ঢাকা, বুধবার 24 April 2019, ১১ বৈশাখ ১৪২৬, ১৭ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জন কীটস

আখতার হামিদ খান : শীর্ণকায় শরীর ছিল তাঁর। গড়পড়তা পুরুষদের তুলনায় একটু বেঁটেই। নাচতে পছন্দ করতেন না, উচ্চতা কম ছিল বলে নারীদের সঙ্গে যুগল নাচে বেখাপ্পা লাগত তাঁকে। তবে আয়ত চোখ আর কোঁকড়ানো লালচে-খয়েরি চুলে অসামান্য মায়াময়ই লাগত কবি জন কিটসকে। পরবর্তীকালে সবাই তাঁকে চিনেছে সৌন্দর্যের কবি হিসেবে। তাঁর কবিতা যে কোনো দিন পড়েনি, সেও শুনেছে এন্ডিমিয়ন-এর বিখ্যাত সেই লাইন, ‘আ থিং অব বিউটি ইজ আ জয় ফরেভার’।
ভালোবাসতেন ভায়োলেট ফুল, ভালোবাসতেন শেক্সপিয়ার। জানা যায়, তাঁর প্রিয় নাটকের একটি হলো কিং লিয়ার আর প্রিয় অভিনেতা সে সময়ের শেক্সপিয়ার পারদর্শী এডমান্ড কিন। ধ্রুপদী গ্রিক সাহিত্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল আগাগোড়াই। চার হাজার লাইনের এন্ডিমিয়ন, যাকে তৎকালীন ব্ল্যাকউডস এডিনবরা ম্যাগাজিন একেবারে উড়িয়ে দিয়েছিল। সমালোচক বলেছিলেন, কিটসের উচিত কবিতা লেখাই ছেড়ে দেওয়া, সেটি গ্রিক পুরাণের এক চরিত্রকে নিয়ে লেখা। হাইপেরিয়নও তা-ই। কিন্তু সমালোচক জন গিবসন লকহার্ট বড় নিষ্ঠুরভাবে আক্রমণ করেছিলেন জন কিটসকে। বলেছিলেন, কিটসের শব্দচয়ন অতি নিম্নমানের, ভাষাও আঞ্চলিকতাদুষ্ট। তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, কিটস যেন চিকিৎসাশাস্ত্রেই জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেন।
সমালোচকের এই পেশাগত কটাক্ষের কারণ অনাথ কিটসকে ১৬ বছর বয়সে শল্যচিকিৎসকের সহকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কবিতা তাঁকে এমন করেই ডেকেছিল, তিনি চিকিৎসা পেশা ছেড়ে মনোনিবেশ করেছিলেন কবিতায়। পারিবারিক দায়িত্ব আর আর্থিক প্রতিকূলতা ছিল। কিন্তু সবই পায়ে ঠেলেছেন। চিকিৎসক হলে হয়তো খুব সফল হতে পারতেন, কে জানে হয়তো বেঁচেও থাকতে পারতেন আরও বছর কয়েক বেশি। অন্তত সচ্ছলতা তো থাকত জীবনে। কিন্তু তাহলে সাহিত্যের জগতে বিরাট এক ক্ষতি হয়ে যেত। কবিতার আকাশে ‘উজ্জ্বল নক্ষত্র’ হয়ে জ্বলতে থাকা কিটসকে দেখতে পেত না এ পৃথিবী। ‘ব্রাইট স্টার’ নামের সংকলনের কবিতা আর পত্রাবলি পড়লে মনে হবে, শুধু সৌন্দর্য নয়, প্রেমেরও কবি তিনি। বলেছিলেন, ‘ভালোবাসাই আমার ধর্ম, প্রেমের জন্যে আমি মরতেও পারি।’
পরমবন্ধু শেলি বরাবরই তাঁর পাশে ছিলেন। শেলির মতে, সমালোচকদের তীর্যক মন্তব্য কিটসকে যতটা ভেতর থেকে ভেঙেচুরে দিয়েছিল, ততটা ক্ষয়রোগও হয়তো দেয়নি। বাগদত্তা ফ্যানি ব্রাউন ছিলেন কিটসের মূর্তিমতী প্রেরণা। বলা হয়ে থাকে, ফ্যানি ব্রাউনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই কবিতায় আরও বেশি স্ফূরণ ঘটেছিল ক্ষণজন্মা এই কবির। ফ্যানিকে লেখা তাঁর চিঠি সর্বকালের সেরা প্রেমপত্রগুলোর তালিকায় স্থান পেয়েছে। ১৮২১ সালে মাত্র ২৫ বছর ৪ মাস বয়সে রোমে মারা যান কিটস। তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল তাঁর প্রিয়তমার একগুচ্ছ চুল আর না খোলা চিঠিসহ। ফ্যানি আমৃত্যু পরেছিলেন তাঁর দেওয়া বাগদানের আংটিখানা। ফ্যানিকে লিখেছিলেন, ‘এমন প্রায়ই মনে হয়, আমরা দুজন যদি হতাম প্রজাপতি আর বাঁচতাম গ্রীষ্মের তিনটে দিন তোমার সঙ্গে অমন তিন দিন যে আনন্দে ভরে তুলতে পারতাম, তা হতো সাদামাটা পঞ্চাশটি বছরের চেয়েও ঢের বেশি।’
কিটসের মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক আর জল্পনাকল্পনার অন্ত নেই। সাম্প্রতিক (২০১২) এক গবেষণায় নিকোলাস রো কিটসের ব্যক্তিজীবনের কিছু তথ্য খুঁজে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন উচ্চাভিলাষী এই কবির মৃত্যুর পেছনে যক্ষ্মা ছাড়া আরও কিছু কারণ ছিল। রোর মতে, কিটস ছিলেন সুরা আর আফিমে আসক্ত। যক্ষ্মার উপশমের জন্য নয়, সম্ভবত সিফিলিস বা গনোরিয়া ধরনের কোনো অসুখের জন্য তিনি ব্যবহার করতেন পারদ-সংবলিত কোনো ওষুধ।
কিটসের প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউনের অ্যাম্ব্রোটাইপ, আনুমানিক ১৮৫০
কোনো চিকিৎসকের পরামর্শে নয়, নিজে নিজেই দাওয়ায় দিতেন নিরাময়ের। এই রোগগুলোর কোনো একটিতে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন, নাকি বংশানুক্রমিকভাবে তা পেয়েছিলেন তা নিয়েও তর্ক আছে। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে আর সন্তানদের ছেড়ে যাওয়ার কারণে শৈশবেই ক্রনিক অ্যাংজাইটিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। ১৮১৮ সালে ছোট ভাই টম কিটসের মৃত্যুশোক ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল তাঁকে। যৌবনের প্রারম্ভে অমিত সম্ভাবনা পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হওয়ার আগেই চলে গিয়েও সর্বকালের সেরা ইংরেজ কবিদের তালিকায় তাঁর নাম চিরস্থায়ী হয়ে আছে কবির অনন্য সৃষ্টিসম্ভারের জন্য।
জন কিটস এখনো অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২০০ বছর পরের পাঠককে তৃপ্ত করতে পারার পেছনে অনেক কারণ আছে। রোমান্টিক কবিতার যেটি প্রধান বৈশিষ্ট্য-অনুভূতির সরস বর্ণনা, হোক তা প্রেমের, বিষাদের কিংবা হতাশার, যেকোনো আবেগের, যেকোনো মুগ্ধতা বা উচ্ছ্বাসের সাবলীল প্রকাশ, সেটি কিটসের কবিতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। কবিতা সম্পর্কে তাঁর মতামত ছিল সোজাসাপ্টা, খুব স্পষ্ট। প্রকাশন জন টেইলরের কাছে এক চিঠিতে বলেছেন, ‘গাছের পাতা যেমন প্রাকৃতিক উপায়ে জন্মায়, কবিতারও তেমনই স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিতে হয়, নতুবা সে কবিতার না আসাই ভালো।’
‘ওড টু নাইটিংগেল’-এ কিটস বুলবুলির গানকে বলেছেন ব্যথানাশক, বলেছেন সে গান সুন্দর, কারণ তাতে মানবজীবনের যন্ত্রণা নেই। কল্পনাশক্তিকে প্রাধান্য দিতেন তিনি। শেলির কাছে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, ‘আমার কল্পনা হলো এক দেবালয়, আমি তার পুরোহিত।’ নিজে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়েও বলতেন বিজ্ঞানের তথ্য আমাদের কল্পনাকে নষ্ট করে, আমরা হারিয়ে ফেলি সৌন্দর্যবোধ। লামিয়াতে রংধনু নিয়ে বলেছিলেন রংধনু তৈরি হওয়ার কার্যকারণটি জেনে ফেললে তা দেখে মুগ্ধ হওয়া আর হয়ে ওঠে না।
‘ওড’-কে সরাসরি বাংলা করে বলা যায় ‘গাঁথা’, কিন্তু এই এক গাঁথা বা স্তবগানমূলক কবিতায় যে কত ভিন্নতা থাকতে পারে, বৈচিত্র্য থাকতে পারে তা কিটসকে না পড়লে বোঝা সম্ভব নয়। ‘ওড অন আ গ্রেসিয়ান আর্ন’, ‘ওড অন ইনডলেন্স’, ‘ওড টু সাইকি’ কিংবা ‘ওড অন মেলানকলি’ শ্রেণিবিন্যাসের দিক দিয়ে একই জনরায় হলেও বিষয়বৈচিত্র্যে একেবারে ভিন্ন, প্রতিটি তার নিজের মতন, প্রতিটির প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া আলাদা। লকহার্টের মতো যেসব সমালোচক নিওক্লাসিসিজম দ্বারা আবিষ্ট থেকে কিটসের প্রতিভাকে অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন শুরুতে, তাঁদের হার মানতে হয়েছে ওডগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর।
রবীন্দ্রনাথ ভীষণ মুগ্ধ ছিলেন কিটসে। তাঁর দর্পহরণ গল্পে নির্ঝরিণী দেবীর স্বামী তাকে ‘ওড টু নাইটিংগেল’ অনুবাদ করে শোনান। ইন্দিরা দেবীকে লেখা এক পত্রে কবিগুরু জানিয়েছিলেন তাঁর মুগ্ধতার কথা। ‘যত ইংরাজ কবি জানি, সব চেয়ে কীটসের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা আমি বেশী অনুভব করি...কীটসের ভাষার মধ্যে যথার্থ আনন্দসম্ভোগের একটি আন্তরিকতা আছে। ওর আর্টের সঙ্গে আর হৃদয়ের সঙ্গে বেশ সমতানে মিশেছে-যেটি তৈরি করে তুলেছে সেটির বরাবর তাঁর হৃদয়ের একটা নাড়ীর যোগ আছে।...কীটসের লেখায় কবিহৃদয়ের স্বাভাবিক সুগভীর আনন্দ তাঁর রচনার কলা-নৈপুণ্যের ভিতর থেকে একটা সজীব উজ্জ্বলতার সঙ্গে বিচ্ছুরিত হতে থাকে। সেইটে আমাকে ভারী আকর্ষণ করে। কীটসের লেখা সর্বাঙ্গ সম্পূর্ণ নয় এবং তাঁর প্রায় কোনো কবিতারই প্রথম ছত্র থেকে শেষ ছত্র পর্যন্ত চরমতা প্রাপ্ত হয়নি, কিন্তু একটি অকৃত্রিম সুন্দর সজীবতার গুণে আমাদের সজীব হৃদয়কে এমন ঘনিষ্ঠ সঙ্গদান করতে পারে।’
মাত্র ৫৪টি কবিতা জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে পেরেছিলেন কিটস, ছোট-বড় মিলিয়ে বাকি সব কাজ বেরিয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরে। কিছু চিঠিপত্র লিখেছেন প্রেমিকা আর বন্ধুদের, সেগুলোও নিঃসন্দেহে সাহিত্যভান্ডারের অমূল্য সম্পদ। লিখেছেন বছর ছয়েক। প্রকাশিত কবি হিসেবে বেঁচে ছিলেন মোটে চার বছর। মৃত্যুর পরেও বহুদিন সেই অর্থে জনপ্রিয় হননি। কিটসের অকালপ্রয়াণে শোকাভিভূত শেলি লিখেছিলেন দীর্ঘ এলিজি অ্যাডোনেইস। পরবর্তীকালে কিটস অনুপ্রেরণা হয়েছেন অনেক কবি আর লেখকের জীবনে। প্রকৃতি, প্রেম, সত্য আর সুন্দরের পূজারী জন কিটস নাইটিংগেলকে বলেছিলেন ‘অমর’। আসলে কিটস নিজেই অমর হয়েছেন তাঁর সৃষ্টিতে, তাঁর দর্শনে। ‘সত্য সুন্দর, আর সুন্দরই সত্য, এটুকুই জানতে পার, এটুকুই জানা জরুরি’-কিটসের মতন করে আর এ কথা বলতে পেরেছে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ