ঢাকা, মঙ্গলবার 9 April 2019, ২৬ চৈত্র ১৪২৫, ২ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ওয়াজ মাহফিল নিয়ন্ত্রণ সুদূরপ্রসারী হবে

ড. মো. নূরুল আমিন : দেশে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, জঙ্গীবাদে উস্কানী, নারী বিদ্বেষ, গণতন্ত্র ও দেশীয় সংস্কৃতি বিরোধী বক্তব্য এবং বিশেষ ওয়াজ মাহফিলে সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করার কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের ১৫ জন আলেমকে চিহ্নিত করে তাদের উপর নজরদারি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কতিপয় দিকনির্দেশনা দিয়ে ইসলামী ফাউন্ডেশন এবং বিভাগীয় কমিশনারদের নিকট পরিপত্র পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। দিকনির্দেশনার মধ্যে রয়েছে ওয়ায়েজীনদের নিবন্ধনের আওতায় আনা, যারা পয়সা নিয়ে ওয়াজ করেন তারা ঠিকমত আয়কর দেন কিনা তা পরীক্ষা করা, স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক তাদের বক্তব্য রেকর্ড ও সংরক্ষণ, উস্কানীমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দিলে তা পর্যালোচনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ, রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা প্রভৃতি প্রধান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে ১৫ জন আলেমকে চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন: (১) জনাব আবদুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (সালাফি) (২) মাওলানা মুফতি মাহমুদুল হাসান, মোহতামিম, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া, মোহাম্মদপুর (৩) আল্লামা মামুনুল হক, যুগ্ম মহাসচিব, খেলাফত মজলিস (৪) মুফতি ইলিয়াসুর রহমান জিহাদী, প্রিন্সিপাল, বাইতুল রসুল ক্যাডেট মাদ্রাসা ও এতিমখানা, ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা (৫) মুফতি ফয়জুল করিম, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমীর, ইসলামী আন্দোলন, (৬) মুজাফফর বিন মহসীন (৭) মুফতি শাখাওয়াত হোসাইন, যুগ্ম মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট (৮) মাওলানা মতিয়ূর রহমান মাদানী (৯) মাওলানা আমীর হামজা (১০) মাওলানা সিফাত হাসান (১১) দেওয়ানবাগী পীর (১২) মাওলানা আরিফ বিল্লাহ (১৩) হাফেজ মাওলানা ফয়সাল আহমদ হেলাল ও (১৪) মোহাম্মদ রাকিব ইবনে সিরাজ প্রমুখ।
সরকারী পরিপত্রে ১৫ জনের কথা বলা হলেও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টসমূহে ১৪ জনের সুনির্দিষ্ট তালিকা পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ২/৪ জন সরকারী অনুগ্রহপুষ্ট ব্যক্তিও আছেন। তালিকায় তাদের নাম কেন আসলো বুঝা মুস্কিল। তবে অনুমান করা হচ্ছে যে, সরকারী পদক্ষেপকে নিরপেক্ষ প্রমাণের জন্য সম্ভবত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে চাতুর্য্যরে আশ্রয় নিয়ে থাকবেন। এখানে আরেকটি চাতুর্য্যও লক্ষণীয়। ওয়াজ মাহফিল পর্যবেক্ষণ ও বক্তাদের উপর নজরদারি সংক্রান্ত পরিপত্রে যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে তাতে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিকে মাদ্রাসার উচ্চতম ডিগ্রি বলা হয়েছে। এই দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রীর  মতো উচ্চশিক্ষা ব্যতীত যারা  ওয়াজ করে তারা জঙ্গিবাদ ও বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাই মাদ্রাসার উচ্চশিক্ষিত ওয়ায়েজিনদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। বলাবাহুল্য, দাওরায়ে হাদিস কওমী মাদ্রাসা পদ্ধতির একটি ডিগ্রি এবং সরকার কিছুকাল আগে এই ডিগ্রিকে মাস্টার্স সমপর্যায়ের ডিগ্রি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর আগে তারা কিন্তু কওমী মাদ্রাসাকে জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র আখ্যায়িত করে দেশ বিদেশে অপপ্রচার চালিয়েছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনাধীন মাদ্রাসাসমূহ থেকে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ও ডিগ্রিসমূহকে ইতোপূর্বে এসএসসি (দাখিল) এইচএসসি (আলিম), স্নাতক (ফাজেল) এবং মাস্টার্স (কামেল) সমমানের ঘোষণা করা হয়েছে এবং তা কার্যকর আছে। দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিধারী এবং ফাজেল বা কামেল পাস আলেমদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে এখানে সরকার দু’গ্রুপের মধ্যে ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি করাতে চান কিনা বিশ্লেষকদের অনেকে এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের শতকরা ৯২ ভাগ মানুষ মুসলমান। তারা ইসলামের অনুসারী। এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নামাজ কালামের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সূরা মুখস্ত জানেন। অনেকে কুরআন পড়তে জানলেও তার অর্থ জানেন না, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী অনুশাসন সম্পর্কে তাদের ধারণা খুবই কম। এ অবস্থায় এই উপমহাদেশে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য আমাদের সম্মানিত আলেমরা ওয়াজ মাহফিল/তাফসির মাহফিল পরিচালনা করে আসছেন। এই মাহফিলসমূহে কুরআন হাদিসের চর্চা হয় এবং শ্রোতারা নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত ছাড়াও আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) নির্ধারিত পন্থায় জীবন যাপনের পন্থার সন্ধান পান। এসব মাহফিল অমুসলমানদের জন্যও উন্মুক্ত এবং ইসলামের দাওয়াতি কাজের অংশ হিসাবে অনেক ওয়ায়েজীন ইসলামী জিন্দেগীর বিভিন্ন দিক এবং তুলনামূলক ধর্ম নিয়েও আলোচনা করেন। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামই হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম। এই ধর্মের সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব, আলেমদের তো বটেই। এই কাজটিকে কিছুতেই সাম্প্রদায়িকতা বলে আখ্যায়িত করা যায় না।
সৎ, ইমানদার, যোগ্য ও দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন নাগরিক তৈরিতে ওয়াজ মাহফিলের ভূমিকা অসামান্য। ইসলাম ব্যভিচার, মদ, জুয়া, ঘুস, রিসওয়াত সুদ, অন্যায়, অশ্লীলতা, জুলুম, নির্যাতন ও শোষণের বিরুদ্ধে। মানুষকে একথাগুলো জানানো মুসলমানদের কাজ। সাধারণ মুসলমানরা যেহেতু এ সম্পর্কে কম ওয়াকিবহাল সেহেতু আলেমরাই এই কাজ করে আসছেন এবং কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে এসব পাপাচার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের এই সতর্কবাণীগুলোকে শুধু তারাই সরকার বা প্রশাসন বিরোধী বলতে পারে যারা এসব পাপাচারে লিপ্ত। অথবা এ ধরনের লোকগুলোই সরকারকে বিভ্রান্ত করে ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করা ও তা নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিচ্ছে বলে মনে হয়। এই পদক্ষেপ ইসলামকে নিয়ন্ত্রণ ও বাংলাদেশের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করার একটি অপচেষ্টা মাত্র। এর ফলে সাধারণ মানুষের ইসলামী শিক্ষা পাবার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। সরকারী ওলামারা হক্কানী ওলামা হতে পারেন না।
সরকারের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে দেশের প্রখ্যাত বেশ কিছু আলেম বিবৃতি দিয়েছেন। নজরদারীর আওতাধীন  আলেমদের কারুর সাথেই আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। দেশের ক্ষয়িষ্ণু নৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আত্মবিনাশী পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবো।
এ ব্যাপারে আরো কিছু কথা আছে। আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ থেকে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের সামগ্রিক জীবন ধারাকে ইসলাম ও তার অনুশাসন থেকে মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বহুমুখী হামলা শুরু হয়েছে। প্রথম প্রথম এই হামলার রাখঢাক থাকলেও এখন আর তা নেই; প্রকাশ্যে এই হামলা শুরু হয়েছে। আবার এই হামলার কৌশলও পরিবর্তন হয়েছে। আগে বহিঃশক্তির মাধ্যমে এই হামলা হতো এবং তাতে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ এবং সংহতির ব্যাপক কোনও ক্ষতি করতে না পেরে হামলাকারী এই শত্রুরা ইসলামী উম্মাহর মধ্য থেকেই একটি গ্রুপ তৈরি করে সন্ত্রাস নৈরাজ্যের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কাজে লাগানোর কৌশল অবলম্বন করেছে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে জেএমবিসহ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের উত্থান এবং পরবর্তীকালে দেশব্যাপী ধ্বংসাত্মক বোমাবাজিতে তাদের সম্পৃক্তি এই কৌশলেরই অংশ ছিল। দেশের বরেণ্য আলেম উলামা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী বিশেষজ্ঞরা সন্ত্রাস ও বিনাকারণে মানুষ হত্যাকে কুরআন-সুন্নাহ তথা ইসলামের মৌলিক আকিদা বিশ্বাসের পরিপন্থী ঘোষণা করলেও তারা ইসলামকে জঙ্গি প্রমাণের অপপ্রচার থেকে বিরত হয়নি। তবে এ ব্যাপারে তারা সাফল্য সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত হতেও পারছে না। তাই তারা দ্বিতীয় আরেকটি কৌশল গ্রহণ করেছে এবং তা হচ্ছে মাদরাসা শিক্ষার ওপর পর্যায়ক্রমিক আঘাত এবং যুগ চাহিদার নামে মাদরাসা সিলেবাসকে এমনভাবে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন যাতে মাদরাসা থাকলেও এদেশের আলেম তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। বলাবাহুল্য, আলেমরাই প্রবল প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে এ দেশে ইসলামকে জিন্দা রেখেছেন। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, খুতবা, ওয়াজ মাহফিল, সিরাত মাহফিল, কুরআন-হাদিসের তাফসীরসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক দিকনিদের্শনা ও শিক্ষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইসলামের বাণী ও শিক্ষাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। মাদরাসা শিক্ষাকে পঙ্গু করে আলেম তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারলে এ দেশে ইসলামের ধ্বংস প্রক্রিয়া সহজতর হবে; বাঁশ না থাকলে বাঁশিও থাকবে না। এটাই তাদের বিশ্বাস, এই বিশ্বাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা তৎপর থাকলেও নিভৃতে ও উন্নয়নের খোলসে এর আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে। সেনা সমর্থিত বিগত কেয়ারটেকার সরকারের আমলে অবশ্য ইহুদী মুশরিকদের মদদে এর পটভূমি রচিত হয়েছিল।
পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, বিগত ২০০৮ সালে কার্লজে সিওভাক্কো নামক একজন মার্কিন ইহুদী বিশ্লেষক ও সমরবিদ এবং আওয়ামীলীগ নেত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও উপদেষ্টা সজীব  ওয়াজেদের সাথে যৌথভাবে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশে মৌলবাদ ও ইসলামের প্রসার এবং মাদরাসা শিক্ষার বিস্তৃতি। Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh শিরোনামে এই নিবন্ধটি Harvard International Review-তে প্রকাশিত হয়েছিল। এতে দেশে ইসলামের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান ঝোঁক প্রবণতাকে সংবিধান ও ধর্ম নিরপেক্ষতার জন্য বিরাট হুমকি বলে গণ্য করা হয়েছে (Biggest threat to the Country’s Constitution and Secular underpinnings) এবং প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে অবশ্যই ইসলামের প্রবাহমান অগ্রযাত্রা রোধ করতে সক্ষম হবে। এই উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগকে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে ইসলামের গতি স্তব্ধ হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের দীর্ঘ স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়। (It could roll back the growing tide of Islamism in Bangladesh to implement certain changes to proactively check Islamism to secure long-lasting secularism and democracy) নিবন্ধে জঙ্গিবাদ উত্থানের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইসলামপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করা হয় এবং বলা হয় যে, ইসলামপন্থীরা আর্মিতে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চাতুর্যের সাথে সেনাবাহিনীতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য মাদরাসাসমূহে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেছে। প্রবন্ধকারদের মতে, মাদরাসাসমূহে এই ভর্তি প্রশিক্ষণ চালুর আগে ২০০১ সালে আর্মিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ আসতো মাদরাসার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ চালুর পর বিএনপি-জামায়াত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৬ সালের মধ্যে আর্মির নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে মাদরাসাছাত্রদের সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়। বাংলাদেশের ৩৭ বছরের ইতিহাসে চারটি সেনা অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রবন্ধে সশস্ত্র বাহিনীতে ইসলামপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়েছে।
‘Toward Renewal : A Secular Plan’ শিরোনামে প্রদত্ত এই দিকনির্দেশনামূলক পরিকল্পনায় দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পদ্ধতিকে অরক্ষিত (Vulnerable) বলে গণ্য করা হয়। এতে প্রশ্ন করা হয়, Can the Awami League stop the growing tide of Islamism in a country that has seen the sale of burkas rise nearly 500 percent in last five years? অর্থাৎ যে দেশে বিগত পাঁচ বছরে বোরকার বিক্রি বার্ষিক ৫০০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সে দেশে আওয়ামী লীগ কি ইসলামী জোয়ারের প্রবল প্রবাহ রোধ করতে পারবে? পাঁচ দফা পরিকল্পনার একটি রোডম্যাপ দিয়ে এর উত্তরে বলা হয়েছে যে, হ্যাঁ যদি দলটি এটি বাস্তবায়ন করতে পারে। প্রবন্ধকারদের ভাষায়, ‘It must modernize the curriculum of the madrasas. Second it must build proper, secular elementary schools and hospitals. Third, it should increase the recruitment of secular minded students into the military. Fourth it must attempt to rehabilitate known extremist clerics. Lastly and perhaps the most abstract solution, it must push to vanquish poverty and illiteracy that consistently ranks among the worst in the world.’ অর্থাৎ এই পরিকল্পনার প্রথম দফাটি হচ্ছে আবশ্যিকভাবে মাদরাসাসমূহের পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন, দ্বিতীয়টি হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ প্রাথমিক স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, তৃতীয়টি হচ্ছে সেনাবাহিনীতে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের নিয়োগ বৃদ্ধি, চতুর্থটি হচ্ছে সুপরিচিত চরমপন্থী আলেমদের পুনর্বাসন। অবশ্য চরমপন্থী বলতে তারা কাদের বুঝাতে চেয়েছেন এবং পুনর্বাসনেরই বা অর্থ কি তা পরিষ্কার নয়। তবে ধারণা করে নেয়া যায় যে, এক্ষেত্রে তাদের আঙ্গুল ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী হক্কানী আলেমদের দিকেই তোলা হয়েছে এবং তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব থেকে তাদের বিরত রেখে অন্য কাজে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতি ইঙ্গিত করে। পরিকল্পনার পঞ্চম ধাপটি হচ্ছে দারিদ্র্যবিমোচনের প্রচেষ্টা। এই তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনাটির বিস্তারিত বিশ্লেষণ এখানে সম্ভবপর নয়, তবে আমি যে বিষয়টিকে এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি তা হচ্ছে বাংলাদেশে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করার জন্য মাদরাসা কারিকুলামের আধুনিকায়নের নামে তা থেকে কুরআন, সুন্নাহ, উসুল, ফিকাহ প্রভৃতির এমনভাবে কাটছাঁট করা হচ্ছে যাতে হক্কানী আলেম হবার পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
উপরোক্ত পরিকল্পনাটি সম্পর্কে দেশের আলেম ওলামা এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের অধিকাংশই অবহিত যে ছিলেন তা নয়। যারা ছিলেন তাদের অনেকেই বিষয়টি ততো গুরুত্বের সাথে দেখেননি। অবশ্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার পুত্রের বয়সের স্বল্পতা ও অপরিপক্বতা হয়তো এর একটি কারণ থাকতে পারে। অনেকেই মনে করেছেন যে, কার্লজে সিওভাক্কোর ন্যায় একজন ইহুদী হয়তো সজীবের অবস্থানও তার মার্কিন স্ত্রীর সুযোগ নিয়ে যৌথ প্রবন্ধে তার ইসলামবিদ্বেষকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে থাকতে পারেন। এই ধারণাটির সত্যতা কতটুকু তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাত্রায় ক্ষমতা গ্রহণের পর যেসব ঘটনা ঘটে চলছে তাতে সিওভাক্কো ও তার অনুসারীদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মতাদর্শের কোন গড়মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থে দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়া জরুরী বলে আমি মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ