ঢাকা, রোববার 28 April 2019, ১৫ বৈশাখ ১৪২৬, ২১ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খ্যাতিমান সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের খ্যাতিমান সিনিয়র সাংবাদিক, সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির নির্ভিক কন্ঠস্বর মাহফুজ উল্লাহ আর নেই। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ব্যাংকক-এর বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন সন্তান ও তাদের জীবনসঙ্গীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাহফুজ উল্লাহর মেয়ে তার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মরহুম মাহফুজ উল্লাহর জন্য দোয়া চেয়েছে তার পরিবার। ৬৯ বছর বয়সী মাহফুজউল্লাহ গত ২রা এপ্রিল হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করে আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। স্কয়ারে কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১১ই এপ্রিল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ব্যাংককে নিয়ে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। তিনি হৃদরোগ, কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। এর আগে ব্যাংককে একবার তার বাইপাস সার্জারিও হয়েছিল। কয়েকদিন আগে তিনি আর বেঁচে নেই বলে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার হয়েছিল। বিভিন্ন মহল থেকে শোকও জানানো হয়েছিল। অবশেষে সেই মৃত্যুই তার জন্য সত্য হয়ে থাকলো। মাহফুজউল্লাহ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় স্ত্রী দিনারজাদী বেগম, ছোট মেয়ে ডা. নুসরাত হুমায়রা, জামাতা মিনহাজুল হক হাসপাতালে ছিলেন।
গতকাল রাতেই তার লাশ দেশে আসার কথা।  মরহুমের ইচ্ছা অনুযায়ী আজ রোববার তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে। মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মকবুল আহমাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। শোক বার্তায় তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
স্পষ্টভাষী মাহফুজ উল্লাহর জন্ম ১৯৫০ সালে নোয়াখালীতে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যা ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে ঊনসত্তরের ১১ দফা আন্দোলনে অংশ নেন মাহফুজ উল্লাহ। আইয়ুব খানের শাসনামলে তাকে ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। তিনি পরে ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই মাহফুজ উল্লাহ সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের একসময়ের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার ১৯৭২ সালে জন্মলগ্ন থেকেই তিনি জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকে কাজ করেছেন তিনি।
তিনি সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন সক্রিয় পরিবেশবিদ এবং বাংলাদেশে তিনিই পরিবেশ সাংবাদিকতার সূচনা করেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার-এর আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের প্রথম বাংলাদেশী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। মাহফুজ উল্লাহ মাঝে চীনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে, কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে খ-কালীন শিক্ষকতা করেছেন তিনি। তিনি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। এছাড়া টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত দেখা যেতো সাহসী এ সাংবাদিককে।
বিভিন্ন বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা মাহফুজ উল্লাহর বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। তার সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে- প্রেসিডেন্ট জিয়া অব বাংলাদেশ: এ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি, যাদুর লাউ, যে কথা বলতে চাই, অভ্যুত্থানের ঊনসত্তর, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন: গৌরবের দিনলিপি (১৯৫২-৭১), উলফা এন্ড দ্য ইনসারজেন্সি ইন আসাম,  বেগম খালেদা জিয়া: হার লাইফ হার স্টোরি, স্বাধীনতার প্রথম দশকে বাংলাদেশ।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর লাশ গতকাল শনিবার রাত ১২টা ৪০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছার কথা। রোববার বাদ জোহর গ্রিন রোডের ডরমিটরি মসজিদে প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় নামাজে জানাযা বাদ আসর জাতীয় প্রেস ক্লাবে। শায়রুল কবির বলেন, মরহুমের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে। সব কিছুই তদারকি করছেন মরহুমের বড় ভাই ড. মাহবুবউল্লাহ। তিনি বিএনপির মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন।
মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুর খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক মরহুমের ঢাকার বাসায় ছুটে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
বিএনপির শোক: মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শোক প্রকাশ করে                                                           অপর এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সাংবাদিকতা জীবনে তার মতো একজন নির্ভিক সাংবাদিকের পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া দেশবাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। গণতন্ত্র হরণ ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বর্তমান অরাজক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু গণতন্ত্রকামী মানুষের মনে গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালনে বরাবরই তিনি ছিলেন নির্ভীক ও দ্বিধাহীন। অবৈধ সরকারের রক্তচক্ষু’র কাছে তিনি কখনোই মাথানত করেননি। সরকারী ক্রোধের পরোয়া না করে গণতন্ত্রের পক্ষে তার উচ্চারণ ছিল শাণিত ও সুস্পষ্ট। বর্তমান দুঃসময়ে তার মতো একজন ঋজু ও দৃঢ়চেতা মানুষের বড়ই প্রয়োজন ছিল। দেশে ভয় ও শংকার বর্তমান পরিস্থিতিতে সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ’র মতো মানুষের অনুপস্থিতি গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করবে। দেশের বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে সাহসী সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতে দেশবাসী ও তার পরিবার-পরিজনদের মতো আমিও গভীরভাবে মর্মাহত ও বেদনার্ত হয়েছি। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা  এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়স্বজন, স্বতীর্থ ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
খেলাফত মজলিস: মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাহফুজ উল্লাহর ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করে খেলাফত মজলিসের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ মিডিয়া জগতের এক উজ্জল নক্ষত্র ছিলেন। তিনি দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের ধারাবাহিক সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। অধিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে তার যুক্তিপূর্ণ কথা ও লেখনীর জন্যে দেশবাসী তাকে দীর্ঘকাল স্মরণ করবে।  নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহর দরবারে দুয়া করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শোক:  সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। শোক বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাহফুজউল্লাহ যখন তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কাজ করতেন, তখন থেকেই পরিচয়। তার বড় ভাই অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে আমার সিনিয়র ছিলেন। মতের ভিন্নতা থাকলেও মাহফুজউল্লাহর ব্যবহার ছিল উত্তম।
শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন: প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর ইন্তিকালে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান এক যৌথ শোকবাণী প্রদান করেছেন। শোক বাণীতে নেতৃবৃন্দ বলেন, মাহফুজউল্লাহ একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ছিলেন। তার ক্ষুরধার লিখনী দেশবাসীকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে। তার মৃত্যুতে জাতি একজন দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীকে হারালো। নেতৃদ্বয় বলেন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান , ৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সকল অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মাহফুজউল্লাহর অবদান সমগ্র জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করবে।
তারা বলেন, মতপার্থক্য বা মতবিরোধ থাকলেও প্রতিপক্ষের সাথে শিষ্টাচারের মধ্য থেকেই যে লড়াই করা যায় তারই উজ্জলতম উদাহরণ হচ্ছেন মাহফুজউল্লাহ। তার ইন্তিকাল আমাদের সমাজের বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করলো। এই শূন্যতা পূরণ অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে।  তারা আরো বলেন, তার এই  ইন্তিকালে আমরা গভীরভাবে শোকাভিভূত। আমরা দোয়া করছি আল্লাহ তায়ালা যেনো তার সকল নেক আমল কবুল করে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তারা মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, ভক্ত-অনুরক্ত ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং দোয়া করেন আল্লাহ যেনো তাদের এই শোক সহ্য করার তাওফিক দেন।
এছাড়া মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছের গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার ও মহাসচিব জাফরুল্লাহ খান চৌধুরী। তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ