ঢাকা, শনিবার 27 April 2019, ১৪ বৈশাখ ১৪২৬, ২০ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পদুয়ার ঘটনা আমাদের অতীতদর্পণ

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : গত ১৮ এপ্রিল ছিল আমাদের দেশের ইতিহাসে একটি বিজয়ের দিন। গৌরবের দিন। কিন্ত অনেকেরই সে বিজয়-গৌরবের কথা মনে নেই। আমরা আত্মবিস্মৃত জাতি কিনা! তাই নিজের গৌরবের কথাও আমরা ভুলে যেতে বসেছি। বিস্মৃত হয়েছি।
২০০১ সালের এদিনে স্বাধীনতার ৩০ বছর পর আমাদের প্রিয়দেশ প্রথম বহিঃশত্রু দ্বারা প্রত্যক্ষ আক্রমণের শিকার হয়। সৈন্যসংখ্যা এবং অস্ত্র অনেক কম থাকবার পরও পরিপূর্ণ বিজয় অর্জন করেন সেদিন আমাদের জোয়ানরা। কিন্তু আমরা এতোটাই আত্মবিস্মৃত জাতি যে, এমন গৌরবের দিনটিকেও মনে রাখবার প্রয়োজন বোধ করিনি। কিন্তু কেন? আমাদের ভেবে দেখা খুব প্রয়োজন।
ঘটনার শুরু ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে যখন তৎকালীন বিডিআর চিফ মেজর জেনারেল (অব) ফজলুর রহমান জানতে পারেন যে, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষাবাহিনী বিএসএফ নোম্যান্স ল্যান্ডের ওপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে বাংলাদেশের এলাকা পদুয়া দখল করে নিয়েছে এবং সেখানে তাদের অস্থায়ী বিএসএফ ক্যাম্প করেছে। বিডিআরের পক্ষ থেকে বারবার প্রতিবাদ করবার পরও ভারতীয় পক্ষ থেকে কোনও সহযোগিতা করা হলো না। এমনকি ফ্ল্যাগমিটিংয়েও রাজি হলো না। বাংলাদেশের সার্বভৌম এলাকার ওপর এরকম অনাকাক্সিক্ষত আচরণে এপ্রিলের ১৫-১৬ তারিখ রাতে মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানের নির্দেশে চার শ’র মতো সৈনিক পদুয়ায় মুভ করে এবং সেখানে স্থাপিত অবৈধ বিএসএফ ক্যাম্প ঘেরাও করে ফেলে।
উল্লেখ্য, বিএসএফ-এর ওখানে প্রায় ৭০ জনের মতো সৈনিক ছিল। মাত্র ছ’টা ফায়ার করবার পরই বিএসএফ সৈন্যরা সেখানে সারেন্ডার করে। বিডিআর পদুয়ার পূর্ণনিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৬ তারিখে নেগোসিয়েশন শুরু হলো ভারতের সঙ্গে। কথা ছিল নেগোসিয়েশন চলাকালে উভয় পক্ষই সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। এই নেগোসিয়েশন যখন ডাহুকিতে চলছিল, তখনই প্রতিবেশী দেশের জোয়ানরা বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলাদেশের অজান্তে ১৮ এপ্রিল ভোরের আলো ফোটার আগেই, ওখান থেকে প্রায় দুশ’ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারি উপজেলার বরাইবাড়ি এলাকার বিডিআর ক্যাম্প এবং ঐ এলাকাটি দখলে নেবার উদ্দেশ্যে  ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিএসএফ এর সমন্বয়ে গঠিত প্রায় ৫০০ সৈনিক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে এবং আগ্রাসন চালায়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রতি বন্ধুদেশের এ কেমন আচরণ তা সবাইকে যেমন বিস্মিত করে, তেমনই বিশ্ববিবেকও হতবাক হয়।
স্বাধীনতা অর্জনের তিন দশকের মাথায় এটাই ছিল বহিঃশত্রু দ্বারা আমাদের দেশ প্রথম আক্রান্ত হবার ঘটনা। সেখানে তখন বিডিআরের মাত্র ১১ জন সদস্য ছিল। ভারতীয় সৈন্যদের আকস্মিক গুলিতে শহীদ হন বিডিআর এর ল্যান্স নায়েক মুহাম্মদ ওহিদুজ্জামান। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ভয়ের পরিবর্তে আগুনের মতো জ্বলে ওঠেন বিডিআর এর বাকি ১০ জোয়ান। দুটোমাত্র সাবমেশিন গান আর অন্য সাধারণ অস্ত্র নিয়ে দু’দিক থেকে ভারতের বিশাল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। প্রথম প্রতিআক্রমণেই ভারতীয় বাহিনীর ১৭-১৮টা লাশ পড়ে যায়। হানাদার বাহিনীকে ওখানেই আটকে রাখা হয়। এরই মধ্যে মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানের নির্দেশে ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনা থেকে প্রায় চারশ’ সৈনিক সেখানে মুভ করে এবং দশটার দিকে ওখানে পৌঁছে যায়। ওপেন গ্রাউন্ডে হানাদারবাহিনীর সঙ্গে প্রচ- যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। হানাদারবাহিনী আগেই থমকে গিয়েছিল। বিডিআর এর পূর্ণ প্রতিআক্রমণে দিশাহারা হয়ে তারা পালাতে থাকে। বাংলাদেশের সীমানায় ফেলে যায় ১৮টা মৃতদেহ। সঙ্গে নিয়ে যায় আরও প্রায় ১৭৪টি । হানাদারবাহিনীর কিছু সৈন্য দিগ-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যাবার সময় আটক হয়। বাংলাদেশের পক্ষে মোট তিনজন জোয়ান শাহাদতবরণ করেন। হানাদারবাহিনী পরাজয় মেনে নিয়ে পালিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, গত ১৮ই এপ্রিল ছিল আমাদের সেই বিজয়ের গৌরবময় দিন। আমরা কেউ হয়তো স্মরণ করিনি আমাদের সেই অকুতোভয় বীরদের যারা দেশের জন্য আল্লাহর নামে বুকটান করে দাঁড়িয়েছিলেন পাঁচগুণ বেশি শত্রুবাহিনীর সামনে এবং ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিজয়। তবে ইতিহাস একদিন ঠিকই মূল্যায়ন করবে এই বীরদের। নায়েব সুবেদার আবদুল্লাহ, হাবিলদার নজরুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক ফজলুল হক, ল্যান্স নায়েক ওয়াহিদুজ্জামান, সেপাই মোয়াজ্জেম হোসেন, ইদ্রিস আলী, আবদুল হামিদ, লিটন মিয়া, বদরুজ্জামান, এফএস এর নায়েক জালালউদ্দিন মিয়া ও সেপাই ইসহাক আর তাদের যোগ্য নেতা মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানকে। আমরা তাঁদের ভুলবো না কোনওদিন। অনেকের ধারণা, পিলখানায় যে বিডিআর হত্যাকা- সংঘটিত হয় সেটা ছিল পদুয়ায় পরাজয়ের পরোক্ষ প্রতিশোধ। সেদিন নাকি অচেনা সুসজ্জিত সামরিক গাড়িতে অনেকে নির্বিঘেœ পালিয়ে যায়। তারা কারা ছিল? এর উত্তর কোনওদিন পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
কোলকাতা থেকে জয়প্রকাশ বিশ্বাস আমাকে লেখেন, ‘তাঁদের দেশ আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি। আমরা গরুর গোশত খাই বলে আমাদের মাথা মোটা হয়েছে।’
জয়প্রকাশ ঠিক বলেছেন। তাঁরা হচ্ছেন ভগবান। তাঁরা ৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের উদার হস্তে সাহায্য-সহায়তা করেছিলেন বলে স্বাধীনতা পেয়েছি। তাঁদের অবদান ছাড়া আমরা জাতি হিসেবে দু’দিনও টিকতে পারতাম না। কিন্তু আমরা তাঁদের মহান অবদান কখন অস্বীকার করলাম?
জয়প্রকাশকে বলতে চাই, আপনি বলেছেন, আমরা গরুর গোশত খাই কিনা, তাই আমাদের মাথা মোটা। অর্থাৎ বুদ্ধি স্থুল। কিন্তু এটাতো আপনাদের ঠাকুর-পুরোহিতরাই তৃপ্তিসহকারে ভক্ষণ করেছেন। কোনও কোনও যজ্ঞে সহ¯্র সহ¯্র গরু মেরে ঠাকুর-দেবতাদের খাওয়ানো হয়েছে। এ ইতিহাস আপনার জানা থাকবারই কথা। এছাড়া কমবয়সী ষাঁড়গরু না হলে অতিথি আপ্যায়নই হতো না। এজন্য অতিথিকে বলা হতো ‘গোঘœ’। কী জয়প্রকাশ বাবু, মনে নেই এসব? তাই মাথা মোটাতো থাকবার কথা আপনাদেরই।
আপনারা এখন ওপার থেকে গরু আসতে দিতে চান না। উপযুক্ত মূল্য দিয়ে কেউ কিনে আনলেও সীমান্তে পেলে পাখির মতো করে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশিদের হত্যা করেন। হয়তো আপনাদের দেবতা আমরা খেয়ে ফেলি বলে একটু রাগটা বেশি ওঠে। তাই না? তবে পদুয়ার ঘটনা যদি পুনরায় ঘটে তাহলে কিন্তু খবর আছে, হ্যাঁ।
পদুয়ার ঘটনা প্রমাণ করে এদেশের মানুষ ভীতু নয়। আগ্রাসীদের রুখে দিতে জানে। কখনও কখনও মরে। তবে মেরেই মরে। ছেড়ে দেয় না। পদুয়ায় ভিনদেশি আগ্রাসন ঠেকাতে তারই প্রমাণ দিয়েছে বীর বাঙালি। এক আগ্রাসীকে মেরে চেংদোলা করে আনবার দৃশ্যটি কে না দেখেছেন? এ দৃশ্য আগ্রাসীদের সবসময়ই আতঙ্কিত এবং সন্ত্রস্ত করে রাখবে বহুদিন।
কাঁটাতারের ফাঁক গলিয়ে অনেককিছু ঢোকে এদেশে। যেমন : হেরোইন, ফেন্সিডিল, গাঁজাসহ বহুবিধ মাদক। আবার ঈদ, কুরবানিসহ বিভিন্ন পার্বণে কাপড়, প্রসাধনী। লুটে নেয়া হয় অঢেল অর্থ। অবৈধভাবে অনেক ভারতীয় অনুপ্রবেশ করে। এমনকি চাকরিবাকরি করেও প্রচুর অর্থকড়ি নিয়ে যায়। কেবল গরু আসতে মানা। অবশ্য অনেকে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে কিছু গরুতো পাঠায়ই। শুধু দোষ কোনও বাংলাদেশি সীমান্তের কাছে গেলে। তাকে গুলি করে মারা হয়। কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে গিয়ে জুলুমও করা হয়। কিন্তু কেন? এমন অমানবিক আচরণের মানে কী দাঁড়ায়?
প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের অবশ্যই বন্ধুত্ব থাকবে। যাতায়াত থাকবে। বৈঠক বা দহলিজে এসে বসতেও পারে প্রয়োজনে। এমনকি প্রতিবেশীর কোনও কোনও নির্মল পর্ব-পার্বণে অংশগ্রহণ করতেও তেমন বাধা নেই। কিন্তু প্রতিবেশীকে অন্দরমহলে নিয়ে আসা যেমন ঠিক নয়, তেমনই তা বিপজ্জনক হতে পারে। এমনকি অন্যের চোখে তা বিসদৃশ এবং অবিমিশ্র বলেও বিবেচিত হতে পারে। তাই বন্ধু এবং প্রতিবেশী হয়েও কিছু পার্থক্য বা দূরত্ব থাকা জরুরি বৈকি।
প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে। প্রতিবেশীসুলভ সম্প্রীতির আচরণও করবো। বিপদে-আপদে একে অন্যের সাহায্যের হাতও বাড়াবো। কিন্তু সব অতীত ভুলে যেতে হবে এমন নয়। কারণ অতীত বিবেচনা করেই আমাদের এগুতে হবে। অতীতের শিক্ষাগ্রহণ থেকেই সামনের পথ চলতে হবে। বলা যায়, অতীতের দর্পণ থেকেই ভবিষ্যতের দর্শন ঠিক করতে হবে। পদুয়ার ঘটনা আমাদের সেই অতীতদর্পণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ