ঢাকা, সোমবার 8 April 2019, ২৫ চৈত্র ১৪২৫, ১ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জাতীয় অর্থনীতি এবং কল্পিত প্রবৃদ্ধি

আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য এক-দেড় বছর মোটেও দীর্ঘ সময় নয়। অতএব কোনো বিষয়ে উদাহরণ দেয়ার জন্য এক-দেড় বছর আগের তথ্য-পরিসংখ্যানের উল্লেখ করা যেতেই পারে। বিষয়টি মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত। গতকাল, ৭ এপ্রিল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আট দশমিক ১৩ শতাংশ হবে বলে সরকার যে আশার কথা শুনিয়েছে সেটা বাস্তব বিভিন্ন কারণেই সম্ভব নয়। প্রধান কারণ হিসেবে রিপোর্টে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তথ্যাভিজ্ঞরা। তারা বলেছেন, কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির হিসাব জানানো হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি তো হচ্ছেই না, উল্টো প্রতি বছর চাকরির বাজারে আসছে আট লাখ কর্মক্ষম মানুষ। এ প্রসঙ্গে অবশ্য অন্য রকমের পরিসংখ্যান তথা ভিন্নমতও রয়েছে। যেমন একটি গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবজারে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ প্রবেশ করে। কিন্তু সাত লাখের বেশি মানুষ কোনো চাকরি বা উপার্জন করার মতো কাজ পায় না। ফলে প্রতি বছর ১৫ লাখ করে বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে এই সংখ্যা আট লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ এগিয়ে যাওয়ার নামে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগই সৃষ্টি হচ্ছে না। ফ্লাইওভার এবং মেট্রোরেলের মতো বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ব্যয়িত বিপুল অর্থের সামান্য কিছু অংশও যদি শিল্প-কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে একদিকে অসংখ্য মানুষের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হতো, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও উৎপাদনসহ রফতানি আয়ের দিক থেকে দেশও অনেক এগিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকার শিল্প-কারখানা স্থাপনে কোনো বিনিয়োগ করছে না। সরকার বরং এমন সব খাতেই বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, যেগুলোর মাধ্যমে স্থায়ী চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে কমে আসার পরিবর্তে বেড়ে চলেছে বেকার মানুষের সংখ্যা।
অন্যদিকে পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল কিন্তু আট দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে ঘোষণা করেছেন। মন্ত্রী একই সঙ্গে জানিয়েছেন, চলতি বছরে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ও বেড়ে এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে- যা গত অর্থবছরে ছিল এক হাজার ৭৫১ ডলার। অর্থমন্ত্রী বললেও পাঠকরা ভেবে দেখতে পারেন, গত অর্থবছরে দেশের ঠিক কতজন মানুষ এক হাজার ৭৫১ ডলার আয় করতে পেরেছেন। কারণ, প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্য গড়ে ৮২ টাকা ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৪৩ হাজার ৫৮২ টাকা। সে হিসাবে প্রতি মাসে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ গড়ে ১১ হাজার ৯৫৬ টাকা আয় করেছে বলে অর্থমন্ত্রী যে দাবি করেছেন সেটা আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না তাও ভেবে দেখা দরকার। চিন্তা ও বিশ্লেষণের একই দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও না ভেবে উপায় থাকে না যে, চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে এক হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছানো সম্ভব কি না। কারণ, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষের মাসিক আয় দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৪৪ টাকা!
এ প্রসঙ্গেই প্রাধান্যে এসেছে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের প্রশ্ন- যার জন্য নিবন্ধের শুরুতে এক-দেড় বছর আগের উদাহরণের কথা বলা হয়েছে। কারণ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ শুধু যে হয়নি তা-ই নয়, গণমাধ্যমের রিপোর্টে বারবার বলা হয়েছে, ‘বিনিয়োগের খরা কোনোভাবেই কাটছে না।’ ২০১৭ সালের জুন-জুলাইয়ের দিকে বিনিয়োগ একেবারে তলানিতে এসেও ঠেকেছিল। এই অবস্থা ছিল দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগের উভয় ক্ষেত্রেই। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডা’র উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, ওই অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ৫১০টি প্রতিষ্ঠান মোট ৩৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন করিয়েছিল। এই পরিমাণ পূর্ববর্তী তিন মাস তথা আগের বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের চাইতে ৩১ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা কম।
মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বিনিয়োগ প্রস্তাব ৩১ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে ছিল অত্যন্ত আশংকাজনক। উদ্বেগের কারণ হলো, বাস্তবে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে এখনো কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার বিষয়টি। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলেও দেশের ভেতরে কোনো বিনিয়োগ হয়নি। এখনো হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও। বিশিষ্টজনদের মতে অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারের দমন-পীড়ন এবং সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ছিল বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। তাছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া এবং জমি রেজিস্ট্রি করার প্রক্রিয়ায় ঘুষ-দুর্নীতিকেও বিনিয়োগ না হওয়ার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কমলেও একই সময়ে ভারতে কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। সে ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
অথচ চাকরির সুযোগ সৃষ্টিসহ জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য শিল্পায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর শিল্পায়নের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন স্থবিরতার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, আগে রাজনৈতিক সংঘাত ও অনিশ্চয়তাকে বিনিয়োগ না আসার এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী মনে করা হতো। কিন্তু এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে জমি কেনা ও সেই জমি রেজিস্ট্রেশন করাসহ প্রতিটি বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতাও। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা তো বটেই, বিদেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে উৎসাহ দেখাতে পারছেন না। কারণ, দেশের ভেতরে বিনিয়োগ বাড়লে এবং উৎপাদনসহ বাধাহীন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে নিশ্চয়তা পেলেই সাধারণত বিনিয়োগের জন্য বিদেশিরা এগিয়ে আসেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই চরম হতাশাজনক অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যাভিজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, একদিকে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না, অন্যদিকে বেসরকারি খাতেও চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। তাছাড়া আট শতাংশের বেশি হারে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির যে তথ্য শোনানো হচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন ও সংশয় তো রয়েছেই, পাশাপাশি এ সত্যও প্রমাণিত হয়েছে যে, জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে চাকরির তথা কর্মসংস্থানের সমন্বয় করতে সরকার সফল হয়নি। একই কারণে প্রবৃদ্ধির কল্পিত হার নিয়েও প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
এভাবে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, দেশে বেকার সমস্যা আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার মূল কারণ কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে বা বাড়ছে না। না বাড়ার কারণ কর্মক্ষেত্র বাড়ছে না। কর্মক্ষেত্র না বাড়া বা সংকুচিত হওয়ার কারণ শিল্পব্যবস্থা ও বিনিয়োগের বিকাশ নেই। তাহলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি আসবে কোন্ পথে? প্রকৃত সত্য হলো, দেশীয় পুঁজিপতি বা শিল্প মালিকরা কোনো কারখানায় বিনিয়োগ করার পরিবর্তে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে দিচ্ছেন। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণখেলাপিদের সংখ্যা।
সব মিলিয়েই বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ক্রমাগত নি¤œমুখী হয়েছে। এই অবস্থা দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগের উভয় ক্ষেত্রেই বিরাজ করছে। এমন স্থবিরতার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, আগে রাজনৈতিক সংঘাত ও অনিশ্চয়তাকে দায়ী মনে করা হতো। কিন্তু এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়া এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে জমি কেনা ও সেই জমি রেজিস্ট্রেশন করাসহ প্রতিটি বিষয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতাও। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহ দেখাতে পারছেন না। একই কারণে এগিয়ে আসছেন না বিদেশি উদ্যোক্তারাও। কারণ, দেশের ভেতরে বিনিয়োগ বাড়লে এবং উৎপাদনসহ বাধাহীন কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপারে নিশ্চয়তা পেলেই সাধারণত বিনিয়োগের জন্য বিদেশিরা এগিয়ে আসেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি উভয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই চরম হতাশাজনক অবস্থা বিরাজ করছে।
এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দরকার সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যই চেষ্টা চালানো। বিশেষ করে দরকার বিদেশে টাকা পাচার প্রতিহত করার পদক্ষেপ নেয়া। সরকারকে একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার জন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে, আগ্রহী শিল্প উদ্যোক্তারা যাতে সহজে শিল্প-কারখানা স্থাপন করতে এবং নির্বিঘেœ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে পারেন। বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটিয়ে ওঠারও পদক্ষেপ নিতে হবে। সব মিলিয়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি করা দরকার, যাতে বিনিয়োগের খরা কেটে যায়, দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে প্রাণ ফিরে আসে। তেমন অবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেই দেশে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেকারের সংখ্যা নিয়েও তখন আর অসত্য তথ্য জানাতে হবে না। প্রবৃদ্ধির কল্পিত হার নিয়েও কেউ সংশয় প্রকাশ করবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ