটছে আগুনে।
রাজধানীর কোনো প্রান্তই খালি নেই, এ প্রান্ত-ও প্রান্ত-সব খানেই আগুনের তান্ডব। সংশ্লিষ্টদের অবহেলা আর নিয়ম না মানার মাশুল দিতে হচ্ছে আগুনে কারনে। একের পর এক আগুনের ঘটনায় গোটা রাজধানীবাসীই উদ্বেগ-উৎকন্ঠায়। আতংকিত নগরবাসীর সুখ কেড়ে নিয়েছে ‘আগুন’। চুড়িহাট্টায় যে ভয়াবহ আগুনের শুরু ,তার শেষটা কোথায় ? তা কারও জানা নেই। তবে সর্বশেষ আগুনের ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার ৫ এপ্রিল। ওই দিন  কারওয়ান বাজারের কাব্যকাস সুপার মার্কেটে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বরত কর্মকর্তা এমদাদুল হক জানান, কাব্যকাস সুপার মার্কেটে সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে ১২টা ১০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

সাম্প্রতিক সময়ের আগুনের ঘটনা
পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ঘটনার পর থেকে শুরু করে কারওয়ান বাজারের আগুনের ঘটনায় গত ৩০ দিনে অন্তত ২২টি স্থানের অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। চুড়িহাট্টা ও বনানীর ভয়াবহ আগুনে মারা গেছে অন্তত ৯৩ জন। তবে চুড়িহাট্টা ও বনানী ছাড়াও গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেট, খিলগাঁও বাজারসহ কয়েকটি স্থানের আগুনে অর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ শুক্রবার (৫ এপ্রিল) সকালে বারিধারার সোহরাওয়ার্দী এভিনিউয়ের একটি ভবনের সিঁড়িতে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড হয়। দুপুরে কারওয়ান বাজারে নয়তলাবিশিষ্ট কাব্যকাস হার্ডওয়্যার মার্কেটের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। তবে এসব ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি।
জানা গেছে, পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ভয়াবহ আগুনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে ভাসানটেক ১৪ নম্বর এলাকার ৩ নম্বর বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে আগুন লাগে। এতে বস্তিতে প্রায় ৪০০ ঘর পুড়ে যায়। গত ২ মার্চ পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি ভাঙারির দোকানে বিস্ফোরণের আগুনে ৩ জন দগ্ধ হন। গত ৩ মার্চ দুপুরে কারওয়ান বাজারে একটি গোডাউনে আগুন লাগে। গত ৮ মার্চ বিকালে রামপুরায় মোল্লা টাওয়ারে আগুন লাগে। গত ৯ মার্চ বিকালে মৌচাক আনারকলি মার্কেটে আগুন লাগে। গত ১৯ মার্চ মিরপুর-১৩ নম্বর সেকশনের একটি বাসায় বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে লাগা আগুনে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন দগ্ধ হন। গত ২৩ মার্চ পুরান ঢাকার লালবাগের শহীদনগরে কাগজের কারখানা, রামপুরা টিভি ভবনের বিপরীতে এবং নিউমার্কেট বিশ্বাস বিল্ডার্স ভবনসহ অন্তত ৩টি অগ্নিকাণ্ড হয়। গত ২৬ মার্চ মগবাজারে জাজ মাল্টিমিডিয়ায় আগুন লাগে। ২৮ মার্চ বনানীতে ভয়াবহ অগ্নিকণ্ডে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। পরদিন ওই এলাকার অন্য একটি বাড়িতে আগুন লাগে। ৩০ মার্চ ভোরে গুলশান-১ নম্বরের ডিএনসিসি মার্কেটে এবং দুপুরে ডেল্টা ভবনে আগুন লাগে। একইদিন রাতে ধানমন্ডির ১১/এ সড়কের একটি বাসায় আগুন লাগে। ৩১ মার্চ ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কে পর হাতিরঝিল সংলগ্ন পুলিশ প্লাজাতেও আগুন লাগার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ৩ এপ্রিল বুধবার খিলক্ষেতের  নিকুঞ্জ এলাকায় হঠাৎ উবারের এক প্রাইভেটকারে আগুন লাগে। ৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার খিলগাঁও এবং বাড্ডা এলাকাসহ অন্তত দুটি স্থানে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।
আগুনের ক্ষতি
গত বছর সারা দেশের অগ্নিকাণ্ডে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৮৫ কোটি ৭৭ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৫ টাকা বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস সূত্র। সংস্থাটির পরিসংখ্যানে ওই বছর অগ্নিকান্ডের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ৬৪২টি। উদ্ধারের পরিমাণ এক হাজার ১৮৪ কোটি ৫৭ লাখ ৬২ হাজার ৯১৯ টাকার মালামাল। আবাসিক বাড়ি-ঘরে আগুনের ঘটনা ছিল ৮ হাজার ৪৬১টি এবং শিল্প কারখানায় এ সংখ্যা এক হাজার ১৩১টি। এ ছাড়া ১৭৩টি গার্মেন্টে আগুনের ঘটনা ঘটে। বস্তিতে অগ্নিকান্ড  হয় ১৬৫টি। এসব অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে শিল্প কারখানা পরিদর্শন করা হয় ৪ হাজার ১৫৭টি। বিভিন্ন কলকারখানা ও মিলে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ৪ হাজার ৩২৮টিতে এবং প্রশিক্ষণার্থী ছিল এক লাখ ৭৯ হাজার ৬৮৬ জন। সরকারি মহড়া অনুষ্ঠিত হয় ৩ হাজার ২৫৮টি এবং বেসরকারি মহড়ার সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ১৮২টি। সরকারি সার্ভে এক হাজার ২১৮টি এবং বেসরকারি ৩ হাজার ৭৫৮টি। এক হাজার ৫৬০টি বহুতল ভবনে পরিদর্শন করা হয়। আর গণসংযোগ করা হয়েছিল ১৪ হাজার ২৮৭টি। জানা গেছে, বেশিরভাগ আগুনের সূত্রপাত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, চুলার আগুন, গ্যাস সিলিন্ডার, ছুড়ে দেয়া জ্বলন্ত সিগারেট ইত্যাদি থেকে। প্রতিবছর গড়ে ১৯ হাজার আগুনের ঘটনা ঘটে। গত ১০ বছরে সারা দেশে ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৫টি অগ্নিকা- হয়। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজারের বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার। ক্ষতির পরিমাণ সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০১৮ সালে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি। বছর বছর এ হার বাড়তেও দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নিকান্ড  হয়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৫৭ কোটি ২৪ লাখ ৮৪ হাজার ৪৮৬ টাকা। ২০১৬ সালে আগুনের ঘটনা ছিল ১৬ হাজার ৮৫৮টি। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৪০ কোটি ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ৮২২ টাকা। ২০১৪-২০১৮ পর্যন্ত ৮৯ হাজার ৯২৩টি অগ্নিকা  হয়। এতে ২০৯৯ কোটি ৭২ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯২ টাকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায়।
নগরে দিনে তিনটি অগ্নিদুর্ঘটনা
নগরে প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে গড়ে প্রায় তিনটি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে। সব দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা না থাকলেও সম্পদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়। সে তুলনায় অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীবাসী অগ্নিদুর্ঘটনার চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন।
ঢাকা শহরে নিয়ম না মেনে সুউচ্চ ভবন নির্মাণ, ভবনের অন্দরসজ্জায় দ্রুত দাহ্য পদার্থ ব্যবহারের প্রবণতা এবং কর্মস্থল ও বাসায় ইলেকট্রনিকসামগ্রী ব্যবহার বাড়ার কারণে অগ্নিকা-ের ঘটনা বাড়ছে বলে ধারণা অগ্নিনির্বাপণ কর্তৃপক্ষের।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে রাজধানীতে ২৩৪টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। কেবল জানুয়ারি মাসেই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১০০টি। এক দিনে সর্বোচ্চ সাতটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ও বনানীর এফ আর টাওয়ারের দুর্ঘটনায় অন্তত ৯৭ জন মারা গেছেন।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি না হলে তা গণমাধ্যমে আসে না। সম্প্রতি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় এবং বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিদুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় অগ্নিদুর্ঘটনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
শুষ্ক মওসুমে ঝুঁকি বেশি
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি শেরেবাংলা নগরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগে। এতে হাসপাতালের ভবনের এবং সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি হয়। রোগীদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নিতে গিয়ে নানা দুর্ভোগ হয়। হাসপাতালে দুর্ঘটনার ছয় দিন পরে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকা- হয়। এতে ৭১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর কয়েক দিনের মাথায় লালবাগের শহীদনগরে চুড়ির কারখানায় আগুন লেগে কমপক্ষে ৫০টি দোকান ও বসতবাড়ির চারটি কক্ষ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। আবার গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ২৬ জন মারা গেছেন। এর এক দিন পরেই ডিসিসি মার্কেটে আগুন লাগে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও দুই শতাধিক দোকান পুড়ে গেছে।
ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ জানায়, শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত আগুন লাগার ঘটনা বেশি ঘটে। তবে নগরায়ণের জন্য জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ায় দিন দিন বিষয়টি মানুষ আমলে নিচ্ছে।
অগ্নিদুর্ঘটনা বাড়ার কারণ হিসেবে শাকিল নেওয়াজ বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণে ব্যত্যয়, ভবনের অন্দরসজ্জায় ত্রুটি, কর্মস্থল ও বাসায় বৈদ্যুতিক পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ঘন বসতি বড় কারণ। তিনি আরও বলেন, শহরের মানুষ চরম অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে শহর মৃত্যুকূপে পরিণত হওয়া সময়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, বনানীর ভবনটি তৈরিতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও নিরাপত্তার ব্যাপারটি যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। একটু সচেতন থাকলে প্রাণহানি হয়তো এড়ানো যেত। হাসপাতাল, বস্তি, বসতবাড়ি, বিপণিবিতান থেকে শুরু করে যেকোনো জায়গাতেই অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। তবে শহরের বেশির ভাগ ভবনেই অগ্নিপ্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো কোনো ভবনে অবশ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা আছে। তবে সেগুলোতে মেয়াদ থাকে না। আবার মানুষও তার ব্যবহার জানে না। পানির সংকট উল্লেখযোগ্য। অথচ পানি আগুন নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপকরণ।
সর্বত্রই উদাসীনতা
একের পর এক অগ্নি দুর্ঘটনায় ঝরছে মূল্যবান প্রাণ। পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে বনানীর মতো অভিজাত এলাকাও বাদ যাচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ডের পর তাৎক্ষণিকভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও কিছুদিন পর সেই আগের অবস্থায় চলতে থাকে সবকিছু। সামগ্রিকভাবে কোনো কিছু গড়ে উঠছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবস্থা এতটাই খারাপ যে ২০১০ সালে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলেও গত ৯ বছরেও তা চূড়ান্ত হয়নি। কয়েক দশক ধরে রাজধানীকে ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী করার কাজটি সম্পন্ন করা হলেও অগ্নি নির্বাপণের জন্য নেই ন্যূনতম প্রস্তুতিও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরীর ফুটপাতে জলাধার রাখা আদর্শ মহানগরীর অন্যতম শর্ত। পানির অভাবে আগুন নেভাতে দমকল বাহিনীর বেগ পাওয়ার বিষয়টি প্রতিনিয়তই চোখে পড়ছে। অথচ সব ক্ষেত্রেই উদাসীনতার চিত্র।
বিশিষ্ট নগরপরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৪ থেকে ৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য বিদ্যমান ইমারত নির্মাণ বিধিমালা দিয়ে নির্মিত হচ্ছে ১০-২০ তলা ভবন। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সময়োপযোগী করতে ২০১০ সালে বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়। দীর্ঘ ৫ বছর গবেষণার পর খসড়া প্রস্তুত হয় ২০১৫ সালে। এরপর চার বছর কেটে গেলেও চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, রাজউককে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না বলে, রাজধানী অবনয়ন কর্তৃপক্ষ বলাই ভালো। ভবন নির্মাণের সময় নকশা অনুযায়ী বিদ্যুতায়ন ও এয়ারকন্ডিশন ব্যবস্থা, ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম, বহির্গমনের পথ, স্বয়ংক্রিয় অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে রাজউককেই।
ফায়ার সার্ভিসের সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান বলেন, উঁচু ভবনের জন্য আমাদের ল্যাডারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক আরও যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। ফায়ার স্টেশন বাড়াতে হবে, যাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় নষ্ট না হয়। তিনি জানান, ভবনগুলোতে হাইড্রেন্ট, স্প্রিংলার সিস্টেম রাখতে হবে। এই পদ্ধতিতে কোনো তলায় ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপমাত্রা হলেই ওই পাইপ থেকে ঝরনার মতো পানি ঝরে পড়ে। ১০ ফুট পরপর স্প্রিংলার সিস্টেম বসাতে হয়। এই পদ্ধতিতে নিচে তিনটি পানির পাম্প থাকে, এই পাম্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। ফায়ার পাম্প চলে বিদ্যুতে। বিদ্যুৎ না থাকলে স্ট্যান্ডবাই পাম্প জেনারেটর চালু হবে, না হলে জকি পাম্প থাকে। জকি পাম্প প্রতিটি ফ্লোরে সমান গতিতে পানি ছিটায়।
এছাড়া রয়েছে পিএ সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে নিচে একটি কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে। সেই কক্ষ থেকে কন্ট্রোলার ওই ভবনের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা বিএবিএক্সের মাধ্যমে কোন তলায় আগুন লেগেছে তা জানিয়ে দেবেন। থাকতে হবে স্মোক ডিটেক্টর বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র। এই যন্ত্র বসানো হলে কোনো তলায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর উপরে উঠলেই শব্দ করে ভবনের সবাইকে সতর্ক করবে।
থাকবে হিট ডিটেক্টর সিস্টেম। এই যন্ত্র বসানো হলে তাপমাত্রা বাড়লেই বেজে উঠবে। এ ছাড়া একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা থাকবেন, যিনি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সবকিছু তদারক করবেন। সুউচ্চ ভবনে হেলিপ্যাড থাকা বাধ্যতামূলক। প্রতি সাড়ে ৫০০ বর্গফুট আয়তনের জন্য একটি করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকতে হবে। প্রতি তিন মাস পরপর ফায়ার ড্রিল বা অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
সুউচ্চ ভবনে কমপক্ষে দু’টি সিঁড়ি থাকবে। কোনো ভবনে আগুন লাগলে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে লোকজন দিশেহারা হয়ে পড়ে ধোঁয়ার কারণে বের হতে পারে না। ফলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। এ কারণে প্রতি তলায় ‘এক্সিট সাইন বা প্রস্থান চিহ্ন’ থাকা আবশ্যক। বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এটি আলো জ্বেলে পথ নির্দেশ করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ