ঢাকা, রোববার 21 April 2019, ৮ বৈশাখ ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতে এবারের নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক আরো জোরদার

ভোটগ্রহণে ইভিএম ব্যবহারে বিতর্ক থাকছেই -ফাইল ফটো

সরদার আবদুর রহমান : ভারতে গত ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া লোকসভা নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক আরো জোরদার হয়েছে। তবে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার কাছে এই বিতর্ক তেমন মাত্রা ছাড়াতে পারছে না।
গত ১১ ও ১৭ এপ্রিল দু’দফা ভোটপর্ব অতিবাহিত হয়েছে। আগামী ২৩ মে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত আরো কয়েকদফায় সারা দেশে নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এর মধ্যে প্রথম দিনের ভোট হয় প্রধানত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কয়েটি জেলায়। পশ্চিম বঙ্গের কোচবিহার জেলায় শান্তিপূর্ণ ভোট হলেও প্রচুর অভিযোগ আসে ইভিএম নিয়ে। কোচবিহারে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অন্তত ৮০টি ইভিএমে গোলমাল দেখা দিয়েছে। জেলা তৃণমূল সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঘোষ অভিযোগ করেন, ‘এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো চক্রান্ত রয়েছে।’ রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের (সিইও) দফতর সূত্রে জানানো হয়, এদিন মকপোল চলার সময় ৫১টি ভিভিপ্যাটে এবং ভোট চলাকালীন ৬৫টি ভিভিপ্যাটে ত্রুটি ধরা পড়ে। ব্যালটে ত্রুটি ধরা পড়ে ০.০২ শতাংশ ইউনিটে। পরে দিল্লিতে কমিশন দফতর সূত্রে বলা হয়, ভোটপর্ব স্বাভাবিক ছিল। একটি বুথে ইভিএম নিয়ে গোলমালের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সেখানে পুনঃনির্বাচন করা হতে পারে। আলিপুরদুয়ারে তৃণমূলের জেলা সভাপতি মোহন শর্মার অভিযোগ, ‘জয়গাঁয়ের একটি বুথে প্রকাশ্যেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ভোটারদের বিজেপিকে ভোট দিতে আবেদন জানান। কুমারগ্রামের একটি বুথে ইভিএম-এ আমাদের প্রার্থীর বোতামটি ‘অকেজো’ করে রাখা হয়। আমরা ওই বুথে পুনঃনির্বাচনের দাবি তুলেছি।’ ১৭ এপ্রিল নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটের শুরুতে বিভিন্ন রাজ্য থেকে ইভিএম বিভ্রাটের খবর পাওয়া যায়। ফলে অনেক জায়গাতেই ভোট দেরিতে শুরু হয়। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিজেপি ছাড়া আর কোনো দলই ইভিএমের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। অনেক দল আবার কিছু ঘটনায় বিভ্রান্তও।
উল্লেখ করা যেতে পারে, ইভিএম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদরা এর প্রধান দু’টি গুরুতর সমস্যার কথা বলে আসছেন। এর প্রথমটি হলো, পছন্দের প্রতীকে ভোট দিলেও একটি নির্দিষ্ট প্রতীকে তা জমা হতে পারে। মেশিনটি চাইলে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা সম্ভব যে, নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক ভোটের পর বাকি সব ভোট একটা প্রতীকেই জমা হবে। হয়তো ভোটার দেখবে যে সে তার পছন্দের প্রতীকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু আসলে তা হবে না। দ্বিতীয় গুরুতর সমস্যা হলো, এতে ভোট পুনর্গণনার কোন সুযোগ নেই। ইভিএম মেশিনে ভোটার ভেরিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি নেই। একজন ভোটার ভোট দেবার পর তার কাছে একটা প্রিন্টেড স্লিপ আসতো, যাতে কোনো কারণে ভোট পুনর্গণনার প্রয়োজন হলে এটি কাজে আসতো। সেটি করা হয়নি। কারণ এই ব্যবস্থাটি রাখতে গেলে অন্য কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা সৃষ্টি হয়।
ইতোমধ্যে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো ব্যালট বাক্সে ফিরে আসার দাবি তুলতে শুরু করে। উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, ইউরোপের জার্মানিসহ বড় সব দেশ ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালটে ফিরে এসেছে। আমেরিকার প্রযুক্তিবিদরা ইভিএমের ত্রুটিগুলো সুনির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করেছে। আমেরিকার গণতন্ত্রের স্বার্থে ব্যালটে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। উন্নত দেশগুলো যদি ইভিএম বাদ দিয়ে ব্যালটে ফেরে তবে ভারতকে কেন ইভিএম-এ থাকতেই হবে? তবুও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত অব্যাহত রাখা হয়। এরপরও ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল জাতীয় কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ইভিএম নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছে। এই দলগুলো মনে করে, ইভিএম প্রযুক্তির ব্যবহার করে ভোট নয়ছয় করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। একজন রাজনৈতিক নেতা বলেন, ইতোপূর্বে উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের উপনির্বাচনে ইভিএম’র ফলাফল থেকে তাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। যারাই ভোট দিয়েছেন সেখানে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ঘরেই সব ভোট পড়ে। এতে জড়িত থাকায় ৬ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে কমিশন। এই যখন ঘটনা- তখন আগুনে ঘি ঢালেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দু’জন প্রযুক্তিবিদ। তারা দাবি করেন, ‘ইভিএম মেশিন হ্যাক করা সম্ভব।’ ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নেই বললেই চলে। তাদের কার্যকারিতা, সক্ষমতা ও সৎসাহস নিয়েও প্রশ্ন নেই। এমন একটি নির্বাচন কমিশনকেও ইভিএম নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন একজন পর্যবেক্ষক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ