ঢাকা, মঙ্গলবার 16 April 2019, ৩ বৈশাখ ১৪২৬, ৯ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আলোচিত শম্পা গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার : নুসরাত জাহান রাফি হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আলোচিত সেই শম্পা ওরফে চম্পাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কয়েকদিন আগেই তাকে আটক করা হলেও গ্রেফতার দেখানোর বিষয়টি গতকাল সোমবার ফেনী পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নুসরাত জাহান রাফি হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আলোচিত সেই শম্পা ওরফে চম্পাকে ফেনী থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে কখন গ্রেফতার করা হয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
গত ৪ এপ্রিল সিরাজের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে যান মাদরাসা শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম ও মাদরাসার সাবেক ছাত্র নূর উদ্দিনসহ চারজন। সেখানে সিরাজ তাদের ‘একটা কিছু করে’ নুসরাতকে শায়েস্তা করার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতকে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ৬ এপ্রিল (শনিবার) সকালে রাফি আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় গেলে সেখানেই ভবনের ছাদে নিয়ে কেরোসিন ঢেলে তাকে আগুনে পোড়ানো হয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুই ছাত্রীর মাধ্যমে তিনটি বোরকা আনা হয়। আনা হয় কেরোসিন তেল। ৬ এপ্রিল বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে বলে শম্পা ওরফে চম্পা নামে এক ছাত্রীর দেয়া সংবাদে ভবনের চারতলায় যান নুসরাত। সেখানে আগে থেকে লুকিয়ে ছিল শাহাদাতসহ চারজন। তারা নুসরাতকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। কিন্তু নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে ওড়না দিয়ে বেঁধে গায়ে আগুন দিয়ে তারা নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যায়।
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানানো হয় ,নুসরাত হত্যায় মোট ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আট আসামীর মধ্যে পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), নূর উদ্দিন (২০), মুকছুদ আলম কাউন্সিলর (২০), জোবায়ের আহম্মেদ, জাবেদ হোসেন (১৯) ও আফছার উদ্দিনকে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। একই ঘটনায় আগে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার সিরাজ উদ দৌলাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এজাহারভুক্ত অন্য আসামী হাফেজ আব্দুল কাদের পলাতক। নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ আরও একজন মিলিত হয়ে পরিকল্পনা করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হবে। নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনার কথা তারা দুই ছাত্রী ও দুই ছাত্রের সঙ্গে শেয়ার করে। এর মধ্যে একটি মেয়ের দায়িত্ব পড়ে ৩টি বোরকা আনা ও পলিথিনের ব্যাগে কেরোসিন আনা। ওই ছাত্রী কথা মতো সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে শাহাদাতের হাতে হস্তান্তর করে। সকাল ৯টার পর ওদের ক্লাস পরীক্ষা শুরু হয়। এরই ফাঁকে ভবনের ছাদে চারজন অবস্থান নেয়। পরিকল্পনায় অংশ নেয়া শম্পা ওরফে চম্পা নামে এক ছাত্রী নুসরাতকে জানায়, ভবনের চারতলায় যান নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। ওই খবরে নুসরাত ছাদে গেলে তাকে আটকে দেয়া হয়। প্রথমে ওড়না দিয়ে বেঁধে এরপর কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়। বাইরে নূর উদ্দিনের নেতৃত্বে হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, গেট পাহারা ও স্বাভাবিক রাখার কাজ করে। আগুন দেয়ার পর সরাসরি অংশ নেয়ারা বোরকা পরে বের হয়ে যায়। নুসরাতকে এর আগেও চুন মারার কারণে পাহাড়তলির হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল। যে কারণে হত্যাকারীরা মনে করেছিল নুসরাতকে মারাটা কঠিন কোনো বিষয় নয়।
ঘটনার পরই পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআইয়ের ছয়টি ইউনিট তদন্তে অংশ নেয়। ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে জড়িতের সংখ্যা বাড়তে পারে। পাঁচজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরও একজনকে রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে। একজনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। এ ঘটনায় আরও পাঁচজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এ ঘটনায় জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন আইনের আওতায় নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পিবিআই’র বিশেষ সুপার (ঢাকা মেট্রো) আবুল কালাম আজাদ, এসপি বশির আহমেদ, মিনা মাহমুদা, পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা ও জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল আহছান। ১০ এপ্রিল (বুধবার) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত।

কাউন্সিলর মাকসুদ আলম রিমান্ডে
নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মালায় গ্রেপ্তার পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফ উদ্দিন আহমেদ গতকাল সোমবার এই আদেশ দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে মাকসুদকে ঢাকার ফকিরাপুল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। গতকাল সোমবার দুপুরে ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক।
মাকসুদ আলম সোনাগাজী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। নুসরাতের মৃত্যুর দুদিন পর গত ১২ এপ্রিল তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয় জেলা আওয়ামী লীগ।
এদিকে গতকাল দুপুরে নুসরাত হত্যাকান্ডে জড়িত সবার গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে আদালত চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আইনজীবীরা। পরে বিকেলে শহরের ট্রাংক রোডের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মিনারে একই দাবিতে মানববন্ধন হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের ফেনী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সেখানে বক্তব্য রাখেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, সিপিবির সভাপতি ফয়জুল হক মিলকি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ফেনীর সাধারণ সম্পাদক সমর দেবনাথ, সাংস্কৃতিক সংগঠন পায়রা-এর সভাপতি জাহিদ হোসেন বাবলুসহ অনেকে।
এর আগে সকালে ‘সচেতন ছাত্র সমাজ’, ‘মাল্টিসফট আইটি’, ‘গ্রান্ড হক টাওয়ার ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠন’-এর নেতাকর্মীরা নুসরাতের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করেন।
এদিকে নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে সোনাগাজী বাজারের জিরো পয়েন্টে একাধিক সংগঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। প্রতিটি মানববন্ধনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এর আগে রোববার রাতে নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার এজহারভুক্ত দুই ও তিন নম্বর আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম। রোববার মধ্যরাতে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জাকির হোসাইনের আদালতে ১৬৪ ধারায় দুজন জবানবন্দী দেন। দুপুর ৩টায় আদালতে হাজির করা হয় এ হত্যাকান্ডের প্রধান দুই সন্দেহভাজনকে। এরপর দুজনের জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়ে টানা দশ ঘণ্টা (রাত ১টা) পর্যন্ত চলে।
 সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন নুসরাত। গত ২৬ মার্চ নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার মামলা করার পরদিন সিরাজকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।ওই মামলা প্রত্যাহার না করায় ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষার হল থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয় বোরখা পরা চারজন। আগুনে শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাত ১০ এপ্রিল রাতে মারা যান। এ ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচ জনকে আসামী করে নুসরাতের ভাই নোমান মামলা দায়ের করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ