ঢাকা, সোমবার 29 April 2019, ১৬ বৈশাখ ১৪২৬, ২২ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বছরের পর বছর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : পরীক্ষা নেই! সাক্ষাৎকার নেই! প্রয়োজন নেই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার! শুধু বিকাশে টাকা পাঠালে চাকরি! হ্যাঁ এমনই চাকরি দিচ্ছে ‘মা ও শিশু কমিউনিটি শিক্ষা কেন্দ্র’, ‘বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র’, ‘বাংলাদেশ পল্লী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র’, ‘মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র’, ‘ইউনিয়ন কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামের ভুয়া বেসরকারি সাহায্য সংস্থা (এনজিও)। জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢাকার কয়েকজন পোস্ট মাস্টার ও ডাক পিয়নের মাধ্যমে বছরের পর বছর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না প্রতারিত চাকরি প্রার্থীরা।
 কেইস স্টাডি-১: রোজি আকতার (২৪)। বাড়ি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানার চরফরিদ গ্রামে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা পড়েন। বিশেষ করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। গত বছরের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার ১১ পৃষ্টায় একটি বিজ্ঞাপন দেখে তার চোখ আটকে যায়। ওই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, উপজেলা পরিদর্শক পদে ১৪০জন, কর্মসূচী সংগঠক পদে ১৬০জন, কমিউনিটি ম্যানেজার পদে ২০০জন এবং ইউনিয়ন পরিদর্শক পদে ২৮০জনহ মোট ৭৮০জনকে নিয়োগ দেয়া হবে। এমন বিজ্ঞাপন দেখে উপজেলা পরির্দশক পদে আবেদন করেন রোজি আকতার। এক সপ্তাহের মধ্যে নিয়োগপত্রও পাঠানো হয়। বেতন ২৭ হাজার ৮শ’ টাকা, যোগদান চট্টগ্রাম সদর কার্যালয়ে।  এমন নিয়োগপত্র পেয়ে উল্লাসে প্রিয়জনদের জানিয়ে দেন তার চাকরি হয়েছে! কিন্তু না। গত বছরের ২২ নবেম্বর রোজি আক্তারকে মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অফিস কর্মকর্তা শায়লা আক্তার চৌধুরী পরিচয়ে ০১৭২৪৯৭১৯৩০ মুঠোফোন থেকে বলা হয়, ‘আপনার নিয়োগ চুড়ান্ত করা হয়েছে। ১ ডিসেম্বর থেকে আপনাকে কাজে যোগদান করতে হবে। আপনি আমাদের ০১৮৭৮৪৩৫০১৯ বিকাশ নাম্বারে ২ হাজার ১শত ৫০টাকা পাঠান। এরপর আপনার নিয়োগপত্র পাঠানো হবে’। টাকা কেন পাঠাতে হবে জানতে চাইলে কথিত সায়লা আক্তার চৌধুরী বলেন, এটা নিবন্ধন ফি। পরে ফেরত দেয়া হবে। এরপর একটি নিয়োগপত্র পাঠানো হয়। এরপর আরো ২ হাজার ৫০ টাকা পাঠাতে বলা হয়। এবার বলা হয় বেতনের টাকা প্রেরণের সুবিধার্থে ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য। চাকরিতে যোগদান করার পর এই টাকাও ফেরত দেয়া হবে। কিছুদিন পর প্রকল্প পরিচালক পরিচয় দিয়ে আবেদ হাসান চৌধুরী (০১৭৯৭০০৩৮৮৯) চাকরিপ্রার্থী রোজি আক্তারকে বলেন, ২০১৮ সালের ০১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে তিনি আসবেন। সেখানে তিনদিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি উপস্থিত থাকবেন। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিপ্রার্থীদের সোনালী ব্যাংকে জয়েন্ট একাউন্ট খোলা হবে এবং একাউন্টের মাধ্যমে বেতনভাতা দেয়া হবে। তাদের এটিএম কার্ড দেয়া হবে। এটিএম কার্ড দিয়ে বেতনভাতা তুলতে হবে। ১ ডিসেম্বর চাকরিপ্রার্থীরা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, কোন ধরনের কর্মশালা আয়োজন সেখানে নেই। মো.মিনহাজ, শাকিলা খানম, সুফিয়া আকতার ও আসিফ মোস্তফা আল নিশানের কাছ থেকেও চাকরি দেয়ার কথা বলে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয় ওই প্রতারক চক্র। চাকুরি প্রার্থীরা এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. অসিম নাথের সঙ্গে  যোগাযোগ করলে তিনি জানান, চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা করেছেন একটি চক্র। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, নামে একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা (এনজিও) ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিকে একটি নিয়োগ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। এনজিওটির নামে প্রকশিত বিজ্ঞাপনে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়, প্রধান কার্যালয়: বাড়ি ৩৮০, রোড ০৪, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ডিওএইচএস, বারিধারা, ঢাকা-১২০৬। এতে বলা হয়, জাতীয় পর্যায়ে বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা যা মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্বারক নং-ম/ও/শি/ক/স্বা/কে-২০১৮ অনুযায়ী দারিদ্র বিমোচন, প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও নারী অধিকার নিয়ে সারা দেশব্যাপী কাজ শুরু করছে। নেদারল্যান্ড এর আর্থিক সহায়তায় উক্ত এনজিও প্রতিষ্ঠানে উল্লেখিত কর্মসূচীতে নিম্নোক্ত পদে কাজ করতে আগ্রহী পুরুষ/মহিলাদের নিকট হতে দরখাস্ত আহবান করা যাচ্ছে। আগ্রহী প্রার্থীদের ৩কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জন্ম সনদ/ জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও মোবাইল নম্বরসহ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১২ দিনের মধ্যে উল্লেখিত ঠিকানায় শুধুমাত্র পোস্ট অফিসের মাধ্যমে দরখাস্ত পাঠাতে হবে। স্বাক্ষাৎকার, প্রশিক্ষণ নিজ উপজেলার শাখা অফিসে অনুষ্ঠিত হবে এবং কর্মস্থল নিজ এলাকার মধ্যে রাখা হবে। পোস্ট অফিস ছাড়া কোনো আবেদনপত্র গ্রহণ করা হবে না বলে পরিচালক (মানবসম্পদ) স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগ থেকে জানানো হয় ঢাকাস্থ ‘অগ্রণী’ নামে একটি এ্যাড ফার্ম তাদেরকে ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। বিজ্ঞাপন দাতার টেলিফোন নম্বর দেয়া হয়েছে ০১৯৩৫৯৫৩৫৬০।
কেইস স্টাডি-২: গত বছরের ৯ জানুয়ারি মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নামে একটি বিজ্ঞাপন দেখে চাকরির জন্য আবেদন করেন। বিজ্ঞাপনে উপজেলা পরিদর্শক ও কর্মসূচি সংগঠকসহ পাঁচটি পদের বিপরীতে মোট ৮৮৪ জন নিয়োগের কথা বলা হয়। এতে আগ্রহী প্রার্থীদের তিন কপি ছবি ও মোবাইল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত আবেদনপত্র আগামী ১২ দিনের মধ্যে পরিচালক মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র বরাবর পাঠাতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেওয়া হয় বাড়ি নং-৪৯, রোড নং-১০/এ, নিকুঞ্জ-১, খিলক্ষেত, ঢাকা-১২২৯।  মাজানা আক্তার তিনা নামে একজন বরিশাল সদর থেকে আবেদন করেন। কয়েকদিন পর এক নারী ০১৮৫৮৯২৩৮৪০ নম্বর থেকে তাকে জানান, ৫ ফেরুয়ারি প্রশিক্ষণ হবে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য ১২০০ টাকা বিকাশে পাঠাতে বলেন। তিনা তার কাছে অত্র টাকা নেই বলার পর তাকে ৬০০ টাকা পাঠাতে বলা হয়  বাকি টাকা নিয়োগের পর দিতে হবে বলে জানান ওই নারী। একইভাবে কথিত ওই প্রতিষ্ঠানে কামাল হোসাইন নামে একজন আবেদন করার পর তাকেও প্রশিক্ষণের জন্য ১২৫০টাকা বিকাশ করতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর পর ওই প্রতিষ্ঠান থেকে আর যোগাযোগ করা হয়নি। ফোন করলেও তা রিসিভ করেনি কেউ।
 কেইস স্টাডি-৩: গাজীপুরের তানভীর আহম্মেদ রনি। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে’র অধীনে দেশের প্রত্যেকটি উপজেলা পর্যায় থেকে ৪টি পদের জন্য লোক নিয়োগ করা হবে। কর্পোরেট কার্যালয় গ-৩০ (নীচতলা) কালাচাঁদপুর, গুলশান ঢাকা-১২১২ বরাবর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে ডাকযোগে একটি আবেদন দাখিল করে। ২৫ জুলাই মা ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র অফিস থেকে ০১৮৪৫১৬৩৬৭৯ নম্বরে আবেদনকারীর নিকট ফোন করে এক নারী জানায়, আপনার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। গাজীপুর সদর হাসপাতালে ১ আগস্ট থেকে ৭  আগস্ট পর্যন্ত  আপনার প্রশিক্ষণ হবে। ওই প্রশিক্ষনের জন্য ১২৫০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ অফিসে জমা দিতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে ওই টাকাসহ আরও অন্যান্য ভাতা দেওয়া হবে। পরে তাদের কথামতো ০১৮৩৪১৪৬৯৩০ নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে ১২৫০ টাকা পাঠানো হয়। বিকাশে টাকা পাঠানোর পর মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালকের স্বাক্ষরিত নিয়োগপত্রসহ ১২৫০ টাকা প্রাপ্তির রশিদ ও স্বাস্থ্যসেবা /পুষ্টি প্রকল্প প্রশিক্ষণ শিট গাজীপুর চৌরাস্তা সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হয়। নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর থেকে তাদের ফোন করে পাওয়া যায়নি! পরের দিন থেকে তাদের ফোন বন্ধ। নিয়োগ পত্রের ঠিকানার সাথে বিজ্ঞপ্তির ঠিকানার কোন মিল পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞপ্তির ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র কর্পোরেট কার্যালয় গ-৩০ (নীচতলা) কালাচাঁদপুর, গুলশান ঢাকা-১২১২। অন্যদিকে নিয়োগপত্রে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে মা ও শিশু কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র, প্রধান কার্যালয়, বাড়ী ৪৯, রোড ১০/এ, নিকুঞ্জ-১, খিলক্ষেত-১২২৯। গভঃ রেজি নং সি ১২৬০৬১২/২০০৮। কিন্তু  কোন ঠিকানায় ওই এনজিও’র কোন অস্থিত্ব নেই।  যে টেলিফোন নম্বর থেকে আবেদনকারীদের সাথে কথা বলে বিকাশে টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল সেই নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও ফোন রিসিভ করেনি চক্রটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি শুধু চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে তা নয়। কখনো সিনেমা, টেলিভিশনে অভিনয় করা, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা পেশা চাকুরির বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা করে থাকে। ঢাকায় যে এলাকার ঠিকানা ব্যবহার করে সে এলাকার পোস্ট অফিসের ডাক পিয়ন এর সঙ্গে প্রতারক চক্রটি আগে থেকে যোগাযোগ করেন। সেকারণে নিয়োগ বিজ্ঞাপ্তিতে উল্লেখ করা হয় ‘পোস্ট অফিস ছাড়া কোন আবেদনপত্র গ্রহণযোগ্য নয়’। খোঁজ নিয়ে ভুয়া প্রতিষ্ঠান গুলোর ঠিকানা দেখানো হয়, বারিধারা, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, বনানী। পোস্ট মাস্টার ও ডাক পিয়নের যোগসাজসে বছরের পর বছর প্রতারণা করে যাচ্ছে চক্রটি। এসব এলাকার পোস্ট মাস্টার ও ডাক পিয়ন চক্রটির ব্যবহার করা ঠিকানায় চিঠি আসলে তা পোস্ট অফিসে জমা রাখেন। পরে চক্রটির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় চাকুরি প্রার্থীর ঠিকানা ও টেলিফোন নম্বর পেয়ে খুব সহজে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছে চক্রটি।
সদ্য প্রতারিতরা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এর বরাবরে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেন। নগর গোয়েন্দা বন্দর জোনের সহকারি কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিনকে আবেদনটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি প্রতারক চক্রকে ধরার জন্য ঢাকায় যাওয়ার অনুমতি চান নগর গোয়েন্দা বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মুস্তাইন হোসাইনের কাছে। তিনি অনুমতি না দেয়ায় তদন্ত আর এগুইনি।  এরপর গত বছরে ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঢাকা পুলিশ কমিশনার এর কাছে প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য একটি আবেদন জমা দেয়া হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে প্রতারক চক্র রয়ে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ