ঢাকা, মঙ্গলবার 16 April 2019, ৩ বৈশাখ ১৪২৬, ৯ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বগুড়ায় বিএনপি নেতা শাহীনকে কুপিয়ে হত্যা

বগুড়া অফিসঃ বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. মাহবুব আলম শাহীন খুন হয়েছেন। গত রোববার রাত পৌনে ১১ টার দিকে বগুড়ার নিশিন্দারা উপশহর এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে তিনি খুন হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ্যাড. শাহীন রোববার রাত সাড়ে ১০টার পর উপশহর বাজার এলাকায় একটি জিমন্যাস্টিক সেন্টার থেকে বের হন। এসময় মোটর সাইকেল যোগে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত শাহীনের ঘনিষ্টজনরা জানান, রোববার রাতে এ্যাড. শাহীন দোকান থেকে এক বস্তা ভাতের চাউল এবং পাঁচ কেজি পোলাও এর চাউল কিনে তার প্রাইভেট কারে উঠিয়ে নেন বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে। এমন সময় সদেরর নুনগোলা ইউপি চেয়ারম্যান আলীমুদ্দিন তাকে ডাক দেন। তিনি রাস্তা পার হয়ে চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলছিলেন। আর এই সময়ই দুর্বৃত্তরা তার উপর হামলা চালায়। প্রথমে ছুরিকাঘাত এবং পরে কুপিয়ে খুন করে শাহীনকে।
এদিকে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পেরেছে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. মাহবুব আলম শাহীনকে পুর্ব পরিকল্পিত ভাবে খুন করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের আধঘন্টা আগে থেকে ৫-৭ জন যুবক ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশকে তথ্য দিয়েছে।
রোববার রাত সাড়ে ১০ টা থেকে পৌনে ১১ টার মধ্যে বগুড়ার উপশহর বাজার এলাকায় ১০ তলা ভবনের সামনে দুর্বৃত্তরা এ্যাড.শাহীনকে ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে খুন করে। রাত ১২ টার পর বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা সহ জেলার অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাগন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এসময় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ্যাড. শাহীন রাত ১০ টার দিকে নিজেই প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-২৮৭৪) চালিয়ে উপশহর বাজার এলাকায় আসেন। এরপর তিনি বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স নামের একটি চাউলের দোকানের সামনে প্রাইভেট কার রেখে সেখান থেকে চাউল কিনে চাউলের বস্তা প্রাইভেট কারের পিছনে উঠিয়ে রাখেন। এরপর ১০তলা ভবনের পার্শ্বে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে সদরের নুনগোলা ইউপি চেয়ারম্যান আলীমুদ্দিনের সাথে গল্প করছিলেন। এমন সময় পিছন থেকে ৫-৭ জন যুবক অতির্কিত হামলা চালিয়ে তার বুকে ও পেটে ছুরিকাঘাত করে। এ্যাড. শাহীন সামন্য দৌড়ে গিয়ে রাস্তার উপর পড়ে যান। দুর্বৃত্তরা সেখানে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে পশ্চিম দিকের রাস্তা দিয়ে দৌড়ে নিশিন্দারা মধ্যপাড়ার দিকে পালিয়ে যায়। পরে ইব্রাহীম নামের এক যুবক আ্যড. শাহীনকে উদ্ধার করে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষনা করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েক জন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ্যাড. শাহীন ঘটনাস্থলে আসার আধঘন্টা আগে থেকে ৫-৭জন যুবক বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স নামের চাউলের দোকানের সামনে একটি বন্ধ চায়ের দোকানের সামনে অন্ধকারে বসে ছিল। ঘটনার পরপরই ওই যুবকরা দৌড়ে পশ্চিম দিক দিয়ে পালিয়ে যায়। তারা আরো জানান, এ্যাড. শাহীনের বাড়ি ঘটনাস্থল থেকে এক কিলোমিটার দুরে ধরমপুর এলাকায়। তিনি প্রতি রাতেই নিজে গাড়ি চালিয়ে উপশহর বাজারে আসতেন। তিনি এলাকায় একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিএনপির রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় হলেও আওয়ামীলীগের এক অংশের নেতাদের সাথে ছিল তার সখ্যতা। তিনি বিগত বিএনপি সরকারের সময়ে বগুড়া মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও তিনি বগুড়া মটর মালিক গ্রুপের সদস্য, বগুড়া এ্যাডভোকেটস বার সমিতির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবি ফোরামের সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
এদিকে, এ্যাড. শাহীন খুন হওয়ার খবর পেয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁন গভীর রাতে হাসপাতালে ছুটে যান। নেতৃবৃন্দ এই খুনের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে খুনীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন
বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আ্যাড.মাহবুব আলম শাহীন খুনের প্রতিবাদে পাঁচদিনের কর্মসুচি দিয়েছে বগুড়া জেলা বিএনপি। সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় শহরের নবাববাড়ি সড়কে জেলা বিএনপি অফিসের সামনে মরহুমের জানাজা নামাজের আগে জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম কর্মসুচি ঘোষনা করেন। কর্মসুচির মধ্যে সোমবার কালো ব্যাজ ধারন, দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিত করন। মঙ্গলবার প্রতিবাদ সমাবেশ, বুধবার কালো পতাকা র‌্যালী, বৃহস্পতিবার স্মরণ সভা এবং শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিল। জানাজা নামাজের পুর্বে জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম বলেন, কর্মসুচি চলাকালে পুলিশ খুনের সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হলে পরবর্তী কর্মসুচি ঘোষনা করা হবে। এরপর জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে নিহত শাহীনের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ধরমপুর নিজ বাড়িতে। সেখানে দ্বিত্বীয়বার জানাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে, বগুড়ায় বিএনপি নেতা এ্যাড. মাহবুব আলম শাহীন খুনের সাথে জড়িতদের সনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক টীম। পরিবহন মালিকদের সংগঠন মটর মালিক গ্রুপ নিয়ে চলমান বিরোধ নিয়ে শাহীনকে খুন করা হয়েছে বলে দাবী করেছেন নিহতের স্বজনেরা। এই বিরোধ ছাড়াও উপশহর স্নিগ্ধা আবাসিক এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশের কয়েকটি টীম ছাড়াও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদস্য মাঠে নেমেছেন খুনের প্রকৃত কারণ এবং জড়িতদের গ্রেফতার করতে। তারা ইতোমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছেন। ঘটনাস্থলের আশে পাশের সিসি টিভির ফুটেজ দেখে পুলিশ জড়িতদের সনাক্ত করতে কাজ করছে। খুনের ঘটনার সাথে ৭-৮ জন জড়িত ছিল বলে পুলিশ প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে।
নিহতের স্ত্রী আকতার জাহান শিল্পী বলেন, মটর মালিক গ্রুপের চলমান বিরোধ নিয়ে প্রতিপক্ষের লোকজন তার স্বামীকে কয়েকদিন ধরে হত্যার হুমকী দিয়ে আসছিল। নিহতের ভাতিজা শাহরিয়ার বলেন, তার চাচার একটি বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-১২৭০) রোববার সন্ধ্যার পরে বগুড়া থেকে ঢাকা যাচ্ছিল। পথিমধ্যে বগুড়ার শেরপুরে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বাসটি আটক করা হয়। এসময় বাসটির ডান পার্শ্বে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তিনি বলেন, তার চাচার খুনের খবর পেয়ে রাতেই বাসটি ছেড়ে দেয়া হয়। বাস আটকের খবর পেয়েই তার চাচা রোববার রাত ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হন। নিহত শাহীনের আরেক ভাতিজা মেজবাহ বলেন, মটর মালিক গ্রুপ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছাড়াও উপশহর স্নিগ্ধা আবাসিক এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। তার কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবী করা হচ্ছিল জমি সংক্রান্ত বিষয়ে। পুলিশের পক্ষ থেকে সব বিষয় গুলো গুরুত্ব সহকারে অনুসন্ধান করে জড়িতদের সনাক্ত করার কাজ করে যাচ্ছে পুলিশের একাধিক টীম।
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, একাধিক বিষয় সামনে রেখে পুলিশ অনুসন্ধান করছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ