ঢাকা, বুধবার 10 April 2019, ২৭ চৈত্র ১৪২৫, ৩ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জগৎ বিখ্যাত হীরা দরিয়া-ই-নূর বাংলাদেশের অহঙ্কার

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : কোহিনূরের কথা সারা দুনিয়ার মানুষ জানেন। দরিয়া-ই-নূর এর নাম ডাক ছড়ায়নি বিশ্বে। যদিও উভয় তারা সমগোত্রীয়। বিশ্বখ্যাত দরিয়া-ই-নূরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু সা¤্রাজ্যের ভাঙ্গা গড়ার কাহিনী। খাজা আলীম উল্লাহ ১৮৫২ সালে সংগ্রহ করেছিলেন বিখ্যাত হীরা দরিয়া-ই-নূর। দরিয়া-ই-নূর বন্দি হয়ে আছে ব্যাংকের অন্ধকার ভল্টে। সে কারণেই এখনকার মানুষ ভুলে গেছে তার কথা। দরিয়া-ই-নূরের সাথে জড়িয়ে আছে জমিদারের উত্থান পতনের কাহিনী কিংবদন্তী। ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় এসে নবারের সৌজন্যে অনেক বিশিষ্ট জন দরিয়া-ই-নূর দেখতে পেয়েছেন। ১৮৮৭ সালের ৬ জানুয়ারি ভাই সরয় লর্ড ডাফরিন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতার নবাবদের বালীগঞ্জ প্রাসাদে গিয়ে এই হীরকটি দেখেছিলেন। জগৎ বিখ্যাত কোহিনূর হীরার বোন হিসেবে পরিচিত পেয়েছিল তখন এই দরিয়া-ই-নূর।
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান হীরক খন্ডের নাম হলো কোহিনূর। এর জন্ম দক্ষিণ ভারতে। এছাড়াও রয়েছে ভারতের নীল কান্ত হীরা ১৮৩০ সালে হেনরী ফিলিপ হোপ নামক এক ধণাঢ্য ব্যক্তি লন্ডনে ৯০,০০০ হাজার ডলারের বিনিময়ে নীলকান্ত হীরাটি কিনে নেন। পরবর্তীতে তারঁ নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় হোপ। তুরস্কের ইস্তামবুলের ক্যাসিকি ডায়মন্ড ও ঢাকার নবার পরিবারের দরিয়া-ই-নূর পৃথিবীর জগৎ বিখ্যাত হীরক খন্ড বলে বিশ্বে পরিচিত লাভ করেছে।
প্রখ্যাত অলঙ্কার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হ্যামিল্টন এ্যান্ড কোম্পানীকে দিয়ে ঢাকায় নবাব আহছান উল্লাহ তার সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য ১৪ টি অলঙ্কারের ছবি  ও বর্ণনা দিয়ে একটি এলবাম প্রকাশ করেছিলেন। ব্রিটিশ আমলের এই এলবাম এখন দুষ্প্রাপ্য। দরিয়া-ই-নূর নবাবদের বাজু বন্ধ রূপে ব্যবহৃত হতো। কোহিনূর শব্দের অর্থ আলোর পাহাড়, আর দরিয়া-ই-নূর মানে হচ্ছে আলোর সাগর। এ যাবৎ আমাদের দেশে যত মূল্যবান রতœরাজি পাওয়া গেছে দরিয়া-ই-নূর তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারের হীরক খন্ড। এটি চৌকানো আকৃতির। সোনার বাজু বন্ধনের মাঝখানে সংযুক্ত মোট ছোট ছোট ১০ টি ডিম্বাকৃতির হীরকখন্ডকে সোনার ফ্রেমের সাহায্যে মূল হীরক খন্ডটির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। মূল দরিয়া-ই-নূরের ওজন ৫০ ক্যারেট, সব মিলিয়ে ৭৬ ক্যারেট। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কোহিনূরের জন্মস্থান দক্ষিণ ভারতের খনি থেকে। দরিয়া-ই-নূর কে আহরণ করা হয়েছিল এখান থেকেই। দরিয়া-ই-নূর দীর্ঘকাল মারাঠা রাজাদের  করায়ক্ত ছিল। হায়দরাবাদের নবাব সিরাজুলমুলক সপ্তদশ শতাব্দীতে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকায় মারাঠা রাজ পরিবার থেকে এটি কিনে নেন। এরপর দিল্লীর মোঘল স¤্রাট খুব সম্ভবত হায়দ্রাবাদ থেকে এই হীরক খন্ডটি হস্তগত করেন। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের (বর্তমান ইরান) দুর্ধর্ষ বাদশাহ নাদির শাহ দিল্লী আক্রমণ করেন এবং নগরীর প্রায় ৩০,০০০ মানুষকে হত্যা করে দিল্লীর মোগলদের ধন ভান্ডার ও ময়ুর সিংহাসন সহ প্রায় সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যান নিজ রাজ্য পারস্যে (বর্তমান ইরান)। ধারণা করা হয় সে সময় বিশ্বখ্যাত কোহিনূর হীরা ও অন্যান্য রতœরাজির সঙ্গে দরিয়া-ই-নূর চলে যায় ভীনদেশে পারস্যে। কিন্তু অদৃষ্ট্যের নির্মম পরিহাস কিছুদিন পরেই নাদির শাহ তিনি তার প্রতিপক্ষের দ্বারা নৃশংসভাবে নিহত হন। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে তার সিংহাসনের এবং কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূরের উত্তরাধিকারীদের অধিকাংশেরই পতন ঘটেছে অত্যন্ত করুণভাবে।
এদের কেউ কেউ হয়েছেন অন্ধ, কেউ বা হয়েছেন প্রজা বিদ্রোহে নিহত, অথবা নিহত হয়েছেন নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে নৃশংসভাবে। পারস্যের নাদির শহরের পর পর্যায়ক্রমে তা আহমদ শাহ দুররানির মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ পুত্র মাহমুদ শাহ জোর করে ক্ষমতা দখল করলে জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহ সুজা কোহিনূরসহ মূল্যবান ধন রতœ নিয়ে কাশ্মীরে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে পাঞ্জাবের রনজিৎ সিংহের মৃত্যুর পর দরিয়া-ই-নূর শেষ পর্যন্ত নবালক রাজা দিলীপ সিংহের অধিকারে আসে। এরপর দরিয়া-ই-নূর ও কোহিনূর চলে যায় ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের দখলে। ১৮৩৭ সালে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়া ব্রিটেনের সিংহাসন আরোহণ করেন। লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ সালে  ব্রিটিশদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত হন শিখ রাজ্যের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী দীলিপ সিংহ। লর্ড ডালহৌসি শেষ পর্যন্ত ১৮৪৯ সালে এটা কেড়ে নিতে সমর্থ হয়েছিলেন ১০ বছর বয়স্ক শিখ স¤্রাট দীলিপ সিংহকে যুদ্ধে পরাস্ত করে। সেই অবধি ঘটনাক্রমে এই কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হস্তগত হয়। কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূর দুটি কোম্পানী লন্ডনে পাঠিয়ে দেয় রাণী ভিক্টোরিয়াকে উপঢৌকন হিসেবে এবং অন্যান্য মণি মানিক্য রেখে দেয় নিজেদের ভান্ডারে। কোহিনূর ব্রিটিশ রাণীর পছন্দ হলেও দরিয়া-ই-নূর তার মনে ধরেনি। ভাগ্যিস মনে ধরেনি, তার ফেরত পাঠিয়ে দেন ইরাক খন্ডটি কোম্পানীকে।
লন্ডনের হাইড পার্কে  রাণীর সম্মানে ১৮৫০ সালে হীরা জহরতের একটি প্রদর্শনী  ও নিলামের ব্যবস্থা করা হয়। এর পরে দরিয়া-ই-নূর ভারতে নিয়ে এসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নিলামে বিক্রির জন্য কলকাতার হ্যামিল্টন এন্ড কোম্পানীকে দায়িত্ব দেন। এর পর ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ১৮৫২ সালের নভেম্বর মাসে হ্যামল্টিন এন্ড কোম্পানী সেগুলো নিলামে বিক্রি করে দেয়। এই সময় খাজা আলীম উল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় দরিয়া-ই-নূর কিনে নেন। সন্দেহ নেই দরিয়া-ই-নূর ছিল নবাবদের রতœ রাজির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও মূল্যবান অলঙ্কার। দরিয়া-ই-নূরে কিনবার পরে ঢাকার নবাবদের অভিজাত্য অনেকাংশে বেড়ে যায়। তারা হীরকটি বাজু বন্ধে সংযুক্ত করেন। পারিবারিক, বড় কোন সামাজিক বা বিশেষ অনুষ্ঠানে নবাবরা দরিয়া-ই-নূর খচিত বাজু বন্ধটি পরতেন। এর খ্যাতির কথা সে সময় ছিল সর্বজন বিদিত। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৮৭ সালে ভাই সরয় লর্ড ডাফরিন সন্ত্রীক কলকাতার বালিগঞ্জে নবাব বাড়ীতে এসেছিলেন দরিয়া-ই-নূর দেখতে। এছাড়াও স¤্রাট পঞ্চম জর্জ ও রাণী মেরী ১৯১২ সালে কলকাতা সফরে এলে তাঁদের  ও দ্রষ্টব্যের তালিকায় অন্যতম আকর্ষণ ছিল দরিয়া-ই-নূর। সেই হীরক খন্ডটি আজ এখন সবার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। দরিয়া-ই-নূর ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ছিল হ্যামিল্টন কোম্পানীর তত্ত্বাবধানে।
ইতিহাস থেকে জানা যায় ভারত ভাগের পরে বিভাগীয় কমিশনার ও রাজস্ব বোর্ডের অনুমতি নিয়ে নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নসরুল্লাহ ও নবার এস্টেটের ডেপুটি ম্যানেজার মৌলভী বেলায়েত হোসেন হ্যামিল্টন এন্ড কোম্পানীর কাছ থেকে কালো ভেলভেট কাপড়ে মোড়ানো আরো ৬টি মুক্তাসহ দরিয়া-ই-নূর একটি বাক্সে করে ঢাকায় এনে ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখার ভল্টে রাখেন। পাক ভারত যুদ্ধের কারণে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান থেকে এই ব্যাংক উঠে গেলে দরিয়া-ই-নূর সমেত বাক্সটি তুলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সদর ঘাট শাখার হেফাজতে রাখা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দরিয়া-ই-নূর গচ্ছিত রাখা হয় সোনালী ব্যাংক সদর ঘাট শাখায়। মাঝে মধ্যে গুজব ওঠে আসল হীরাটি আর নেই। সেটিকে সরিয়ে ফেলে তার জায়গায় নকল একটি হীরা রাখা হয়েছে। গুজবটি যে ভালো নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আমরা জানি অনেক সময় গুজব সত্যে পরিণত হয়। সর্বশেষ, ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে কর্তৃপক্ষ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে হীরক খন্ডটি পরীক্ষা করিয়ে দেখেছেন দরিয়া-ই-নূর ঠিক ঠিক মতো আছে।
দরিয়া-ই-নূর এখন আর শুধু একটি মূল্যবান জহরত মাত্র নয়। আর্থিক মূল্য এর যাই হোক, এর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। এখন এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। সে কারণে বহুদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে সোচ্চার দাবী উঠেছে, দরিয়া-ই-নূর ব্যাংকের অন্ধকার ভল্ট থেকে মুক্তি দেয়া হোক।
বাংলাদেশের জনসাধারণকে এই অমূল্য সম্পদটি দেখার জন্য সুযোগ করে দিতে জাতীয় যাদুঘর অথবা আহসান মঞ্জিলে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রদর্শনের বন্দোবস্ত করা হক বলে আমরা আশা করি। এ নিয়ে কাজ কিছুটা এগিয়েও ছিল। ১৯৯০ সালের দিকে সরকার একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল  জাতীয় জাদুঘরে দরিয়া-ই-নূর প্রদর্শনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে । কিন্তু যা’ হয় বরাবর তাই হয়েছে। এক্ষেত্রে ও গড়িমসির জন্য কাজ আরও এগোতে পারে নাই। ফলে অদৌ ভল্টে বন্দী দরিয়া-ই-নূরের মুক্তি মিলবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। জানি না দরিয়া-ই-নূর জনগণের দেখার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে কিনা এটি সামনের  ভবিষ্যতেই শুধু বলতে পারবে।
লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ