ঢাকা, বুধবার 24 April 2019, ১১ বৈশাখ ১৪২৬, ১৭ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

ইবনে নূরুল হুদা : ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন (Climate change)-এর নেতিবাচক প্রভাব একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জৈব প্রক্রিয়া, পৃথিবীর বিকিরণের পরিবর্তন, ভূত্বক গঠনের পাততত্ত্ব (plate tectonics) ও  আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত জলবায়ু পরিবর্তনের নিয়ামকগুলোর অন্যতম। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু পরিবর্তন বলতে পৃথিবীতে সাম্প্রতিককালের মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকেই বোঝানো হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ ও বাতাসসহ বিভিন্ন সূচকের পরিবর্তন হয় ও পরবর্তীকালে পৃথিবীপৃষ্ঠে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন অনুসন্ধান, গবেষণা ও তত্ত্বীয় প্রকল্পের মাধ্যমে অতীত এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু উপলব্ধি করতে নিরলসভাবে কাজ করছেন। যা জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা, ধরন ও বৈশ্বিক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ভূমন্ডলের তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটিই গ্রিন হাউস প্রভাব। ভূমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, অনাকাক্সিক্ষত খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পৃথিবীর পরিবেশ বিপর্যয়সহ জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে।
‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বিষয়ক ব্যাখ্যা এক এবং অভিন্ন নয়। এই পরিবর্তনের ধরন, প্রভাব, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সাথে সমাজবিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীদের বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। পরিবেশবিদদের ভাষায়, অ্যানথ্রোপোজেনিক ক্লাইমেট চেঞ্জ বা মনুষ্যসৃষ্ট আবহাওয়া পরিবর্তন আর পৃথিবীর নিজস্ব নিয়মে জলবায়ু পরিবর্তন এক বিষয় নয়। এ অবস্থায় আমাদের পরিবেশ-সংক্রান্ত নীতিগুলো ক্রমশ অ্যানথ্রোপোজেনিক গ্লোবাল ওয়ার্মিং শব্দের সমার্থক হয়ে উঠছে। যেমন বৈশ্বিক উষ্ণতা শব্দটি কেবল ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নির্দেশ করে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা থেকে শুরু করে গ্রিনহাসউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধির কারণগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০১৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক কনফারেন্স কপ-২২ বা সিএমপি-১১-এর কথা এখানে উল্লেখ করা জরুরি। সেই কনফারেন্সে নীতিনির্ধারকদের আলোচনা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে খানিকটা আশাবাদী করেছিল। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত গ্রিনহাইস গ্যাস নির্গমন প্রশমিত করতে একটি সমঝোতায় পৌঁছেন। কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর জন্য সম্মত হন তারা। চুক্তির সম্মতিপত্র বাস্তবায়নের ব্যাপারে হতাশা সত্ত্বেও সার্বিকভাবে সকল পক্ষই একমত হয় যে, কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ওপর। এ দুই ক্ষমতাধর দেশের প্রতিনিধিরা যদি বিদ্যুৎ ও জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ডি-কার্বোনাইজ পদ্ধতিকে সক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে, তাহলে কার্বন নিঃসরণের অগ্রগতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এ বিষয়ে জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম উল্লেখ করার মত।  কারণ, দেশ দু’টি নবায়নযোগ্য ও বায়ুশক্তি ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।
পরবর্তী বছরে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত জলবায়ু-বিষয়ক সম্মেলন বিগত সময়ের তুলনায় ২০১৬ সালকে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে উল্লেখ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৫ সালে যা বৃদ্ধি পেয়ে ৪০০ পিপিএম (পার্ঁস পার মিলিয়ন) পৌঁছেছে।
এদিকে মরক্কোর জলবায়ু সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্বনেতাদের বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক প্রচেষ্টা গ্রহণের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাবকে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্রেফ গুজব হিসেবে অভিহিত করেন। এমনকি তিনি প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহরের ঘোষণা দেন। ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮৭টি দেশ মিলে বৈশ্বিক ঊষ্ণতার মাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানোর অঙ্গীকারের বিপরীতে ট্রাম্পের অবস্থান বিশ্বনেতৃবৃন্দ ইতিবাচক হিসেবে নেয়নি।
এ বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য হলো, প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডেও অর্থায়ন না করার ঘোষণা দেন। জলবায়ু নিয়ে ট্রাম্পের এমন অবস্থান ১৯৯২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কিয়োটো প্রটোকল থেকে সরে আসার কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় কিয়োটো প্রটোকল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ  দুই দশক অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কপ-২২এ যে ‘গ্লোবাল কার্বন বাজেট ২০১৬’ ঘোষণা করা হয় তার লক্ষ্য ছিল যেসব দেশ অভিযোজন ও প্রমোশনের চেষ্টা করছে, তাদের সাহায্য করা। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মোতাবেক অনেক দেশ প্রয়োজনীয় সাহায্য না করায় এ লক্ষ্য প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। লক্ষ্যণীয় যে, কার্বন বিষয়ক জটিলতা নিয়ন্ত্রণে যেসব পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিলা, সে বিষয়ে অনেক দেশই ছিল বেশ উদাসীন। সাধারণভাবে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোয় পুনর্বনায়ন, কার্বন স্টোরেজ, বায়োগ্যাস ব্যবহার বৃদ্ধি ও উপকূলে বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নে ফান্ড নিতান্তই অপ্রতুল।
সার্বিক দিক বিবেচনায় জলবাযু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ কপ-২২ প্রয়োজনীয় গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৭টি দেশের মধ্যে ১০৯টি দেশ প্যারিস চুক্তি অনুমোদন করেছে এবং এটি কার্যকর হয়েছে ৪ নভেম্বর, ২০১৬ থেকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ প্যারিস চুক্তির ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন’ জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে হস্তান্তর করেছে। বাংলাদেশ নিজ উদ্যোগে নিজস্ব আর্থিক সম্পদ দিয়ে ৪০০ মিলিয়ন ডলার তহবিলের ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং হ্রাস নিয়ে অনেক দেশের নতুন করে চিন্তাভাবনার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ। ২০১৭ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে সই করেন। এতে ‘কয়লার বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ও ‘কর্মসংস্থান হত্যাকারী নিয়মগুলোর’ ইতি টানার কথা জোরালো ভাবে উল্লেখ করা হয়। এই এনার্জি ইনডিপেনডেন্স এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে পূর্বসূরিদের নেয়া আধা ডজনের বেশি পদক্ষেপও স্থগিত করা হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো যারা নির্বাচনের সময় ট্রাম্পকে সহযোগিতা করেছিল তারা ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের প্রশংসা করছে।
মূলত পরিবেশ নিয়ে পূর্বসূরী বারাক ওবামার চেয়ে একেবারে ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওবামা মনে করতেন, জলবায়ু ‘পরিবর্তন সত্যিই হচ্ছে এবং এটিকে উপেক্ষা করা যাবে না’। এখন যেসব উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ক্লিন পাওয়ার প্লান্ট। এটিতে স্টেটগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা বলা হয়েছে প্যারিস চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পূরণে। ট্র্যাম্পের সমর্থনকারীরা বলছেন যে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত তেল ও গ্যাস খাতে লাখো কর্মসংস্থান তৈরি করবে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্দেশ করেননি। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে চার বছর লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের হতাশা সৃষ্টি করেছে। তবে বিভিন্ন দেশ যেমন কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি, চীন, ভারত ও ইইউ প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে নিজেদের পণ ও সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বহাল রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জাতিসংঘের এক মুখপাত্র বলছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা উন্নীত করার বৈশ্বিক প্রচেষ্টার জন্য এটি চরম হতাশার বিষয়।
গত বছরের ডিসেম্বরে পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কাতোভিচে হয়েছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৪। ১৯৬টি দেশের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। বৈশ্বিক ঊষ্ণায়ন মোকাবেলায় ২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২২-এর প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করা যায় সেটাই ছিল কপ-২৪-এর টান টান উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার বিষয়। প্যারিস সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পযুগের আগের তুলনায় দুই ডিগ্রির মধ্যে এমনকি সম্ভব হলে দেড় ডিগ্রির মধ্যে রাখার বিষয়ে একমত হন। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি তত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। জাতিসংঘ বলছে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ বর্তমানের তুলনায় ৫৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে যে হারে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হচ্ছে তাতে চলতি শতকের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে।
পোল্যান্ডের কাতোভিচের এ সম্মেলনে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকিতে থাকা দেশগুলোকে রক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করা এবং ধনী দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় এ খাতের বৈশ্বিক কর্মসূচি পরিচালনায় ২০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই অর্থ আগামী ২০২১-২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর সময়ে ব্যয় করা হবে।
প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি বা ১.৫ ডিগ্রির মধ্যে রাখা এবং জলবায়ু তহবিল গঠন ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল গাছ, মাটি ও সমুদ্র প্রাকৃতিকভাবে যতটা গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করতে পারে, ২১০০ সাল থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃত্রিমভাবে গ্রিনহাইস গ্যাসের নিঃসরণ সেই পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যা আগামী দিনের পৃথিবী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খুবই ইতিবাচক হবে।
কপ-২৪ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগেই বিশেষজ্ঞরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বকে রক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছে। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়নের চেয়েও বেশি কিছু করার দরকার এখন এবং বিশ্বকে রক্ষায় আরো বেশি উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ হুমকিতে থাকা দেশ ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলো তাই আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করেছিল কপ-২৪-এ যেন কপ-২২-এর প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর আগে আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেসে ২০১৮ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও বিশ্বনেতারা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে প্যারিস চুক্তি অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এতে বাধ সাধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের বছরই প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কপ-২৪-এ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য তেল উৎপাদনকারী দেশ যোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, কুয়েত ও রাশিয়া ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক ডাটার দিকেই আঙুল তুলেছে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার সঙ্গী তিন দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর বিপক্ষে যাচ্ছে, যার অর্থ হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সর্বসম্মত চুক্তির বিরোধিতা করা। বিষয়টি এখন এমন দাঁড়াচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তিতে থাকছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল এবারের সম্মেলনে দাবিও জানিয়েছিল যে, গ্রিন হাউস নিঃসরণকারী দেশগুলোকে তাদের বর্তমান নিঃসরণের হারের ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনে অর্থায়ন করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে অতীতের নিঃসরণের কোনো হিসাব-নিকাশ করা যাবে না। সম্মেলনের একেবারে শেষদিকে এসে কার্বন ক্রেডিট মনিটরিং নিয়ে ব্রাজিলের সঙ্গে অন্যান্য দেশের মতের ভিন্নতা দেখা দেয়। এসব কারণে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয়ে নির্ধারিত সময়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি।
কপ-২৪ সমাপ্তি ঘটেছে প্যারিস চুক্তি ‘বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এখন সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব হলো চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নির্ধারিত কার্যক্রমগুলো এগিয়ে নিয়ে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন করা। যাতে আগামী দিনের মানুষসহ প্রাণীকুল একটি সুস্থ্য-সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পৃথিবীতে স্বাচ্ছন্দ্যে নিঃশ্বাস নিতে পারে। এক্ষেত্রে কোন পক্ষের উদাসীনতা বা নিলিপ্ততা কাম্য নয় বরং সংশ্লিষ্ট সকলকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ