ঢাকা, বুধবার 10 April 2019, ২৭ চৈত্র ১৪২৫, ৩ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আমলা আমলাতন্ত্র ও সাম্প্রতিক নির্বাচন

ইবনে নূরুল হুদা : রাষ্ট্র বিজ্ঞানের পরিভাষায় রাষ্ট্রের অঙ্গ তিনটি। নির্বাহী তথা শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের মূল কাজ আইন অনুযায়ী শাসনকাজ পরিচালনা করা। আইন বিভাগের কর্তব্য নতুন আইন প্রণয়ন ও পুরাতন আইন সংশোধন। আর আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। রাষ্ট্রের সকল অঙ্গের চেয়ে নির্বাহী বিভাগের কর্মপরিধি ও ক্ষমতা বিস্তৃত। তাই অপরাপর সকল বিভাগের উপরই নির্বাহী বিভাগ কর্তৃত্বশীল। তবে তা সুনিয়ন্ত্রিত ও সংবিধিবদ্ধ। আর রাষ্ট্রের সকল অঙ্গের সুসমন্বিত কার্যক্রমই সুশাসনের চালিকা শক্তি।
সার্বিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে গ্রাম পুলিশ পর্যন্ত সকলেই নির্বাহী বিভাগের আওতাভুক্ত। সাধারণভাবে রাষ্ট্র প্রধান ও সরকার প্রধানকে কেন্দ্র করে যে বিভাগ গড়ে ওঠে তাকেই এক কথায় নির্বাহী বিভাগ বলা হয়। নির্বাহী বিভাগের মধ্যমণি হচ্ছে ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ স্বতন্ত্র স্বত্ত্বা হলেও সেগুলো একে অপরের পরিপূরক। তবে নির্বাহী বিভাগ রাষ্ট্রের অপরাপর বিভাগের ওপর সংবিধিবদ্ধভাবেই কর্তৃত্বশীল।
অধ্যাপক গার্নারের মতে, নির্বাহী বিভাগের কার্যাবলীকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। (এক) অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা বিষয়ক (Administrative), (দুই) পররাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বৈদেশিক সম্পর্ক (Diplomatic), (তিন) সামরিক ব্যবস্থা (Military), (চার) বিচার বিষয়ক ক্ষমতা (Judicial) ও (পাঁচ) আইন বিষয়ক ক্ষমতা (Lagislative)। নির্বাহী তথা শাসন বিভাগকে সফল ও স্বার্থক করে তুলতে হলে উপর্যুক্ত সকল উপবিভাগের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন জরুরি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের যেমন সক্রিয়তা দরকার ও ঠিক তেমনিভাবে নাগরিকদেরও হতে হবে দায়িত্বশীল।
সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদে সুনাগরিকের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘It is the duty of every citizen to observe the Constitution and the laws, to maintain discipline, to perform publice duties and to protect public property.’ অর্থাৎ ‘সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য’। তাই দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সরকার, রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্ববান হওয়া জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থাটা খুবই ভঙ্গুর।
সুশাসনের ধারণা থেকেই রাষ্ট্র নামক সংগঠনের উৎপত্তি। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সুশাসন সর্বব্যাপী হয়ে উঠেনি বা প্রশ্নাতীত হয়নি। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের তীব্রতাটা আরও বেশি। এক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা হলো দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতা। এজন্য অনধিকারচর্চাও কম দায়ি নয়। সুশাসন ব্যহত হওয়ার জন্য এ দু’টোই অতি উল্লেখযোগ্য কারণ। তবে সর্বসাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে আত্মস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ চর্চার ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকেও দায়ি করা যুক্তিযুক্তই মনে হচ্ছে। আর এর প্রভাব আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বত্রই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাই আমাদের দেশে সুশাসন নিয়ে প্রশ্নটাও বেশ তীব্র।
সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। আর তার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে ডিএনসি উপনির্বাচন, ডাকসু ও উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরই কমবেশী ব্যর্থতা রয়েছে। কারণ, সরকার, রাজনৈতিক শক্তি, রাষ্ট্রযন্ত্র, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও নাগরিক সমাজ যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারতো তাহলে এসব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে এমন অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্নের সৃষ্টি হতো না। নির্বাচন নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুললেও এক্ষেত্রে যাদের জন্য নির্বাচন তথা নির্বাচকমন্ডলী কিন্তু সন্তষ্ট হতে পারেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ তৎপরবর্তী অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর এটিই হচ্ছে প্রধান দুর্বলতা ও নেতিবাচক দিক। তাই সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনগুলো কোনভাবেই প্রশ্নাতীত হতে পারে নি।
দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যক্ষেকরা এবারের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিরোধী দলগুলোও এসব নির্বাচনকে ‘জনগণের সাথে নির্মম প্রহসন’ হিসেবেই দেখছে। এমনকি খোদ একজন নির্বাচন কমিশনারও নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এজন্য বিরোধী দলসহ প্রায় সকল মহল থেকেই নির্বাহী বিভাগ তথা প্রশাসনকে দায়ি করা হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষে বলা হয়েছে, ‘একটি স্বাধীন দেশের প্রশাসন এমন হতে পারে না’। এতে আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র বা জনপ্রশাসনের সম্মান বৃদ্ধি করেনি বরং তাদের বিরুদ্ধে পেশাদারিত্বের অভাব ও দলবাজির অভিযোগ উঠেছে বেশ জোরালো ভাবেই। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা এর কোন সদুত্তর দিতে পারে নি বা পারছে না।
আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ জনপ্রশাসন বা আমলাতন্ত্র। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে আমলারাই আইন ও বিধি-বিধানের আওতায় থেকে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু সেই ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই আমলাতন্ত্রে পেশাদারিত্ব গড়ে উঠেনি বা গড়ে উঠতে দেয়া হয়নি। মূলত আমলারা রাষ্ট্রের কর্মচারি হিসেবে আখ্যা পেলেও উপমহাদেশে বৃটিশ শাসনকে দীর্ঘায়িত করতেই যাত্রা শুরু হয়েছিল বৃটিশ আমলাতন্ত্রের। ফলে আমলারা রাষ্ট্রের কর্মচারি হওয়ার পরও সেই ঔপনিবেশবাদীদের অশুভবৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি। তাই গণপ্রশাসনের কাছ কাক্সিক্ষত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না-বরাবরই এমন অভিযোগই শুনতে হচ্ছে আমাদেরকে।
ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতন্ত্রে সিভিল সোসাইটি ও জনগণের কাছে কোন জবাবদিহিতা ছিল না। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল স্বাধীন পাকিস্তানের আমলাতন্ত্রেও। সঙ্গত কারণেই সে সময় ‘Civil Service’ কে ‘Cattle Sevice’ হিসেবে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করতেন বলে একজন সিনিয়র আমলার আত্মস্বীকৃতি রয়েছে। বৃটিশ ও ভারতের অভিজ্ঞতায় পাকিস্তানের সেই আমলারা ছিল এলিট শ্রেণির এবং রাজনীতিবিদদের চেয়েও অধিক দক্ষ। তা দেশ ও জাতির জন্য অবশ্যই ইতিবাচকই হতে পারতো যদি আমলারা দায়িত্ব পালনে পেশাদারী, আইন, সংবিধান ও গণমানুষের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতেন। কিন্তু ক্ষমতাবানদের উরণচন্ডী মনোভাব ও এক শ্রেণির আমলাদের দাসপ্রবণ মানসিকতার কারণেই আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
মূলত আমাদের দেশের চলমান নেতিবাচক রাজনীতিই গণপ্রশাসনকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে একশ্রেণির আমলাদের উচ্চাভিলাষ ও দলবাজি। প্রশাসনে যারা এখনও দুর্নীতি ও অবক্ষয়ের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেননি, তারাও অনেক ক্ষেত্রেই সুযোগ সন্ধানী হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ বেশ জোরালো। বস্তুত দলবাজি সরকারের পাওয়ারের স্ট্রাকচারের ভেতর ঢুকে গেছে। ক্ষমতার প্রভাব বলয় থেকেই আমলাতন্ত্রের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কোন সরকারই ব্যুরোক্রেসিকে একটি পেশাদারী সত্ত্বা হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেনি বরং তাদেরকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারির   পরিবর্তে দলীয় দাসানুদাস বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই নেতিবাচক প্রবণতা আরও বেড়েছে। ফলে জনপ্রশাসন হারাতে বসেছে নিজস্ব স্বকীয়তা ও গণমুখী চরিত্র।
একথাও ঠিক যে, নিরপেক্ষভাবে দায়িত পালন করার ক্ষেত্রে জনপ্রশাসনের কিছুটা হলেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংবিধানেও ব্যুরোক্রেসিকে কোনো প্রোটেকশন বা গুরুত্ব দেয়া হয় নি বলে দাবি করেন আমলারা। সঙ্গত কারণেই নিরপেক্ষভাবে কাজ করা বা স্বাধীনভাবে মতামত দেয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না বলেও দাবি করা হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমলাদের অপেশাদারী মনোবৃত্তিকেই দায়ি করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, তারা পেশাদারিত্ব দিয়েই এসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে পারতেন। আর রাজনৈতিক টোপ, চাপ ও দলবাজি মুক্ত থাকতে না পারলে আমলাদের পুরোপুরি পেশাদারি হয়ে ওঠার সুযোগ নেই।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসন কাজে মূল ভূমিকায় থাকেন রাজনীতিকেরা। তবে এর বিভিন্ন স্তরে বিচিত্র ধরনের কাজের জন্য দরকার হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর। সাধারণ্যে তাঁরা সরকারি কর্মচারীরূপে পরিচিত হলেও আমাদের সংবিধান প্রণেতারা আখ্যায়িত করেছেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে। সরকারকে নীতিনির্ধারণে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা এবং সেই নীতি ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন তাঁদের দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমলাদের অপেশাদারি ও দলবাজ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা সম্পর্কে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অগ (Ogg) বলেন, (‘The body of the civil servants is an expert, professional, non-political, permanent and subordinate staff.’)
অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাবৃন্দ হবে সুদক্ষ, পেশাদারী, অধীনস্ত কর্মকর্তা যারা স্থায়ীভাবে চাকরি করেন এবং রাজনীতির সাথে যাদের কোনো সংশ্রব নেই’।
বস্তুত নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, পদোন্নতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিয়োগ গণপ্রশাসনের কার্যকারিতা হ্রাস করে ফেলেছে। একশ্রেণির দলবাজ কর্মকর্তাও এজন্য কম দায়ি নন। আসলে জনপ্রশাসন চাপমুক্ত থেকে পেশাদারিত্ব বাজায় রাখতে পারলে নির্বাচনকালে ‘নির্দলীয়’ সরকারের দাবি উঠতো না বা প্রয়োজনও হতো না। দুঃখজনক হলেও এটা সত্য, এসব কর্মচারীর একটি অংশ ইদানীং দলীয় বিবেচনাতেই তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এমনকি পরোক্ষভাবে দলীয় কার্যক্রমে যোগ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৬ সালের আমলা বিদ্রোহের ঘটনাও এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। এতে ব্যক্তিগতভাবে তারা হয়তো অনেকেই লাভবান হয়েছেন বা এখনও হচ্ছেন। কিন্তু পরিণতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব। দেশ ও জাতি বঞ্চিত হয়েছে সুশাসন থেকে।
আমলাতন্ত্র পেশাদারি হয়ে উঠেনি বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপও পায়নি তা সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, এসব নির্বাচন কোন নির্বাচন হয়নি বরং নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। আর এর নেপথ্যে কাজ করেছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন। যদিও নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, তবুও কমিশনের আবশ্যক হয় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সার্বিক সহযোগিতা। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে মূলত মাঠ প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা; বিশেষত পুলিশ প্রশাসন। ১৯৪৭-এর পর থেকে আজ অবধি সময়ান্তরে এ ধরনের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আইয়ুব খান তার ক্ষমতার বৈধতার জন্য গণভোটসহ সব নির্বাচনে প্রশাসনকে খোলামেলাভাবে ব্যবহার করেছেন। পরবর্তীতে শুধুমাত্র মাত্রার হেরফের ঘটলেও প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা থেকে খুব কম ব্যতিক্রমই দেখা গেছে। আর আমাদের দেশে সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে জনপ্রশাসনকে যেভাবে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে তা বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না।
সাম্প্রতিক নির্বাচনে শুরু থেকেই প্রশাসন বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে বলে জনসাধারণের মধ্যে অভিযোগ বেশ জোরালো। এমনকি ডিএনসিসি উপনির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা সত্ত্বেও গণপ্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত হয়নি। মূলত নির্বাচনে যেকোন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দায়িত্ব হবে দৃঢ়তার সঙ্গে আইন ও ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে এবং কোনো ধরনের অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে দায়িত্ব পালন করা। তারা আইনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন, কোনো ব্যক্তি বা দলকে নয়। শক্তি প্রয়োগে নিষ্ক্রিয়তা কিংবা অতি সক্রিয়তা কোনোটাই কাক্সিক্ষত বা সঙ্গত নয়। শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদে কোনো প্রতিবন্ধকতাও কারো কাম্য নয়। গ্রেফতার কিংবা শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে তারা কারও ইন্ধনে প্ররোচিত হওয়ারও কোন সুযোগ নেই। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তার পুরোপুরি ব্যত্যয় ঘটেছে বলে সর্বমহল থেকেই অভিযোগ করা হচ্ছে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গণহারে গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তো দূরের কথা বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণার ন্যূনতম সুযোগও পাননি। পক্ষান্তরে সরকারদলীয় প্রার্থীরা ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে যা নির্বাচনী ময়দানকে অসমতল করেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনগুলোতে সরকার মনোনীত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার অভিযানকে আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্ব বলে দাবি করা হলেও নির্বাচনে অনিয়ম রোধে প্রশাসনের ভূমিকা রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন গর্হিত ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজকে প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অভিযোগও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে। এসব অনিয়মের সাথে একদল দলবাজ সরকারি কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। যা সরকারি কর্মচারি বিধিমালা ও সংবিধানের মারাত্মক লঙ্ঘন। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘Every person in the service of the republic has a duty to strive at all time to serve the people.’
অর্থাৎ ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’। কিন্তু আমাদের দেশের সিভিল প্রশাসন কি সেই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? উত্তরটা তো নেতিবাচকই হওয়ার কথা!
inhuda71@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ