ঢাকা, মঙ্গলবার 16 April 2019, ৩ বৈশাখ ১৪২৬, ৯ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নুসরাত হত্যায় আ.লীগ নেতা রুহুল আমিনসহ ১২ জন জড়িত

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকা- নিয়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসছে। ওই হত্যাকা- নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা কথা উঠে আসলেও দিন যত যাচ্ছে ,তত গোমর ফাঁস হয়ে পড়ছে। তদন্ত সংস্থাও এসব তথ্য উপাত্ত যাচাই বাছাই করে জড়িতদের গ্রেফতারে মাঠে।
এদিকে, নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় ‘সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে’ আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন এজহারভুক্ত দুই আসামী নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাহেরুল হক চৌহান জানান, দুই আসামী রোববার মধ্যরাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
নূর ও শামীমকে আদালতে হাজির করা হয় রোববার বিকাল ৩টায়। এরপর তাদের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু করেন বিচারক, তা চলে রাত ১টা পর্যন্ত। হত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরও অন্তত ১২ জন জড়িত বলে ওই দুই আসামী আদালতকে জানিয়েছে। তারা জবানবন্দিতে জড়িতদের নামও উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নামও রয়েছে। বাকিদের বেশিরভাগই ওই মাদরাসার আলিম ও ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নূরউদ্দিন ও শামীম পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে বলে তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে ঢাকায় পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) সদর দফতরে এজাহারভুক্ত আসামীসহ মোট ১৩ জন হত্যাকান্ডের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত বলে জানান পুলিশের এই ইউনিটের প্রধান বনজ কুমার মজুমদার।
পিবিআইয়ের ফেনীর দায়িত্বরত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নূরউদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম অনেক তথ্য দিয়েছে। তারা হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করেছে। অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার নির্দেশে তারা কীভাবে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কীভাবে কী করে তা বিস্তারিত বলেছে।’
পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘নূরউদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম আরও কিছু নাম বলেছে। আমরা তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করছি না। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাকিদেরও গ্রেফতার করা হবে।’
তদন্ত সূত্র জানায়, যৌন হয়রানির মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা গ্রেফতার হওয়ার পর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের নির্দেশে নূরউদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম অধ্যক্ষের মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করে। এজন্য সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলম তাদের ১০ হাজার টাকাও দিয়েছিল। এ ছাড়া, মাদরাসার আরেক শিক্ষকও আন্দোলন ও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেন।
সরাসরি হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া শাহদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর সে দৌড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়ে সে রুহুল আমিনকে ফোনে বিষয়টি জানায়। রুহুল আমিন বলে, আমি জানি। তোমরা চলে যাও।
শাহদাত হোসেন শামীম বলেছে, নুসরাতের দায়ের করা মামলার পর রুহুল আমিন থানা ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিল।
নুসরাতের প্রতি নিজের ক্ষোভ থাকার কথা উল্লেখ করে শাহদাত হোসেন শামীম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, দেড় মাস আগেও সে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু নুসরাত তা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি অপমানও করে। এ কারণে সে নিজেও নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল। যার ফলে অধ্যক্ষ সিরাজের নির্দেশে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকান্ডে অংশ নেয়।
আরেক আসামী নূরউদ্দিন জানিয়েছে, তার সঙ্গে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার ভালো সম্পর্ক ছিল। এ কারণে তার নির্দেশে তারা পরিকল্পনা করে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ঘটনার সময় সে ভবনের নিচে ছিল। আর পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে নুসরাতকে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময় ছাদে কামরুন নাহার মণি ছিল।
নূরউদ্দিন জানিয়েছে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা নানা সময়ে ছাত্রীদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যৌন হয়রানি করতো।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাহেরুল হক চৌহান  বলেন, “আদালত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জবানবন্দি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। আসামী দুজন আদালতের কাছে তাদের স্বীকারোক্তি উপস্থাপন করেন।”
সেখানে তারা পুরো ঘটনা স্পষ্ট করেছেন জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “তারা কারাগারে থাকা মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার কাছ থেকে হুকুম পেয়ে হত্যাকা-টি ঘটিয়েছে। এ সময় তাদের সাথে কারা ছিলো, কীভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, বিষয়গুলো জবানবন্দিতে এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা এখনই গণমাধ্যমকে জানানো হচ্ছে না।”
সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন নুসরাত। গত ২৬ মার্চ নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার মামলা করার পরদিন সিরাজকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার হল থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয় বোরখা পরা চারজন। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে মারা যান।
দুই বছর আগে দাখিল পরীক্ষার সময়ও আক্রান্ত হয়েছিলেন নুসরাত। তখন তার চোখে দাহ্য পদার্থ ছুড়ে মারা হয়েছিল। ওই ঘটনাতেও অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার ‘ঘনিষ্ঠ’ নূর উদ্দিনকে সন্দেহ করা হয়।
ফেনীর সোনাগাজীর উত্তর চর চান্দিয়া গ্রামের নূর উদ্দিনকে শুক্রবার ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই। আর শাহাদাত হোসেন শামীমকে শুক্রবার সকালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় মোট ১৩ জন জড়িত ছিলেন, যাদের মধ্যে অন্তত দুজন ছাত্রী। তাদের একজন অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি। আর মাদরাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার সময় বোরকা পরা যে চারজন ছিলেন, তাদের একজন শামীম বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। শামীম এক সময় প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নুসরাতকে, কিন্তু নুসরাত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে জানান বনজ কুমার।
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, “তারা দুটি কারণে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে। এর একটি হচ্ছে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করে আলেম সমাজকে হেয় করা। আর অপরটি হচ্ছে শাহাদত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ