ঢাকা, বুধবার 24 April 2019, ১১ বৈশাখ ১৪২৬, ১৭ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শেয়ারবাজারে বড় দরপতনে ডিএসইর লেনদেন কমে দুই’শ কোটি টাকার ঘরে

স্টাফ রিপোর্টার: দুই কার্যদিবস কিছুটা ঊর্ধ্বমুখীতা দেখা গেলেও গতকাল দেশের শেয়ারবাজারে আবার বড় দরপতন হয়েছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সবকটি সূচকের বড় পতন হয়েছে। সেইসঙ্গে ডিএসইর লেনদেন কমে আবার দুই’শ কোটি টাকার ঘরে নেমে গেছে। অব্যহত দরপতন রোধে কোনো কার্যকরি পদক্ষেপ নিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বরং বিএসইসির উদ্যোগে কারসাজি চক্র আরও উৎসাহিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডি।
শেয়ারবাজারে টানা দরপতনের মধ্যে সংবাদ আসে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। এই সংবাদের ভিত্তিতে গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও চলতি সপ্তাহের রোববার শেয়ারবাজারে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখীতার দেখা মেলে। এর আগে শেয়ারবাজারের ভয়াবহ মন্দার কারণে গত দুই সপ্তাহ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিক্ষোভ করেন। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের বেশ দৌড়ঝাঁপও দেখা যায়। দফায় দফায় বৈঠক করেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
তবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল দেশের বাইরে থাকায় পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারেননি। যে কারণে শবে বরাতের বন্ধ থাকলেও দেশে ফিরেই সোমবার বিএসইসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ওই রকম কোন এজেন্ডা নিয়ে বৈঠক করিনি। সামনে জাতীয় বাজেট আছে। পুঁজিবাজারের দিকে আমাদের খেয়াল আছে। অর্থনীতির সঙ্গে পুঁজিবাজারের একটা সম্পর্ক রয়েছে। পুঁজিবাজার ভালো হওয়া দরকার। এ সময় পুঁজিবাজার স্বাভাবিক আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে আগের দুই সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় দরপতনের প্রতিবাদে মঙ্গলবারও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিক্ষোভ করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এই বিক্ষোভ থেকে বিনিয়োগকারীরা বলেন, বৈঠক নিয়ে তাদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এবার হয়তো অর্থমন্ত্রী বাজারের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবেন। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। উল্টো গতকালকের বৈঠকের পর বাজারে আরও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল মঙ্গলবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৬২ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ২৬০ পয়েন্টে নেমে গেছে। অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৫ পয়েন্টে। আর ডিএসই-৩০ সূচক ২০ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৭২ পয়েন্টে নেমে গেছে। ডিএসইতে টাকার অঙ্কে লেনদেন হয়েছে ২৯৮ কোটি ৬২ লাখ। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৫৩ কোটি ২২ লাখ টাকা কম। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩৫১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এদিন ডিএসইতে ৩৪২টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২৬৭টির এবং দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ৪১টির।
অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএসসিএক্স ৯১ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৭৫৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। লেনদেন অংশ নেয়া ২৪১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৬টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৮৭টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৮টির।
এদিকে শেয়ারবাজারে কারসাজির সঙ্গে জড়িত দুষ্টচক্রকে থামাতে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বড় কোনো উদ্যোগ নেয় না- এমন অভিযোগ তুলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থকে বলা হয়েছে, অনিয়মের বিরুদ্ধে যে ধরনের অর্থদ- দেয়া হয় তাতে কারসাজি চক্র অনিয়ম করতে আরও উৎসাহিত হয়।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে বিএসইসির যে ধরনের জোরালো ভূমিকা নেয়ার কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিএসইসি পদক্ষেপ নেয় বটে, তবে বাজারের কারসাজি বন্ধে দুষ্টচক্র থামানোর যে উদ্যোগ নেয়ার কথা, সেক্ষেত্রে বড় কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। এমনকি এমন অভিযোগ রয়েছে- একজন যে পরিমাণ অনিয়ম করে থাকে, তার বিরুদ্ধে যে অর্থদ- হয়, তাতে এ ধরনের কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা আরও উৎসাহিত হন। তার কারণ আর্থিক দ- তার জন্য খুব বেশি সমস্যার না। সুতরাং সুশাসনের ক্ষেত্রে ছাড়া দিয়ে পুঁজিবাজারকে আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আগামী দিনে শেয়ারবাজার সংস্কারের ওপর সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এমন মন্তব্য করে তিনি বলন, আমরা সুশাসনের বিষয়ে ২০১০ সালেও বলেছি। এখনও সেই ঘাটতি রয়েছে। এখনও সুশাসনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছাড় দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকারের গত ১০০দিনে শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নে সুশাসন দেখা যায়নি।
শেয়ারবাজারের বর্তমান চিত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর পরই আমরা বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখলাম। এক মাস পর আবার সূচক আগের অবস্থানে চলে আসলো। এখানে কৃত্রিমভাবে শেয়ারবাজারের উল্লম্ফন করা হয়েছিল কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় এবং বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিককালে মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে। যেখানে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ওঠা-নামানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শেয়ারবাজারে এ ধরনের ওঠা-নামা হওয়ার কথা না। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ওঠা-নামা হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময় শেয়ারবাজারে কিছু সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে। এরমধ্যে একটি বড় সমস্যা প্লেসমেন্ট শেয়ার। এ নিয়ে গণমাধ্যমে নিউজ এসেছে। যেখানে ইনফরমাল মার্কেট গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে এবং সরকার বিষয়টি সংস্কারে কাজ করছে। এ সময় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক। তিনি বলেন, যে কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনা হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে যে রিপোর্টি জমা দেয়া হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে। এমনকি বিএসইসির চেয়ারম্যানও রিপোর্টগুলো নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। যে রিপোর্টগুলো তথ্য-উপাত্তের দিক দিয়ে ভুল। যেখানে অনেক ধরনের দুষ্টতা থাকতে পারে। যে কারণে নতুন কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার কিছুদিন পরে অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে যায়। এখান থেকে প্রতিয়মান হয় যে, কোম্পানিগুলো যেভাবে এবং যারা মূল্যায়ন করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় কোনো ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ