ঢাকা, মঙ্গলবার 23 April 2019, ১০ বৈশাখ ১৪২৬, ১৬ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নুসরাত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আ’লীগ নেতা রুহুল আমিনের অপরাধের শেষ নেই

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের উত্থানের নেপথ্যে নানা তথ্য বের হয়ে আসছে। নানা ভাবে বিতর্কিত সোনাগাজী আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি রুহুল আমিনের অপরাধের শেষ নেই। গত শুক্রবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতারের পর তাকে নিয়ে চলছে সর্বত্র আলোচনা, সমালোচনা। শনিবার তাকে আদালতে হাজির করে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
এদিকে, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত সহপাঠী কামরুন্নাহার মনি গ্রেফতার। তাকে আগুন দেওয়ার সময় নুসরাতের শরীর চেপে ধরেন মনি। এর আগে তার সহযোগী শামীম, জাবেদ ও জোবায়েরের জন্য বোরকা ও হাতমোজা কিনে দেন তিনি। গতকাল সোমবার বিকালে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলাপকালে এমন তথ্য জানান মামলার তদন্তকারী কমকর্তা মো. শাহ আলম।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে , সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পেছনে অন্যতম কারিগর আ’লীগ নেতা রুহুল আমিন। একসময় পেটের তাগিদে সৌদি আরব চলে যান। সেখানে ট্যাক্সি চালিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। কোনোরকমে চলতো সংসার। জাতীয় পার্টির হাত ধরে রাজনীতিতে উত্থান হলেও অল্পদিনে উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে চলে আসেন রুহুল আমিন। বালুমহাল লুটসহ বহু অপরাধে জড়িত তিনি। অপরাধ কর্মকা- পরিচালনার জন্য গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। বালুমহাল সবসময় পাহারা দিচ্ছে তার ক্যাডার বাহিনী। নিজ দলের নেতাকর্মীরাও তার বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সোনাগাজীর বিভিন্ন স্তরের দলীয় নেতা, মাদরাসার একাধিক শিক্ষক-অভিভাবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
রুহুল আমিনের প্রতিবেশীরা জানান, সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উচিয়াঘোনা কেরানী বাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন। পড়াশোনা করেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। বড় ভাই আবুল কাশেম যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। তিনি সেখানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আরেক ভাই আবু সুফিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির রাজনীতি করেন।
দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্য ছিলেন রুহুল আমিন। একই বছর উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফয়েজুল কবিরের হাতে সোনাগাজী ফরিদ সুপার মার্কেটের সামনের এক সমাবেশে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কিন্তু কখনো দলে সক্রিয় ছিলেন না তিনি।
২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করেন। সেখানে ট্যাক্সি চালান। এরপর ২০০৯ সালের পর তিনি বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে গোপনে সম্পৃক্ত হন। প্রায় তিন বছর পরে হঠাৎ আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন রুহুল আমিন। এ সময় দলের অন্য নেতারা এর ঘোর বিরোধিতা করেন। অনেক তদবির করে অবশেষে ২০১৩ সালে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের সদস্য হন। এরপর ২০১৬ সালে নিজাম হাজারী এমপির আশীর্বাদে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।
২০১৫ সালে হঠাৎ সোনাগাজী ছাবের পাইলট হাই স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনীত হন। তখন থেকেই সোনাগাজীতে নানা অপকর্ম শুরু করেন রুহুল আমিন। ২০১৮ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় তাকে প্রথমে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে তাকে সভাপতি করা হয়। এরপর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রুহুল আমিন। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী।
এসময় ছোট ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প অংশের একটি বালুমহাল ও ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট এলাকায় আরেকটি বড় বালুমহাল সাবেক এমপি রহিম উল্যাহর লোকজন নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর রুহুল ও তার ক্যাডার বাহিনী এই দুটি বালুমহালের দখল নেন। এখনো দুটি বালুমহালে কয়েক কোটি টাকার বালু রয়েছে বলে জানায় স্থানীয়রা। প্রতিদিন তার ক্যাডাররা এসব পাহারা দিচ্ছে।
দলের একাধিক সূত্র জানায়, সোনাগাজী থানায় সালিশ ও তদবির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত রুহুল আমিনের ক্যাডাররা। আওয়ামী লীগের নেতা হলেও অন্যান্য দলের ক্যাডারদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক। এদের মধ্যে রয়েছেন খুরশিদ আলম, রুহুলের চাচাতো ভাই মিয়াধন ও তার ২০-২৫ জনের ক্যাডার বাহিনী।
তার বাহিনীতে আরও রয়েছেন ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার দুলাল ওরফে বাটা দুলাল, ইয়াবা বিক্রেতা হেলাল, সিরাজ ওরফে সিরাজ ডাকাত, আবুল কাশেম ওরফে কাশেম মাঝি, সাবমিয়া, ফকির বাড়ির গোলাপ, আব্দুল হালিম ও সোহেলসহ বেশ কয়েকজন। এদের হাতে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী।
এমনকি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য আবুল কালাম বাহারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে তার ক্যাডাররা। সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা স্বপন, চরদরবেশ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আহমেদ, মতিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ অনেকে বিভিন্ন সময় রুহুল আমিনের বাহিনীর হাতে মারধরের শিকার হন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা হওয়া সত্বেও রুহুলের অনুগত না হওয়ায় সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাধরণ সম্পাদক নুরুল আবসার, উপজেলা আওয়ামী লীগের উপতথ্য সম্পাদক আব্দুর রহিম খোকনসহ বেশ কয়েকজনকে পদ থেকে বাদ দেয়া হয়। এদের অনেকে এখন দলে নিষ্ক্রিয়।
সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সোনাগাজী পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মামুন ওই মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু ৬-৭ মাস আগে নানা কৌশলে শেখ মামুনকে বাদ দিয়ে রুহুল আমিন সদস্য মনোনীত হন। এক্ষেত্রে সিরাজের নানা অপকর্ম ধামাচাপা এবং নিজর প্রভাব বাড়াতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজই তাকে সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই রুহুল সহ-সভাপতি হয়ে যান। মাদরাসার মার্কেটের ১২টি দোকান, ভেতরের বিশাল পুকুরের মাছ চাষ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা উপায়ে আদায় করা বাড়তি টাকার ভাগ পেতেন রুহুল আমিন ও আরেক সদস্য কাউন্সিলর মাকসুদ। ক্যাম্পাসের বাইরে মাদরাসার রয়েছে জমিসহ কোটি টাকার সম্পদ।
মাদরাসার একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অধ্যক্ষ সিরাজ প্রায়ই বলতেন, ‘রুহুল, মাকসুদ এরা সবাই অশিক্ষিত। এদের সুবিধা দিয়ে আমাদের পক্ষে রাখতে হবে। এরা থাকলে দুইরকম সুবিধা। একদিকে এরা কোনো বিষয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। আবার সবসময় আমাদের পক্ষেও থাকবে।’
জানা যায়, সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার নানা দুর্নীতি ছাড়াও জমি দখল, পদবাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও অবৈধ বালু উত্তোলনসহ অসংখ্য অপরাধে জড়িত রুহুল আমিন ও তার ক্যাডার বাহিনী। অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেয়ায় ২০১৮ সালের ২৯ আগস্ট সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহেল পারভেজ এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরীন ফেরদৌসির বিরুদ্ধে মামলা করেন রুহুল আমিন। পরবর্তীতে মামলা প্রত্যাহার করেন। দলের প্রভাব খাটিয়ে পদ বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একইভাবে সোনাগাজী উপজেলার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। দলের প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার চরচান্দিায়া পূর্ব বড়ধলি মৌজায় শতাধিক ভূমহীনদের জমি দখল করেন রুহুল আমিন।
দলীয় সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফয়েজ কবির স্বপদে বহাল থাকা অবস্থায় রুহুল আমিন কীভাবে সভাপতি হলেন তা অনেকেই জানেন না। ফয়েজ কবির উপজেলা সভাপতি হিসেবে ফেনী জেলা পরিষদে প্রথমে সদস্য ও পরে প্যানেল চেয়ারম্যান হন।
ফয়েজ কবির বলেন, ‘আমি আমার পদ থেকে পদত্যাগ করিনি, আবার আমাকে বাদও দেয়া হয়নি। তাহলে অন্য কেউ কীভাবে এ পদের পরিচয় দিতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়। রুহুল আমিন কীভাবে সভাপতি হলেন আমি জানি না। তবে এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।’
এ বিষয়ে সাবেক এমপি রহিম উল্যাহ বলেন, ‘আমি ও ডাক্তার গোলাম মাওলা সোনাগাজী শহীদ ছাবের পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলাম। কিন্তু সোনাগাজী বাজারের পশ্চিমাংশের একটি পক্ষ হঠাৎ করে রুহুল আমিনকে সেখানে নিয়ে যায়। পরে অভিভাবক সদস্যসহ কয়েকজন সদস্যকে চাপ প্রয়োগ করে তাকে সভাপতি করতে বাধ্য করা হয়। তৎকালীন শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান রুহুলকে সভাপতি মনোনীত করলেও আমি আর সভাপতির চেয়ারে বসতে পারিনি। রুহুল আমিন ও তার লোকজন দফায় দফায় আমার ওপর হামলা চালায়।’

আগুন দেওয়ার সময় নুসরাতকে চেপে ধরেন মনি
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত সহপাঠী কামরুন্নাহার মনি। নুসরাতকে আগুন দেওয়ার সময় তার শরীর চেপে ধরেন মনি। এর আগে তার সহযোগী শামীম, জাবেদ ও জোবায়েরের জন্য বোরকা ও হাতমোজা কিনে দেন তিনি। গতকাল সোমবার বিকালে আলোচিত এই হত্যাকান্ড নিয়ে আলাপকালে এমন তথ্য জানান মামলার তদন্তকারী কমকর্তা মো. শাহ আলম।
তদন্ত কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ‘নুসরাতে সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল মনি। অথচ আগুন দেওয়ার সময় নুসরাতের শরীর চেপে ধরে সে। এর আগে তার সঙ্গে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া সহযোগীদের বোরকার ব্যবস্থাও করে দেয় মনি। নুসরাতের পা বেঁধে চলে যাওয়ার সময় মনি উম্মে সুলতানাকে শম্পা বলে ডাকে। এই শম্পা নামটি পপি ও মনির দেওয়া। এই কিলিং মিশনে আর কোনও ছদ্মনাম ব্যবহার হয়নি। মনি সব অপরাধ স্বীকার করে শনিবার (২০ এপ্রিল) আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে এই সব বলেছিল।’
এদিকে গতকাল সোমবার দুপরে সোনাগাজী পৌরসভার বাসস্টান্ড সংলগ্ন কারণ, নাহার মনির গ্রামে সরেজমিন গেলে স্থানীয়রা জানায়, মনি পৌরসভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ইমান আলী বাড়ির অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর কর্মকর্তা আব্দুল আজিজের মেয়ে। গত বছর একই উপজেলার নবাবপুর ইউপির মহদিয়া গ্রামের মেজবাউল খান মিলনের ছেলে রাজু আহাম্মদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মনি চার মাসের অন্তঃসত্বা। নুসরাতকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মনির অংশ নেওয়ায় তার ওপর ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী।
কামরুন নাহার মনিকে গত ১৫ এপ্রিল সোনাগাজী থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ১৭ এপ্রিল তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত। গত শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) মনিকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায় পিবিআই। সে সময় নুসরাতকে হত্যার বর্ণনা দেন মনি। তার দেয়া তথ্য মতে পিবিআই বোরকার দোকান পরিদর্শন করে।
শনিবার (২০ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কড়া নিরাত্তার মধ্য দিয়ে ফেনীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিন আহম্মদের আদালতে মনিকে হাজির করে করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী জবানবন্দি রেকর্ডের পর রাত ১০টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পিবিআই’র চট্টগ্রাম বিভাগের স্পেশাল পুলিশ সুপার মো. ইকবাল। তবে তদন্তের স্বার্থে তা উল্লেখ করেনি এই কর্মকর্তা।
নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিমের পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এসময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় অধ্যক্ষের ভাগ্নি পপি। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত।

দোষীদের শাস্তি চান আসামীদের স্বজনরাও
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় কঠোর শাস্তি চান আসামীদের স্বজনরাও। নিজের সহপাঠীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধ যারা করেছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া দরকার বলে দাবি করেছেন তারা।
নুসরাতকে হত্যার জন্য ডেকে নেওয়া ও পুড়িয়ে হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত অধ্যক্ষ সিরাজের শ্যালিকার মেয়ে মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী উম্মে সুলতানা পপি। সে উপজেলার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের শহিদুল ইসলামের মেয়ে। এ বিষয়ে শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘অধ্যক্ষ আমার ভায়রা। তিনি যে অপকর্ম করেছেন এতে তাকে আত্মীয় পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করি। তার অপকর্মের বলি হয়েছে আমার মেয়ে। পপি শুধু তার আত্মীয় হওয়ার কারণে তাকে ওই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আমি আমার মেয়েরও শাস্তি চাই।’
আসামী শাহদাত হোসেন শামীমের মা বিবি ফাতেমা বলেন, ‘একজন সহপাঠীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধ যারা করেছে তাদেরকে আমার সন্তান হিসাবে দেখতে চাই না। এরকম সন্তানের মা হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে চাই না। তাদের মৃত্যুর আগে আমার মৃত্যু হয়ে যাক। এদের উপযুক্ত শাস্তি হওয়া দরকার।’
তবে আসামী মো. জাবেদের পিতা রহমত উল্লাহ দাবি করেন, ‘জাবেদ অত্যন্ত সহজ-সরল ছেলে। সে এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে না। তবে যদি কারো সহযোগিতায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে তাহলে কিছুই বলার নেই।’
উত্তর চর ছান্দিয়ায় নূর উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া না গেলেও বাড়ির লোকজন জানায়, জড়িত সবার কঠোর বিচার হওয়া দরকার, যেন ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়।
এদিকে নুসরাত জাহান রাফির বড় ভাই মাহমুদ হাসান নোমান বলেন, ‘সারাদেশের জনগণের এখন দাবি রাফির খুনিদের উপযুক্ত বিচার। এ হত্যাকাণ্ডের যারা পরিকল্পনাকারী, মদতদাতা ও কিলিং মিশনে জড়িত তাদের অবশ্যই কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
এনায়েত উল্লাহ মহিলা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ফাতেমা আক্তার মনীষা বলেন, ‘নুসরাতের ঘটনা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের পথে সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়া জরুরি। এ ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের ভেতরে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানসিক চাপের কারণে আমাদের ফলাফল নিয়েও আমরা শঙ্কিত। এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কঠোর শাস্তি চাই।’
এদিকে নুসরাত হত্যায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিতে এ নৃশংস ঘটনার পর থেকে ফেনীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানান, এ হত্যার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ