ঢাকা, শুক্রবার 26 April 2019, ১৩ বৈশাখ ১৪২৬, ১৯ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শ্রীলংকার মুসলিমরা

২৫ এপ্রিল, সাউথ এশিয়ান মনিটর : ইস্টার সানডে উদযাপনকালে শ্রীলংকার বিভিন্নস্থানে বোমা হামলায় প্রায় তিনশ মানুষ নিহত ও পাঁচশ’র বেশির আহতের ঘটনায় স্থানীয় একটি চরমপন্থী মুসলিম গ্রুপ জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশে পর দেশেটির মুসলিম সম্প্রদায় প্রচ- ধাক্কা খেয়েছে। শ্রীলংকা তাওহিদ জামাহ (এসএলটিজে)’র একটি দলছুট অংশ ন্যাশনাল তাওহিদ জামাহ (এনটিজে)’র বিরুদ্ধে রোববার ছয়টি চার্চ ও রেসর্ট এবং আরো দুটি জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটনোর তদন্ত চলছে। চার্চ ও পাঁচটি পাঁচ তারকা রেসর্টে আত্মঘাতি হামলা চালানো হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আত্মঘাতী হামলকারীদের একজন এর আগে কেগালি জেলার মাওয়ানিল্লায় বুদ্ধমুর্তি ভাঙ্গার দায়ে গ্রেফতার হয়েছিলো বলে জানা যায়।

সোমবার বিকেলে কলম্বোর পেত্তাহ এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাস থেকে ৮৭টি ডেটনেটর উদ্ধার করা হয়। তাছাড়া একটি ভ্যানের মধ্যে পেতে রাখা আরেকটি বোমা নিস্ক্রীয় করা হয়। ভ্যানটি কোচ্চিকাদিতে সেন্ট এন্টনি’র গির্জার দিকে যাচ্ছিল। রোববার এই গির্জাতেই বোমা হামলা হয়েছে।

বোমা হামলার হোতাদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে শ্রীলংকার মুসলমানরা তাদের দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। জানা গেছে শ্রীলংকার মুসলমানরা এসএলটিজে এবং চরমপন্থী তৎপরতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে তদন্তকারীদের সহায়তা করেছেন। এই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল রাজিককে ২০১৬ সালে বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। পরে তিনি ক্ষমা চেয়ে মুক্তি পান। নতুন গ্রুপ এনটিজে-কে রোববারের বিস্ফোরণের জন্য সন্দেহ করা হচ্ছে। দুটি বিস্ফোরণ ঘটানো হয় কলম্বোর উপকণ্ঠ দেহিবেলা ও দেমাতাগোদা এলাকায়। 

এই হামলার পেছনে বিদেশী হাত রয়েছে কিনা সে বিষয়ে গোয়েন্দারা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তবে আইএসআইএস হামলার কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। চরমপন্থী গ্রুপটির উপর নজর রাখা সাইট ইনটেলিজেন্স জানায় যে শ্রীংকায় হামলার পর আইএসআইএস সদস্যরা উল্লাস প্রকাশ করে এবং বলে যে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার প্রতিশোধ নিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।  সাইট ইনটেলিজেন্সের পরিচালক রিতা কাতজ জানিয়েছেন যে আইএস-এর সমর্থকরা অনলাইনে হত্যাযজ্ঞের ছবি নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছে। এটা ঠিক বিস্ফোরণের যে মাত্রা ও যেভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিস্ফোরণগুলো ঘটনো হয়েছে তা স্থানীয় কোন মুসলিম গ্রুপের সামর্থ্যরে বাইরে। এই মাত্রার কোন সন্ত্রাসী কর্মকা- তাদের দ্বারা কখনো হয়নি। স্থানীয় মুসলিম তরুণদের দীক্ষা দেয়ার পর তাদেরকে এই কাজে ব্যবহার করায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় আতংকিত হয়ে পড়েছে।

তদন্তে এফবিআই, ইন্টারপোল ও অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের সহায়তা নেয়া হবে বলে শ্রীলংকার প্রতিরক্ষা সচিব হেমাসিরি ফার্নান্দো ঘোষণা করেছেন। বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ৪ এপ্রিল সরকারকে এ ধরনের হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করলেও সরকার কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ৪৮ ঘন্টা এমনকি হামলার কয়েক মিনিট আগেও সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে।

আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কেন তা উপেক্ষা করা হলো তা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিঙ্গে। কয়েকজন মন্ত্রী টুইট করেন যে তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার তথ্য ছিলো। এমনকি একজন খ্রিস্টান মন্ত্রী এও বলেন যে তার পিতা সম্ভাব্য হামলার আশংকায় ইস্টার সার্ভিসে যোগ দিতে নিষেধ করেছিলেন।

এদিকে এই ঘটনার জের ধরে শ্রীলংকার ১০ শতাংশ মুসলিম নাগরিকরা যেন কোন ক্ষতির সম্মুখিন না হয় তা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মুসলিমরা এমনিতেই বুদ্ধিস্ট চরমপন্থী গ্রুপ বুদু বালা সেনা (বিবিএস) দ্বারা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। রোববার হামলার পরপরই টুইটার ছাড়া সব সামাজিক গণমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়। ক্ষতিকর ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানো কারণেই গত মার্চে আমপারা ও ক্যান্ডিতে মুসলিম-বিরোধী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিলো বলে ধারণা করা হয়।

রোববারের মর্মান্তিক ঘটনার সময় প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা বিদেশে সফরে ছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তার। কিন্তু সফরে যাওয়ার আগে তিনি কাউকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভার দিয়ে যাননি। সরকারের মুখপাত্র মন্ত্রী রাজিথা সেনারতœ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা স্বীকার করেছেন।

এদিকে শ্রীলংকার মুসলিম কাউন্সিলের সদস্যরা জানিয়েছেন যে তারা তিন বছর আগেই চরমপন্থী ব্যক্তিদের ব্যাপারে দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সতর্ক করেছেন এবং তাদের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করতে সকল নাম ও বিস্তারিত বিবরণও দিয়েছিলেন।

মুসলিম সম্প্রদায়ের সূত্রগুলো জানায়, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে দেখা যায় যে ৯০-১০০ লংকান তরুণ মুসলিম চরমপন্থা গ্রহণ করেছে।

ইতোপূর্বে গ্রেফতারের পর কয়েকজন সন্দেহভাজন চরমপন্থীকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য কয়েকজন মুসলিম মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনাও রয়েছে। ২০১৬ সালে আইনমন্ত্রী বিজয়দাসা রাজাপাকসা পার্লামেন্টে জানিয়েছিলেন যে শ্রীলংকা থেকে সুশিক্ষিত মুসলিম পরিবারের ৩২ জন তরুণ সিরিয়ায় গিয়ে আইএস-এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। কিন্তু মুসলিম রাজনীতিকরা রাজাপাকসার বক্তব্যকে বর্ণবাদ আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেন এবং এর নিন্দা  জানান। তবে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে শ্রীলংকায় বৌদ্ধ চরমপন্থার উত্থান মুসলিম মৌলবাদের উত্থান নিয়ে আলোচনাকে কঠিন করে তোলে। এই আলোচনার জের ধরে বৌদ্ধ চরমপন্থীরা শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের টার্গেট করতে পারে বলে আশংকা করা হয়। বিশেষ করে শ্রীলংকার পূর্বাঞ্চলে ওহাবিজমের উত্থানের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরমপন্থার উত্থান লক্ষ্য করা যায়।

তবে এখন শ্রীলংকায় চরমপন্থার বিস্তার রোধের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং টুইটারে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও তরুণ রোববারের হামলায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন এবং মুসলিমদেরকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ও জাতিগত বিভক্তির বিষয়টি তুলে ধরতে কলম্বোভিত্তিক সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ কাজ করছে। তারা ইসলামের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরার জন্য গত দুই বছর ধরে অন্য ধর্ম বিশ্বাসীদের জন্য নিয়মিত মসজিদ সফরের ব্যবস্থা করে আসছে। এই সংগঠনটি সব ধরনের চরমপন্থার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রদান ও পোস্টার ছাপিয়ে বিলিও করেছে।

রোববার জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠকের পর সরকার সকল উপাসনালয়, টুরিস্ট হোটেল, হাসপাতাল, দূতাবাস, ক্যাথলিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সুরক্ষায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে। ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সকল ক্যাথলিক স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সারা দেশে সেনা ও বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ