ঢাকা, রোববার 28 April 2019, ১৫ বৈশাখ ১৪২৬, ২১ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দিল্লীর মসনদে এবারও বসবে গেরুয়া বসন

আসিফ আরসালান : আসমুদ্রহিমাচল ভারত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে ছিল ভারতবর্ষ। দেশ বিভাগের পর হলো ভারত বা পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে ভাগ হলো আর এক বার। এবার ভারত ভেঙে হলো ৩টি রাষ্ট্র্। এগুলো ভারত পাকিস্তান ও বাংলদেশ। ৩টি রাষ্ট্র হওয়ার পরেও ভারত একটি বিশাল রাষ্ট্র। জনসংখ্যা ১৩০ কোটি। সেই ১৩০ কোটির মধ্যে ৯০ কোটি হলো ভোটার। এখন তারা ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। ৭টি পর্যায়ে এই ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যেই ৩টি পর্যায়ে ভোট হয়ে গেছে। বাকি রইলো ৪টি পর্যায়। গত ১১ এপ্রিল থেকে ভোট শুরু হয়েছে। ভোট শেষ হবে ১৯ মে। ফলাফল বের হবে ২৩ মে। ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থা বাংলাদেশের তুলনায় সামান্য জটিল। বাংলাদেশে কোনো প্রদেশ নাই। একটি মাত্র দেশ, তার একটি মাত্রই কেন্দ্র। তাই একটি মাত্র রাজধানী। এ জন্য রাষ্ট্র বিজ্ঞানের পরিভাষায় বাংলাদেশকে বলে এক কেন্দ্রিক রাষ্ট্র বা ইউনিটারি স্টেট। কিন্তু ভারতে ২৯টি প্রদেশ এবং ৭টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল। প্রতিটি প্রদেশে একটি করে সরকার আছে এবং একটি করে রাজধানী আছে। প্রতিটি প্রদেশের রয়েছে একটি করে বিধান সভা। সোজা করে বলতে গেলে প্রাদেশিক পরিষদ। বিধান সভার নির্বাচনে শুধু মাত্র সেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যটির ভোটাররাই ভোট দেয়। ভোট দিয়ে প্রাদেশিক সরকার বানায়। প্রাদেশিক সরকারের প্রধানকে বলা হয় চিফ মিনিস্টার বা মূখ্য মন্ত্রী। তার থাকে একটি মন্ত্রী সভা। প্রাদেশিক সরকার গুলো মোটামুটি স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে থাকে। তবে পররাষ্ট্র বানিজ্য, প্রতিরক্ষা, মুদ্রা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং এগুলো প্রদেশের বাইরে থাকে।
ভারতের রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রের সংসদ বা আইন সভা দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট। ইংরেজিতে Bi Cameral Legislature. দুই কক্ষের মধ্যে নিম্ন কক্ষটিকে বলা হয় লোকসভা। লোকসভার মোট ৫৪৫টি আসন। এর মধ্যে ৫৪৩টি আসনে নির্বাচিত হন ২৯টি রাজ্যের নির্বাচিত প্রতিনিধি। আর দুইটি আসন এ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের জন্য সংরক্ষিত। লোকসভার ৫৪৩টি আসন নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। যেমন ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস করেন উত্তর প্রদেশে। উত্তর প্রদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ৪২ লক্ষ। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। এই প্রদেশের লোকসভার আসন সংখ্যা ৮০টি। ২য় অবস্থানে রয়েছে মহারাষ্ট্র। জনসংখ্যা ১১ কোটি ৪২ লক্ষ। লোকসভায় আসন সংখ্যা উত্তর প্রদেশের পর সর্বাধিক আসন রয়েছে মহারাষ্ট্রের। আসন সংখ্যা ৪৮টি। এরপর ৪২টি আসন রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের। বিহারে রয়েছে ৪০টি আসন। তামিল নাডুর রয়েছে ৩৯টি আসন। সুতরাং আসন বরাদ্দের নিরিখে ভারতের কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই ৫টি রাজ্যের। এই ৫টি রাজ্যকে নির্বাচনের নিরীখে বলা হয় হার্টল্যান্ড স্টেটস। যে দল বা জোট এই ৫টি রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে সেই দল বা জোটের পক্ষে কেন্দ্রে তথা দিল্লীতে সরকার গঠনের সম্ভাবনা উজ্জল হয়ে ওঠে।
এখন সারা ভারতে লোকসভার নির্বাচন চলছে। কোনো ক্ষেত্রে বিধানসভা এবং কোনো ক্ষেত্রে রাজ্যসভার নির্বাচনও চলছে। তবে সেগুলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে তেমন একটি প্রাসঙ্গিক নয়।
আমরা আগেই বলেছি যে ভারতে রয়েছে ২৯টি প্রদেশ এবং তাদের রয়েছে ২৯টি বিধানসভা ও ২৯টি প্রাদেশিক সরকার। ২৯টি রাজ্য মিলে ভারত নামক দেশটি গঠিত। তাই এই দেশটি আমেরিকার মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র বা ফেডারেল স্টেট। আগেই বলেছি যে বাংলাদেশ ইউনিটারি স্টেট। সুতরাং প্রিয় পাঠক ভাইয়েরা বুঝতে পারছেন যে রাষ্ট্র এবং সরকার গঠনে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। এতক্ষণ ধরে যা বলা হলো সেটি ছিল আমাদের আজকের লেখার মুখবন্ধ। এখন আমরা মূল আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি। অর্থাৎ যে নির্বাচন চলছে সেই নির্বাচনে কোনো দল বা কোনো জোট কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে পারে।
॥দুই॥
আমরা দেখেছি যে লোকসভায় রয়েছে ৫৪৩টি নির্বাচনী আসন। এই ৫৪৩ এর অর্ধেকের বেশি যে দল বা জোট আসন পাবে তারাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করবে। ৫৪৩ এর অর্ধেকের বেশি আসন হলো ২৭২। এটিকে ভারতীয় রাজনীতিতে বলা হয় ম্যাজিক নাম্বার। অর্থাৎ এই ম্যাজিক নাম্বার যে দল বা জোট পায় সেই দলের বা জোটের ভাগ্যে দিল্লীর মসনদের শিকা ছেঁড়ে। গত নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি একাই পেয়েছিল ২৮২ টি আসন। অর্থাৎ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য বিজেপির কোনো জোটের প্রয়োজন ছিল না। তবুও সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য কয়েকজন শরীককে নিয়ে নরেন্দ্র মোদি এনডিএ বা ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক এ্যালায়ান্স গঠন করেছিলেন। এবারের নির্বাচনে ভারতবাসী এবং সেই সাথে বিশ^বাসীর প্রশ্ন নরেন্দ্র মোদি কি এবারও গত বারের মতো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসবেন এবং সরকার গঠন করবেন? দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বলেন যে, নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি এবার একা একা ম্যাজিক নাম্বার অর্থাৎ ২৭২টি আসন পাবেনা। নরেন্দ্র মোদি যে জোট গঠন করেছেন সেই জোটও গত বারের মতো ২৮২টি আসন পাবেনা। তবে তাদের আসন সংখ্যা কমে যাবে ঠিকই, কিন্তু তারা ম্যাজিক নাম্বার অর্থাৎ ২৭২ এর কিছু বেশি পাবে এবং কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করবে।
আগেই বলা হয়েছে যে, নরেন্দ্র মোদির বিজেপি একাই পেয়েছিল ২৮২টি আসন। আর তার জোটসহ পেয়েছিল ৩৩৬টি আসন। এর বিপরীতে ২য় সর্ব ভারতীয় দল কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ৪৪টি আসন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইইনাইটেড প্রগ্রেসিভ এ্যালায়ান্স (ইউপিএ) পেয়েছিল মাত্র ৬০টি আসন। এবার ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। এবার বিজেপির একক আসন কমে যাবে, এনডিএর মোট আসন কমে যাবে। পক্ষান্তরে কংগ্রেসের একক আসন বাড়বে এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ এর আসনও বাড়বে। এই হ্রাস বৃদ্ধির পরেও কিন্তু মোদির জোট ঐ ম্যাজিক নাম্বারের (২৭২) কিছু বেশি পাবে এবং এবারও দিল্লিতে সরকার গঠন করবে। এবারও ২য় মেয়াদে প্রধান মন্ত্রী হবেন নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। এবারেও বিরোধী দলের নেতা থাকবেন রাহুল গান্ধী। তবে গতবার তার দলের যে লজ্জাজনক পরাজয় ঘটেছিল এবার তার চেয়ে তারা ভালো করবেন। নির্বাচনের আগে এটাই আগাম হিসাব ভারতের বিভিন্ন জনমত জরিপ-সংস্থাসমূহের।
ভারতের আসন্ন নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে  এমন একটি পূর্বাভাস কেন দেয়া হচ্ছে সেটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গেলে এই ধরনের অন্তত ৫টি কলাম লেখার প্রয়োজন হবে। তবে আমি চেষ্টা করবো এই একটি কলামেই লেখাটি শেষ করতে। এর মধ্যে বাংলাদেশে যদি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে না যায় তাহলে এই লেখাটির ২য় কিস্তিও লেখার ইচ্ছা রাখি। যাই হোক এখন মোদি জোট কেন হ্রাসকৃত সংখ্যা গরিষ্ঠতায় জয়লাভ করবে সে সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করবো।
প্রথমেই খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার যে নরেন্দ্র মোদিকে ম্যাচ করার মতো সর্ব ভারতীয় নেতা বিরোধী দলে কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। এখন রাহুল গান্ধীকেই বিরোধী দলের নেতা হিসাবে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু রাহুল কেন, তার মাতা সোনিয়া গান্ধীও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির উচ্চতায় উঠতে পারেন নি। শুধু তাই নয়, ২০১৪ সালে এককভাবে কংগ্রেসের যে ফলাফল সেটা দেখে পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের পতনের ধারাবাহিকতা মনে পড়ে। এই মুহুর্তে ভারতে বর্তমানে সর্ব ভারতীয় রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র বিজেপিকেই বোঝায়। কংগ্রেস অতীতে ঐতিহ্য নিয়ে এখনো সর্ব ভারতীয় দল হিসাবে টিকে রয়েছে। কিন্তু যদি পণ্ডিত মতি লাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু এবং ইন্দিরা গান্ধীর কথা বাদ দেয়া যায় তাহলে রাহুল গান্ধীর দলকে সর্ব ভারতীয় দল বলা যায় না।
উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনৈতিক দলের উত্থান পতন নির্ভর করে ২টি ফ্যাক্টরের ওপর। একটি হলো, দলটির নেতার ক্যারিশমা। আর একটি হলো দলের সাংগঠনিক কাঠামো কতখানি মজবুত। ক্যারিশমার দিক দিয়ে মোদির কোনো ম্যাচ রাহুল নন। এমনকি তার মাতাও ছিলেন না। তারা মাতার যেটুকু ইমেজ সেটি ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধীর স্ত্রী হিসাবে। সুতরাং বিরোধী দলের এদিকে রয়েছে প্রচণ্ড ঘাটতি।
॥তিন॥
এই ২টি দল বাদ দিলে আর যেসব দল রয়েছে সেই দলগুলোতে চৌকস নেতা থাকলেও এবং দলগুলো মোটামুটি মজবুত হলেও তাদের নেতারা এবং দলগুলো সকলেই আঞ্চলিক। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জী একজন তেজস্বীনি নেতা। প্রাথমিক পূর্বাভাসে বোঝা যাচ্ছে যে গতবারের চেয়েও তার জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। কিন্তু তারপরেও তিনি সর্ব ভারতীয় নেতা নন। পশ্চিম বাংলা ছাড়া আসামের কয়েকটি পকেটে তার সমর্থন থাকতে পারে। উত্তর প্রদেশের মায়াবতী ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। ৪ বার তিনি মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার রাজ্যের আসন সংখ্যা ৮০টি। তারপরেও বলতে হয় যে তার গণ্ডিও উত্তর প্রদেশের বাইরে নয়। তাই তিনিও একজন আঞ্চলিক নেতা। একই অবস্থা উত্তর প্রদেশের মুলায়েম সিং যাদবের পুত্র অখিলেশ যাদবের। জয় ললিতার মৃত্যুর পর তামিল নাড়–তে তার মতো ইমেজ নিয়ে আর কেউ উত্থিত হননি। কিন্তু সেখানেও ৩৯টি আসন। তাই জয় ললিতার দলও একটি আঞ্চলিক দল।
১৯৬০ সালের আগে মহরাষ্ট্র ছিল একটি বিশাল রাজ্য। তখন আজকের গুজরাট মহরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাই। হিন্দু দেবী মুম্বাইয়ের নাম অনুসারে বোম্বের নাম করা হয়েছে মুম্বাই। আগের নাম বোম্বে। বোম্বে নামটি বাংলাদেশের মানুষের নিকট অতি পরিচিত। ভারতীয় হিন্দি ছবির কথা বললেই বোম্বে ছবির কথা বোঝায়। সেই মহারাষ্ট্রকে দ্বিখণ্ডিত করে দুটি রাজ্য করা হয়। একটি মহারাষ্ট্র। অপরটি গুজরাট। মহারাষ্ট্রের রাজধানী এখনও মুম্বাই। পক্ষান্তরে গুজরাটের রাজধানী গান্ধীনগর। বর্তমানে মহারাষ্ট্রে লোকসভার আসন সংখ্যা ৪৮ ও গুজরাটের ২৬ মোট ৭২।
কিন্তু গুজরাট থেকে যেমন সর্ব ভারতীয় নেতা হিসাবে উত্থিত হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি, তেমনি উত্তর প্রদেশ গুজরাট মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে সর্ব ভারতীয় নেতা হিসাবে নরেন্দ্র মোদির বিপরীতে কেউ উত্থিত হননি।
আর একটি কারণে বিজেপির ভোট এবার কমবে সেটি হলো আসামে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। এই বিল সম্পর্কে স্বতন্ত্রভাবে অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু আজকের এই ভাষ্যে শুধু এইটুকু বলা যায় যে, এই বিলের ফলে শুধু আসাম নয়, সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিজেপির ভোট কমবে।
ওপরের এই আলোচনার পরেও বলা যায় যে, সারা ভারতব্যাপী ২০১৪ সালের তুলনায় বিজেপির ভোট কমলেও সর্বভারতীয় ভিত্তিতে বিজেপি এবং তার শরিক এনডিএ ২৭২ এর চেয়েও বেশি আসন পাবে এবং দিল্লীর মসনদ অধিকার করবে। দেশীয় এবং বিদেশী পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণ এবং মতামত এটাই।
Email:asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ