ঢাকা, মঙ্গলবার 16 April 2019, ৩ বৈশাখ ১৪২৬, ৯ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অ্যাসাঞ্জ ‘গুপ্তচরবৃত্তির জন্য দূতাবাস ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল’

 

১৫ এপ্রিল, গার্ডিয়ান/আনাদুলো, আল জাজিরা : উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বারবার তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের শর্ত ভেঙেছেন এবং লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসকে গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্টের।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানকে প্রেসিডেন্ট লেনিন মোনেরো এসব কথা বলেছেন বলে খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।

সাত বছরের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করে নেয়ার পর বৃহস্পতিবার ইকুয়েডরের দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় লন্ডন পুলিশ।

অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক অ্যাসাঞ্জ ২০১০ সালে পেন্টাগন ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ সামরিক ও কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস করে দিয়ে বিশ্বজুড়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন।

ওই সব নথির মধ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধসম্পর্কিত ৭৬ হাজার এবং ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কিত আরো ৪০ হাজার নথি ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও পেন্টাগনকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। এসব কারণে তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

গ্রেপ্তারের পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দেয়া এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করা হচ্ছে।

মোরেনোর ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছেন, ইকুয়েডর এমন অভিযোগ তোলার পর রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা দেশটির সঙ্গে অ্যাসাঞ্জের সম্পর্ক ভেঙে পড়ে।

তার পরিবারিক নথিপত্র ফাঁস হওয়ার প্রতিশোধ নিতেই অ্যাসাঞ্জের রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিল করা হয়েছে, এমন ধারণা অস্বীকার করেছেন মোরেনো। অন্য দেশের গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপ করতে অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডর দূতাবাস ব্যবহার করায় তিনি দুঃখিত বলে জানিয়েছেন।

 “আমরা একটি সার্বভৌম দেশ ও প্রত্যেক দেশের রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাই অস্থিতিশীলতার যে কোনো উদ্যোগ ইকুয়েডরের জন্য মর্যাদাহানিকর”।

 “আমাদের দূতাবাসের দরজা গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র হওয়ার জন্য খুলে দিতে পারি না,” মোনেরো এমনটি বলেছেন বলে উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে গার্ডিয়ান। 

যুক্তরাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের অভাবই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের উদ্বেগের কারণ বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী জেনিফার রবিনসন। রবিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজ টেলিভিশনের সঙ্গে আলাপকালে এ নিয়ে কথা বলেন জেনিফার। তিনি বলেন, আমেরিকার অবিচারের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে বরাবরই তার মক্কেলের উদ্বেগ রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য বা সুইডেনে বিচারের মুখোমুখি হতে তার কোনও উদ্বেগ নেই।

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জআইনজীবী জেনিফার রবিনসন বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে ব্রিটিশ বা সুইডিশ বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কখনও কোনও উদ্বেগ নেই। তার উৎকণ্ঠা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অবিচারের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে।

এদিকে অ্যাসাঞ্জকে যেন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া না হয়, সে দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ইতোমধ্যেই অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ না করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টি। দলটির নেতা জেরেমি করবিন থেকে শুরু করে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডায়ান অ্যাবোট পর্যন্ত এ দাবিতে একাত্ম হয়েছেন। তাদের দাবি, মানবাধিকারের সুরক্ষার তাগিদে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে যেন কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ না করা হয়। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এখন পর্যন্ত এই দাবি মেনে নেয়ার কোনও ইঙ্গিত দেননি। উল্টো অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে বিকল্প সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে কলঙ্কজনক আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক নোম চমস্কি। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপকে ইতালির ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি সরকার কর্তৃক অ্যান্তোনিও গ্রামসিকে কারাগারে নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেছেন, তাকে চুপ করিয়ে দেয়াটা ক্ষমতাশালীদের জন্য জরুরি ছিল। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জোরালো সমালোচনা করেছেন চমস্কি। 

অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাশালীদের নষ্টামোর বিপরীতে ন্যায় ও সমতার পক্ষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর চমস্কি। ‘মুক্তিপথের সমাজতন্ত্র’-এ বিশ্বাসী চমস্কি ডেমোক্র্যাসি নাউকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার কয়েকটি দিক থেকে কলঙ্কজনক। এর একটি হলো বিভিন্ন সরকারের পদক্ষেপ। কেবল যুক্তরাষ্ট্র সরকার নয়, রয়েছে যুক্তরাজ্যও। নিশ্চিতভাবে ইকুয়েডরও রয়েছে। সুইডেন অতীতে সহায়তা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ হলো এক সাংবাদিককে চুপ করিয়ে দেয়ার।’

চমস্কি মনে করেন, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ক্ষমতাশালীরা যা গোপন করতে চায়, উইকিলিকস সেসব নথিই প্রকাশ করেছে। সে কারণেই তাকে চুপ করানোর দরকার পড়লো। একে তিনি মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক কমিউনিস্ট চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসিকে কারাগারে ঢোকানোর সঙ্গে তুলনা করেন। সেই সময়ের ইতিহাসকে সামনে এনে চমস্কি বলেন, ‘প্রসিকিউটররা বলেছিলেন ২০ বছর ধরে এই কণ্ঠকে থামানোর দরকার ছিল। একে বলতে দেয়া চলে না।’ তার মতে, অ্যাসাঞ্জের বাস্তবতাও একই রকমের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ