ঢাকা, শুক্রবার 19 April 2019, ৬ বৈশাখ ১৪২৬, ১২ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রাজনীতিতে প্রতিহিংসা কাম্য নয়

এইচ এম আব্দুর রহিম : সরকারের সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেল। এ সময় সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। ভোটাধিকার এবং নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি মহাজোটের শরিক বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একটি অংশ প্রকাশ্যে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিয়ম ও বিশ্বাস যোগ্যতার প্রশ্ন তুলেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং উপজেলা নির্বাচনগুলো থেকে মানুষ এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন স্বীকার করছে, রাতের বেলা ভৌতভোটে বাক্স ভর্তি হওয়া এখন প্রধান সমস্যা। আর নির্বাচন  গ্রহণযোগ্য বা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে হলে নির্দলীয় রূপে ফিরিয়ে নেয়ার কথা সরকারি মহলে আলোচনায় এসেছে। 

 দেশের রাজনীতি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রশ্ন দাঁড়ায় এখানকার অধিকারের ভূমি কতটা সমতল। এক কথায় বলা যায়, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংজ্ঞা সূত্র মোতাবেক রাজনীতি চলছে না। ভিন্ন মতাবলন্বী, বিরোধী পক্ষের মতামত কিংবা তাদের রাজনৈতিক অধিকারের পথ ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে রাজনীতি এখন অনুমতি নির্ভর। আর যাই হোক, অনুমতির রাজনীতি কোনভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতি নয়, হতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, দেশে এখন রাজনীতি নেই। রাজনীতির নামে যেটুকু আছে কিংবা তা চলছে তা হলো, একতরফা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা। সন্দেহ অবিশ্বাষ শঙ্কা-হতাশা ইত্যাদি নানারকম নেতিবাচকতা রাজনীতি ঘিরে ক্রমপুষ্ট হচ্ছে। যতই উন্নতি অগ্রগতির কথা বলা হোক না কেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি বিকাশ না ঘটে, এর পথ যদি ক্রম রুদ্ধ থাকে, তাহলে কোন কিছুই টেকসই হবে না, হবে না অর্থবহও। রাজনীতির বর্তমান যে চিত্র রক্ত¯œাত স্বাধীন বাংলাদেশে পরিলক্ষিত হচ্ছে, চূড়ান্ত অর্থে তা মঙ্গলজনক নয়। রাজনীতিতে কৌশল থাকবেই। কিন্তু অপকৌশল কোনভাবে কাম্য নয়, হতে পারে না। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পথ সংকুচিত হয় কিংবা হতে থাকে, তাহলে সমূহ বিপদাশঙ্কাও প্রকট হতে বাধ্য। বিরোধী দল ও মত দমনের চেষ্টা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অকল্যাণই ডেকে আনে। কারারুদ্ধ বি এন পির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অনেক দিন ধরে অসুস্থ। তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে আসছে বিএনপি। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে সম্প্রতি বারবারই তার প্যারোলে মুক্তির প্রসঙ্গ নানাভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। তারা বলছেন, বিএনপি চাইলে এমনটি খতিয়ে দেখা হবে কিংবা পরবর্তীতে ভাবনা চিন্তা করা হবে। কিন্তু বিএনপির নেতারা স্পষ্ট করেই বলে আসছেন, তারা সরকারের অনুকম্পা চান না। আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি চান। এ লক্ষ্যে ৭ এপ্রিল রাজধানির ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপি নেতারা গণঅনশন কর্মসূচি পালন করেন। এই অনশনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন দুই জোট- জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের শীর্ষ নেতারাও অংশ নেন। বিএনপি নেতারা যেহেতু খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি দাবি কখনও করেননি। সেহেতু এ প্রসঙ্গ সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ ঘুরে ফিরে কেন আনছেন, তা বোধগম্য নয়। নাকি তা এক ধরনের অপকৌশল। কেন এই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা একটু পিছনে ফিরে তাকালে দখতে পাই আইয়ূবের শাসনামলে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার কিংবা এই পন্থায় মুক্তি দাবির বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছিলো শাসক মহলের পক্ষ থেকে কিন্তু দলের নেতারা অটল ছিলেন আগরতলার যড়যন্ত্র মামলা নিঃশর্ত প্রত্যাহারের বিষয়ে। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর তখনকার ভূমিকা স্মরণযোগ্য। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি নিয়ে আন্দোলনকারীদের অবস্থান আরো সুসংহত হলে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয়। সেই রকম আন্দোলন এখন গড়ে তোলা অনেক কিছুর ঘাটতি রয়েছে। আইয়ুবের পরে আসে ইয়াহিয়া খান। এর পরবর্তী ইতিহাস সচেতন মানুষ মাত্রই জানে। রাজনীতিতে কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে; কিন্তু কূটকৌশল অবলন্বন করা সামগ্রিকভাবে বৈরিতার পথটাই প্রশস্ত করে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে নীতিনৈতিকতার পাঠ ক্রমে চুকে যাচ্ছে। সুলতান মুহাম্মদ মুনছুর আর  মোকাব্বের খানের শপথ নেয়ার বিষয়টি যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। আর দুজনই নির্বাচন করে ছিলেন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের ব্যানারে। সুলতান মুহাম্মদ মুনছুর ধানের শীর্ষ নিয়ে আর মোকাব্বির খান দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে ছিলেন। তারা দু’জন জোটভুক্ত রাজনীতিতে সক্রীয় হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে ছিলেন। কদিন পরে তাদের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিতে দেখা গেল। যে বৈরী পরিবেশে নির্বাচনে বিজয় লাভ করেন তা উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। তাদেরকে ভোটাররা নির্বাচিত করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনিতি প্রার্থী হিসেবে। কিন্তু তারা স্বার্থের টানে সব নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে পিছনের কথা সব ভুলে গেছেন। তারা এখন নিজেদের গা বাঁচাতে নির্বাচক মন্ডলির চাপের কথা বলছেন। কিন্তু কেউ যদি বলেন, নির্বাচক মন্ডলির চাপের চেয়েও সংসদ সদস্য হিসেবে সুযোগ সুবিধার প্রভাবের আকর্ষণ তাদেরকে সংসদে যাওয়ার পথে টেনেছে। এ নিয়ে অনেকে  কথা বলছে। কিন্তু তাদের কথার সত্যতা ভবিষ্যৎ অবশ্যই বলে দেবে। 

আমরা যদি পিছনের দিকে তাকাই ১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারীর কথা স্মরণ করি তাহলে দেখব, সেদিন রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে তখনকার সময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অঙ্গীকার করে ছিলেন বাংলার অধিকারের প্রশ্নে আপস না করার। দলীয় এমন দৃঢ় অঙ্গীকার করে ছিলেন বাংলার অধিকারের প্রশ্নে আপস না করার। দলীয় এমন অঙ্গীকার এবং সবার দলের প্রতি আনুগত্যের কারণেই ইতিহাসে সৃষ্টি হয়ে ছিল নতুন অধ্যায়। এমন নজীর ইতিহাস আছে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনেও। রাজনীতি যদি নীতির রাজা হয়, তাহলে তৎসংশ্লিষ্ট অনেক কিছু আমলে রাখা কিংবা নেয়া অবশ্যই প্রয়োজন রাজনীতিদলীয় কিংবা জোটের সিদান্তে অনড় থাকা। অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। নীতি জলাঞ্জলি দিয়ে, অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে আর যাইহোক রাজনীতি অঙ্গনে বেশী দিন বিচরণ করা যায় না। এমন নজিরও আমাদের সামনে আছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জোটবদ্ধ আন্দোলনের ইতিহাস নতুন নয়, অন্য দেশেও এমন নজীর আছে। সুলতান মোহাম্মদ মনছুর ও মোকাব্বির খানের শপথ নেওয়ার পর রাজনীতে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার অংশগ্রহণ হোক এ দাবি দেশি-বিদেশী নানা মহল থেকে উঠেছিল। নানা রকম অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক হলেও নির্বাচনের পূর্ব ও নির্বাচনকালীন কর্মকান্ড নির্বাচন কমিশন ও সরকাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই নির্বাচন নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। সম্প্রতি চার ধাপে সম্পন্ন হল উপজেলা নির্বাচন। বাকী রয়েছে আরো একধাপ, যা ইদুল ফিতরের পরে হবে। এই নির্বাচন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। নিজেরা নিজেদের প্রতিপক্ষ। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-কলহ-বিবাদের জের ধরে রক্তপাত হয়েছে। ঘটেছেও প্রাণহানি । রাজনীতি ও নির্বাচন যেন খেলায় পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বলা যায়, অর্থহীনও হয়ে গেল। এসব গণতন্ত্রের জন্য কোনো শুভবার্তা বহন করে না। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ মেনে নিলেও তাদের স্টেট ডির্পাটমেন্ট বিশ্ব মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি মূল্যায়ন না করে পারেনি। মন্তব্যটা এ রকমের ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দল আওয়ামী লীগ গত ডিসেম্বর মাসে অকল্পনীয় একপেশে সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য টানা তৃতীয়বার নির্বাচিত হয়েছে। ওই নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু বিবেচিত হয়নি। বিরোধী পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, জাল ভোট প্রদানসহ অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার। এ সহিংসতার কারণে বিরোধী অনেক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মিছিল-সমাবেশ এবং স্বাধীনভাবে প্রচার কঠিন হয়ে পড়ায় বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বেরিয়েছে।’

এসব পর্যবেক্ষণ মার্কিন সরকারের। তবে দেশের ভিতর থেকে যারা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা দেখছেন এবং অনুভব করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশী প্রত্যক্ষ এবং হতাশাব্যঞ্জক আর ও বলা হয়েছে, ‘ইলেকশান ওয়ার্কিং গ্রুপের ২২টি এনজিওর মধ্যে মাত্র ৭টিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেয়া হয়ে ছিল’ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যেসব মানবাধিকার লংঘিত হয় তারও একটা তালিকা দেয়া হয়েছে। তালিকায় উল্লেখ রয়েছে ‘বেআইনি বা বিনা বিচারে হত্যা, গুম, নির্যাতন, সরকার বা তার পক্ষে বেআইনি পরোয়ানা ছাড়া আটক, কঠোর ও জীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ কারাগার পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বন্দি, ব্যক্তিগত বিষয়ে বেআইনি হস্তক্ষেপ সেন্সরশিপ, সাইট ব্লক ও আপত্তিকর বিবৃতি এবং এনজির কর্মকান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ, শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া ও সংগঠন করার অধিকারের ওপর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিধিনিষেধ স্বাধীনভাবে চলাফেরার ওপর উল্লেখযোাগ্য বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উপর চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ,অবাধ ও সুষ্ঠু এবং প্রকৃত নির্বাচন না হওয়া, দুর্নীতি মানব পাচার’ এই যে চিত্র বিদেশি পর্যবেক্ষণে ফুটে উঠেছে, তা আমাদের জন্য গৌরবের নয়। দেশের রাজনীতি গণতন্ত্র এবং সমাজের নানাবিধ ক্ষতচিত্র ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। 

গত ৭ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘সুশাসন ও গণতন্ত্র, বাংলাদেশের করণীয় শীর্ষক এব সেমিনারে যুক্ত রাজ্যের এশীয় প্রশান্ত মহাসাগর বিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বলেছেন, ‘নির্বাচন ও গণতন্ত্র মানে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে হবে এবং নির্বাচনে ভোটাররা স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি পছন্দ করবেন। বাংলাদেশের বন্ধু হিসাবে বলতে এটা আনন্দ পাই না যে, গত ডিসেন্বরের নির্বাচনে সেইমান অর্জন করতে পাওে নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যে কোনো সুসংহত গণতন্ত্রের পছন্দমত মত প্রকাশ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জবাবদিহি  শক্তিশালী করতে হলে গণমাধ্যমকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। এই পর্যবেক্ষণগুলো উঠে আসছে। প্রকাশ পাচ্ছে, তা কতটা আমলে নেয়া হচ্ছে? দেশের নির্বাচন, নির্বাচনী ব্যবস্থা রাজনীতি ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে।’

নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম শর্ত। কিন্তু এ শর্ত যদি এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে, তাহলে রাজনীতি সঙ্গত কারণে বিপথে যাবে। নিবাচন, গণতন্ত্র, বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি নিয়ে যুক্তিযুক্ত নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে।  

তা আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। সংশ্লিষ্টরা দায়িত্বশীলরা আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে, জাতীয় সংসদে শক্তিশালি বিরোধী পক্ষ থাকাটা রাজনীতি, গণতান্ত্রিক, সর্বোপরি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য খুবই জরুরী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানে বিরোধী পক্ষতে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের পথ কন্ঠকাকীর্ণ। এই বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। পরমত সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র্রেও অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলেও বর্তমান বাংলাদেশে এর অনুপস্থিতি রয়েছে। ১৯৯০ সালের শেষ লগ্নে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের রূপ লাভ করে। এর পটভুমি যদিও ছিল ভিন্ন, কিন্তু অসহায় ছিল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ভারসাম্যমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই লক্ষ্য উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছে। আজকের প্রেক্ষাপটে চলতে পারে বিতর্ক। তত্ত্বকথা বলতে চাই না। তার পরও বলব গণতন্ত্র এক ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা। গণতন্ত্র এমন এক পদ্ধতি যা সবার আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করে। এই ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা লঘুও। একই সঙ্গে বলা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি হয় স্বতন্ত্র। অনন্য ও একক রূপে। এখানে সংখ্যাগুরু সংখ্য লঘু একত্রে কাজ করে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা কি সাক্ষ্য বহন করে? বাংলাদেশের রাজনীতি গুণগত পরিবর্তনের জন্য তাই প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন।

 এছাড়া সাড়ে তিনমাসে সরকার অন্যান্য দিকে তেমন কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। সরকার যানবাহন নিয়ন্ত্রণে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সরকার রাজধানিতে পরীক্ষামূলক সার্কুলার রুটের বাস চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও এ ধরনের বিছিন্ন টুকরো টুকরো পদক্ষেপ সামগ্রিক সমস্যার সমাধান দেবে না। ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পর্কিত মালিক-শ্রমিকদের শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোর দুর্বৃত্তপনায় পরিবহনখাত বিপর্যস্ত, তা দমনে কোন কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

দেশের সব চাইতে বড় রপ্তানি আয়ের উৎস পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ছাঁটাই বন্ধের আন্দোলনের যে তীব্রতা চলতি বছরের শুরুতেই দেখা গেছে। সেই সমস্যারও যৌক্তিক ও মানবিক সমাধান দেখা যায়নি। দেশের ভিতরে অজানা ভয়ের কারণে এক ধরনের নীরবতা পালিত হলেও বিদেশে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর বিতর্ক চলছে। 

ক্ষমতাসীন দল এবং সরকারের তৈরি পোশাক ব্যবসায়ীদের জোরালো প্রতিনিধিত্বের কারণে বিষয়টিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। 

সম্প্রতি ফেনির মাদরাসার ছাত্রী নুসরাতের মর্মান্তিক মৃত্যু দেশকে আলোড়িত করেছে। নুসরাতের নিষ্ঠুরতার জন্য দায়ী মাদরাসার অধ্যক্ষের প্রতি মানুষ যতটা ক্ষুব্ধ,ঠিক ততটাই ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন দলের দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি, যারা অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা। একই ধরনের ক্ষোভ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি। ফেনীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একই ধরনের খবর আসছে। নোয়াখালি সুবর্ণচরের চার সন্তানের জননী ভোটের কারণে ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায়ও এই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও প্রশাসনিক প্রশ্রয় ছিল। এই দুর্বৃত্তায়ন বন্ধের জন্য  যে সুশাসন প্রয়োজন, তা বর্তমানে কাঠামোয় পাওয়া বেশ কঠিন। সমালোচিত নির্বাচনে অংশ নেয়া পুলিশদের পুরস্কৃত করার পর তাদের সংযত না করার ব্যবস্থা কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। 

ক্ষমতাসীন দল যাদের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করেন সেই বিরোধী দল বিএনপির হাতেগোনা আধাডজন সংসদ সদস্যকে যে কোনভাবে সংসদে নিয়ে যেতে পারলেই শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব পূরণ হবে, এমন ধারণা অমূলক। এই সংকট কাটাতে হলে বিরোধী দলকে আস্থায় আনতে হবে ও নির্বাচনের অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করা। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা বা একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যবত্তি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ