ঢাকা, শুক্রবার 26 April 2019, ১৩ বৈশাখ ১৪২৬, ১৯ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন ও ইভিএম নিয়ে কিছু কথা

এইচ এম আব্দুর রহিম : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সারা দেশে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বিরোধীদলবিহীন একতরফা এ নির্বাচনে অধিকাংশ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী  স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি, অল্প কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীমাত্র নির্বাচিত হয়েছে। বর্তমান নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে বিএনপি নানারকম জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন দীর্ঘদিন ধরে জেলখানায় আছেন। তাঁর মুক্তি প্রক্রিয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়া, না নেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকা- ইত্যাদি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্দীপনার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কারণ তারা সরকারের পক্ষ থেকে কঠিন চাপের মুখে রয়েছে। 

তবে এ কথা  সত্য যে, শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া একটি স্বাধীন দেশের রাজনীতি বা গণতন্ত্র চলতে পারে না। কাজেই সার্বিকভাবে বলতে গেলে বিএনপির জন্য নয়, দেশের জন্য এটা মঙ্গলজনক নয়। দেশ চলবে, উন্নয়ন হবে Ñ কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে বলে মনে করি না। এমনিতে গণতন্ত্রের যে এলিমেন্টÑ সুন্দর ও সুসংহত গণতন্ত্রের যে উপাদান, তা তো এখন নেই। বাংলাদেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের একটি সংসদে আছে, অন্যটি বাইরে আছে। দল হিসাবে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করছে। অথচ বিএনপি তথা ২০ দলকে রাজপথে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। এটা কোনো ভাল বিষয় নয়। 

বিএনপি এখন নানাভাবে বিপর্যস্ত। তাদের টপ অফ দ্য পার্টি খালেদা জিয়া জেলে আছেন এবং তিনি খুবই অসুস্থ। এখন হাসপাতালে কাটছে রাত-দিন। তার এক ছেলে মারা গেছেন এবং আরেক ছেলে তারেক রহমান বিদেশে, যিনি দেশে পা দিতে পারছেন না। তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি বলা যায়, এক রকম নির্বাসিত। ফলে নানা প্রতিকূলতায় জোরদার আন্দোলন তারা গড়ে তুলতে পারছে না। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কিছু উড়ো কথা শোনা যাচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে প্যারোলে মুক্তির কথা এসেছে। কিন্তু খালেদা জিয়া সেটা নিতে চান না। এটা তাদের ভাল সিদ্ধান্ত বলা যায়। এখানে আর একটি বিষয় আছে, যদিও এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলেছে, জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি থেকে ৬ জন সদস্য এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা চাইলে সংসদে নিয়ম অনুযায়ী যোগ দিতে পারবেন। কিন্তু ৩০ এপ্রিলের মধ্যে যোগ না দিলে তাদের পদ বা সুযোগ রহিত হয়ে যাবে। তবে এখানে প্রশ্ন তোলা যায়Ñ এই নগণ্যসংখ্যক সংসদ সদস্য সংসদে গিয়ে কি করবেন? তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন? কোনো প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন? আবার এখানে অসুবিধা আছে, তারা যদি বিএনপি থেকে সংসদে যান তাহলে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া হয়। বিএনপি তো নির্বাচন বর্জন করেছে। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলে তা স্ববিরোধী হবে নয় কি ? এসব নিয়ে জটিলতা আছে। এ অবস্থায় বিএনপি কী করবে এ জন্য আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

 আমাদের দেশে নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নৈতিক  ভিত্তি আস্থা হারিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যে নির্বাচন পূর্বাপর শৃঙ্খলা ও পদ্ধতি দেখা যায়, তার সাথে এর বৈশিষ্ট্যগত মিল নেই। ফলে এ কমিশনের অধীনে নির্বাচন সম্ভব হবে কি-না তা ভেবে দেখতে হবে। এমনকি ভারতে এত জনসংখ্যা, সেখানে ৯০ কোটি ভোটার, তারা সেখানে সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচন করতে পারছে। প্রভাব জোরজবরদস্তি থাকলে সেটা গৌণ। সেখানে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো সহিংসতা হয় না, মানুষ মারা যায় নাÑ এমন নয়। কিন্তু মূল নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে আগামী দিনের নির্বাচন কীভাবে হবে। কীভাবে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়।

কিন্তু বিএনপিকে সরকারের পক্ষ থেকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তবে বিএনপি কি করল আর কি করল নাÑ সেটা কোনো বিষয় নয়। দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা লাগবে। যারা সরকারের অনৈতিক কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করবে। যাতে গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত থাকে। নইলে মস্তবড় ক্ষতি। এটা শুধু বিএনপির ক্ষতি নয় দেশের জন্য বড় ক্ষতি। 

  এদিকে চলতি বছরের পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাই। পাঁচ ধাপে ৪৮০টি উপজেলা পরিষদে অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের প্রথম ধাপের নির্বাচন ১০ মার্চ ৭৮টি উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয়।

ইতোমধ্যে চতুর্থ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী পঞ্চম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন রমযানের পর জুন মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হবে। চলমান পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, আট দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত আন্দোলন, মুসলিম লীগসহ আরো কয়েকটি নিবন্ধিত ইসলামী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। 

অর্থাৎ পঞ্চম উপজেলা পরিষদ  নির্বাচন বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়নি। নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চার ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে গড়ে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল কমবেশি ৪০ শতাংশ। তবে গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এ পর্যন্ত চার ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সব চাইতে কম ভোট পড়েছে যা ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এটা সিলেটের সুরমা উপজেলায়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও সিটি নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা প্রধান বিরোধীদলগুলোর উপজেলা নির্বাচন বর্জন ত্বরান্বিত করেছে। এ নির্বাচনে শুধু অনিয়ম ঘটেনি বরং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার ওপর আস্থা হারিয়েছে জনগণ।

আলী ইমাম মজুমদার লিখেছেন, ‘দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলে কোনো দলের নির্বাচন বর্জনের সুযোগ ছিল না। অভাব হতো না প্রার্থীর। সে ধরনের অংশ গ্রহণমূলক নির্দলীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকতেন ভোটাররা। প্রার্থীরা ছুটতেন তাদের দ্বারে দ্বারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অবস্থান আজ বিপরতিমুখী’ (প্রথম আলো ১০ এপ্রিল)। ১ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, চার ধাপে মোট ৪৪৫টি উপজেলায় ভোট হয়েছে। ৪৪৫ টির মধ্যে ১০৭টি অর্থাৎ ২৪ শতাংশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান- এই তিন পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ৩০ উপজেলায় কোনো ভোটের আয়োজন করতে হয়নি।

মোট ৫০ জন ভাইস চেয়ারম্যান এবং ৫৯ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই। ৫ এপ্রিল সাপ্তাহিক হলিডের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত যে ৪৪৫টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেসব উপজেলা পরিষদের ৩২০টি শাসক দল আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন। অবশিষ্ট নির্বাচিত চেয়ারম্যান প্রায় সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। তবে এদের অধিকাংশই বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং তাদের দলে প্রত্যাবর্তন সময়ের ব্যাপারমাত্র। সুতরাং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গ্রাম পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। 

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মেয়রের শূন্য পদে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ১৮টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ১৮টি নব গঠিত ওয়ার্ডে  সাধারণ কাউন্সিলর এবং ১২টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে। ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের প্রধান আকর্ষণ ডিএনসিসি মেয়র পদে মাত্র ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। ডিএনসিসি মেয়র পদে সব চাইতে কম ভোট পড়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সুতরাং আগামীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ অন্যসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে মূল শাসক দল  আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণে যে অনেকটা একতরফা নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা জোর দিয়ে বলা যায়। 

২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচন হয় নির্দলীয়ভাবে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৪-২০১৮ মেয়াদে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন)-২০১৫; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) আইন-২০১৫ এর মাধ্যমে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতস্ত্র প্রার্থীদের এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য ঘোষণা করা হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অবসান ঘটে। স্থানীয় সরকারগুলোর প্রধান নির্বাহী পদে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সমাজের বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছিলেন, এর ফলে সমাজে, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে হাজার বছরের সামাজিক বন্ধনে ফাটল ধরবে। দলীয় আনুগত্যের কারণে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সদভাব নষ্ট হবে।

আগে নির্দলীয় নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর দলীয় পরিচয় সম্পর্কে জনগণ অবহিত থাকত না। প্রার্থীরা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সব ভোটারের কাছে ভোট প্রার্থনা করতেন। এখন তা সহজ হবে না।

দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হলে বিভিন্ন দলীয় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি, মারামারির সমুহ সম্ভাবনা থেকে যাবে। তাছাড়া স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হলে প্রভাবশালী, বিত্তশালী ও রাজনৈতিক দাপট থাকা মন্দ লোক নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ প্রশস্ত হবে। 

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বহুদলীয় অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচন Ñ সে নির্বাচন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হোক। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বহুদলীয় ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অভাবে বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সূচকে আমরা পিছিয়ে আছি। এ অবস্থা থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে।

 এদিকে ইসি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহ পর বলেছিলেন, সংসদ নির্বাচনে কমিশন ইভিএম ব্যবহার করবে না। ১০ জুলাই ২০১৭ সালে ঘোষিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। অথচ, সংসদ নির্বাচনের আগে ইসি থেকে বার বার বলা হয়েছিল, যন্ত্রে ভোট হলে জালভোট রোধ, দ্রুত ফলাফল প্রকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষে যেসব নির্বাচনী এলাকায় ইভিএমে ভোট হয়েছিল সেখান থেকে ফলাফল এসেছে সবচেয়ে পরে। তা ছাড়া আরপিও  সংস্কার নিয়োগ কমিশন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ করেছিল, তখন সরকারি দল বাদে অন্য সবাই কমিশনকে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করতে পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু নিজ ওয়াদা ও সরকারি দল বাদে বাকী সব দলের সংলাপে প্রদত্ত পরামর্শ উপেক্ষা করে সরকারি পরামর্শে ইসি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। এ ছাড়া ২লাখ টাকা দরে ইভিএম মেশিন ক্রয় করে মাত্র ৬টি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকায় (ঢাকা-৬ ও ১৩, চট্রগ্রাম-৯, খুলনা-২, রংপুর-৩ ও সাতক্ষীরা-২) একগুঁয়েমী ইভিএমে ভোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আর এটা করতে যেয়ে লেজেগোবরে অবস্থা তৈরি করে সমালোচিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন। (তিনি বলেন ভোটের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সভর্তি বন্ধ করতে ইভিএম ব্যবহার শুরু করা হবে। (যুগান্তর ০৮.০৩.২০১৯)। সিএইসির এ বক্তব্যের মাধ্যমে যারা একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘মিডনাইট ইলেকশান’ বলে সমালোচনা  করেছিলেন, তাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়। প্রযুক্তি অসচেতন ও স্বল্প শিক্ষিত ভোটারের দেশে ইভিএমে ভোট নিতে গেলে এ রকম অনেক ধরনের সমস্যা হয়। কিন্তু আমাদের ইসির গায়ের চামড়া অনেক মোটা।

তারা এসব সমস্যা জানার পরও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তাতে মনে হয়, এ ইসির ইভিএমের নেতিবাচক পারফরমেন্সের পরও ইভিএম প্রেম কমেনি।

 পরবর্তীকালে উপজেলা নির্বাচনে আংশিক ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে কমিশন ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২ হাজার ২০০টি ট্যাব ক্রয় করে। এই ট্যাবগুলো ভুল তথ্য পাঠিয়ে ইসির ট্যাব ব্যবহারের মাধ্যমে ইভিএমের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। ট্যাবের এ ভূতুড়ে তথ্য প্রেরণের ফলে চতুর্থ পর্বের উপজেলা নির্বাচনে আর ইসি ট্যাব ব্যবহার করেনি। প্রশ্ন উঠেছে, ৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন তাহলে ৪২ সহস্রাধিক ট্যাব ক্রয় করা হল ? “পৃথিবীর বহু দেশে ইভিএম ব্যবহার হয় এটা নির্বাচন কশিমনের যুক্তি এবং তারা সীমিত আকারে ব্যবহার করবেন বলে বলেছিল।” মজার বিষয় হচ্ছে, ইউরোপে, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইতালি ও ফ্রান্সসহ অনেক দেশ ইভিএম ব্যবহার করে না। জার্মানির সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকে অসাংবিধানিক হিসাবে আদেশ দিয়েছেন। ইউরোপের বড় দেশগুলো ইভিএম ব্যবহার শুরু করে নির্ভরযোগ্য নয় বলে ফিরে গেছে ব্যালটে। মার্কিন প্রযুক্তিবিদদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে ব্যালটে ফিরে যেতে হবে। ইতোমধ্যে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশে ইভিএম ভেঙ্গে ফেলায় জনসেবা পার্টির এক প্রার্থী গ্রেফতার হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারেও ঘটেছে ইভিএম ভাঙচুর। রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ৮০টি ইভিএমে বিভ্রাট ঘটায় অভিযোগ তুলে ওই সব বুথে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছেন। ভারতের মতো প্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ভোটারের দেশে যখন ইভিএম বর্জনের চেষ্টা চলছে, তখন তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তি অসচেতন বাংলাদেশের মতো দেশে ইসির নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য অতি আগ্রহ প্রদর্শন রহস্যজনক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ