ঢাকা, সোমবার 29 April 2019, ১৬ বৈশাখ ১৪২৬, ২২ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘তোমার আমার ঠিকানা...’

আশিকুল হামিদ : কিছুটা বয়স্ক পাঠকরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, নিবন্ধের শিরোনামটুকু আসলে একটি স্লোগানের অংশ। ১৯৬০-এর দশকে স্বায়ত্তশাসনসহ তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ অধিকার আদায়ের আন্দোলনে স্লোগানটি বেশি ব্যবহার করতো আওয়ামী লীগ। মিছিলে-সমাবেশে কেউ একজন ‘তোমার আমার ঠিকানা...’ বলে শুরু করলেই বাকি সকলে চিৎকার করে উঠতেন, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’! এর মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের মানচিত্র সম্পর্কে ধারণা দেয়া হতো। বলা দরকার, মূলত আওয়ামী লীগের হলেও ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ বাঙালি জনগণের প্রাণের স্লোগানে পরিণত হয়েছিল। স্লোগানটি এদেশের সাধারণ মানুষকে আবেগাপ্লুত করে তুলতো।
পাঠকরা তাই বলে ভাববেন না যে, ওই স্লোগানের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেযার জন্য এবারের নিবন্ধটি পরিকল্পিত হয়েছে। প্রকৃত কারণ আসলে সম্পূর্ণ অন্যরকম। লিখতে বসেছি আমাদের ‘ঠিকানা’ হিসেবে পরিচিত নদ-নদীগুলোর বর্তমান করুণ অবস্থা সম্পর্কে জানানোর উদ্দেশ্যে। তার আগে কিছুটা স্মৃতিচারণ করা যাক। ১৯৭০-এর দশকে শুধু নয়, ১৯৮০-র দশকেও আরিচা থেকে নগরবাড়ি ও দৌলতদিয়া হয়ে পদ্মার ওপর দিয়ে বগুড়া, রংপুর ও রাজশাহীর পাশাপাশি খুলনা, বাগেরহাট এবং মাদারিপুর পর্যন্ত যাতায়াত করেছি। কখনো ফেরিতে, কখনো আবার লঞ্চে পার হয়েছি পদ্মা। ১৯৮৮ সালে সারাদেশ যখন প্রবল বন্যার কবলে পড়েছিল তখনও মাদারিপুর থেকে পদ্মার ওপর দিয়েই ঢাকায় ফিরেছিলাম। এর পরদিনই ঢাকার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই দিনগুলোতেও পদ্মাকে প্রমত্তাই মনে হতো। তারও বছর কয়েক আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মার এক কূল থেকে আরেক কূল দেখা যেতো না, তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের ভয়ে মানুষ পদ্মার ধারে-কাছে যাওয়ার সাহস পেতো না। অন্যদিকে সে প্রমত্তা পদ্মার দশাই এখন অতি শীর্ণ হয়ে পড়েছে।
প্রমত্তা সে পদ্মাই বর্তমানে করুণ দশার শিকার হয়েছে। উদাহরণ দেয়ার জন্য একটি ছবির কথা উল্লেখ করতেই হবে। বর্তমান পদ্মার এ ছবিটি ফেব্রুয়ারি মাসে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত হয়েছে। এটা দেখলে মনে হবে যেন বহু খন্ডে বিভক্ত হয়ে যাওয়া কোনো দেশ বা এলাকা। বিভিন্ন আকারের ছবিগুলোর কোনোটিতে সামান্য পানি দেখা যাচ্ছে। কোনোটি দেখে আবার মনেই হবে না যে, সেখানে কোনোদিন পানি ছিল। সব মিলিয়েই ছবিটি দেখে আর পদ্মা নদীকে চেনার উপায় নেই। পদ্মা সবদিক থেকে মৃত নদীর রূপ নিয়েছে, পরিণত হয়েছে অতি সরু একটি খালে। মাঝে-মধ্যে এর সামান্য কিছু এলাকায় শুধু খালের মতো পানি রয়েছে। একযোগে বিস্তার ঘটেছে অসংখ্য চরের। পদ্মার দুই তীরে তো বটেই, মাখখানেও এখন শত শত চর তৈরি হয়েছে। পদ্মার বুকজুড়ে এখন ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে। একযোগে চলছে চর দখলের প্রতিযোগিতা। বহু পরিবার ওইসব চরে গিয়ে বাসাবাড়ি বানিয়ে বসবাস করতেও শুরু করেছে।
দৈনিক সংগ্রামে ছবির সঙ্গে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, নদীর উৎসের দিকেই ভারত ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে বলে পদ্মায় পানির উচ্চতা কমে গেছে ১৮ মিটার পর্যন্ত। সেই সাথে নদীর প্রশস্ততা কমেছে ১০ কিলোমিটার। বেশ কয়েক বছর ধরেই শুকনো মওসুমে পদ্মা সরু খালে পরিণত হচ্ছে। পদ্মার সর্বশেষ অবস্থার এই ছবি দেখে যে কোনো সচেতন বাংলাদেশিকেই ক্ষুব্ধ, স্তম্ভিত এবং মর্মাহত হতে হবে। 
প্রমত্তা পদ্মার এমন করুণ অবস্থার কারণ, বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই বহু বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। পরিণতিতে পদ্মাই শুধু নয়, এর শাখা-প্রশাখাসহ ৩৬টি নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে। এগুলোর কোনো কোনোটিকে এমনকি খালও আর বলার উপায় নেই। চাষাবাদ তো করা হচ্ছেই, এসবের ওপর দিয়ে ভারি যানবাহনও চলাচল করছে।
বলা দরকার, সবকিছুর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রতারণা ও পানি আগ্রাসন। ফারাক্কার পাশাপাশি নানা নামের অসংখ্য বাঁধ বা ব্যারাজ এবং ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। ফারাক্কা পয়েন্টের প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি চলে যাচ্ছে হুগলি ও ভাগিরথি নদীতে। একযোগে ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের প্রায় চারশটি পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। এছাড়া ১৩ হাজার ছয়শ’ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে তিনটি বৃহদাকার ক্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে দেশটি। এই ক্যানেল তিনটিতেও পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে গঙ্গার তথা বাংলাদেশের পদ্মার ৯০ শতাংশেরও বেশি পানি অবৈধভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। এভাবে চলতে থাকলে ‘ন্যায্য হিস্যা’ দূরে থাকুক, বাংলাদেশ এক সময় পানিই পাবে না। পদ্মাও হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অন্ধকারে।
কিন্তু সবকিছু জানা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার ভারতের কাছে প্রতিবাদ যেমন জানাচ্ছে না তেমনি চাপ দিচ্ছে না পানির ন্যায্য হিস্যার জন্যও। এমন অবস্থার সুযোগ নিয়েই ভারত চুক্তি লংঘন করে চলেছে এবং বাংলাদেশকে তার ‘ন্যায্য হিস্যা’ দিচ্ছে না। সে কারণে পদ্মার পাশাপাশি দেশের অন্য ৫৪টি নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে।
পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় মাওয়া থেকে ক্যাওড়াকান্দি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথে যাতায়াতের সময় কয়েকটি পর্যন্ত স্থানে প্রতিদিনই যাত্রী ও যানবাহনসহ ফেরি আটকে পড়ছে। কয়েক ঘণ্টা লাগছে ড্রেজিং করে ফেরিগুলোকে আবারও চালু করতে। এ অবস্থায় পড়তে হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, ফরিদপুর, মাদারিপুর, কুষ্টিয়া এবং বরিশালসহ বহু এলাকার মানুষকে, যারা মাওয়া-ক্যাওড়াকান্দি এবং নগরবাড়ি-দৌলতদিয়া হয়ে যাতায়াত করেন। সেই সাথে রয়েছে শত শত পণ্যবাহী যানবাহনও।
এভাবে সব মিলিয়েই প্রমত্তা পদ্মা ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে। একটি নদীর জন্য এর চাইতে করুণ পরিণতির কথা কল্পনা করা যায় না। উল্লেখ্য, এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, সে চুক্তিই ভারতকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার সুযোগ দিয়েছিল। ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় আসার শর্ত লংঘন করে ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার শুরু করে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি হুগলি নদীতে নিয়ে যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ফিডার ক্যানেল চালু করার পর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মায় পানি প্রবাহ যেখানে ছিল ৬৫ হাজার কিউসেক সেখানে ১৯৭৬ সালে তার পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে।
পরবর্তীকালেও ভারতের এই পানি  সরায় আরো মারাত্মক হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আরেক আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করলেও ভারত চুক্তি কেবল লংঘনই করেছে। সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি পাওয়ার রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের মার্চে। সে বছরের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক। এমন অবস্থার কারণ, ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ না রাখার পরিপূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল ভারত। একই চুক্তির আড়াল নিয়ে ভারত এখনো শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করে চলেছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৬৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে কৃষিরও।
দেশপ্রেমিকরা মনে করেন, সরকারের উচিত বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী পানির হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করা। ভারত সম্মত না হলে সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে ভাটির দেশকে পানিপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা অপরাধ। কিন্তু ভারত শুধু বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্তই করছে না, বাংলাদেশকে পানি-প্রতিবন্ধী রাষ্ট্র বানানোরও পদক্ষেপ নিয়েছে- যা আন্তর্জাতিক আইনে এক গুরুতর অপরাধ। এজন্যই মামলা দায়েরের মাধ্যমে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে পদ্মা একেবারে হারিয়ে না যায়। একই কথা সত্য অন্য ৫৪টি নদ-নদী সম্পর্কেও। কারণ, এসব নদ-নদীও ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার হয়ে ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে।
উদ্বেগের কারণ শুধু পদ্মা নয়। ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার হয়ে পদ্মার পাশাপাশি যমুনা নদী এবং ব্রহ্মপুত্র নদও পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থার কারণ সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রামেরই অন্য এক সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত ৩৫ বছরে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ৭২০ বর্গকিলোমিটারের বেশি নতুন নতুন চর পড়েছে এবং একই সময়ে এর তলদেশ ভরাট হয়েছে ২২ ফুট। আদি অবস্থায় পুরনো ব্রহ্মপুত্রের গড় প্রশস্ততা যেখানে ছিল প্রায় ১১ কিলোমিটার বর্তমানে সেখানে প্রশস্ততা মাত্র ১২০ থেকে ২২০ মিটারের মধ্যে এসে ঠেকেছে। উজান থেকে পানি কম আসায়, খনন না করায় এবং নদের বুকে পলি ও বালু জমে অসংখ্য চর জেগে ওঠায় নদের দুই পাড়ের ফসলী জমিতে তীব্র সেচ সংকট দেখা দিচ্ছে প্রতি বছর। একই অশুভ পরিণতির শিকার হচ্ছে যমুনাও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশের উজানে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রায় সবগুলো শাখা ও উপনদীতে অসংখ্য বাঁধ ও প্রকল্প নির্মাণ করেছে ভারত। এসব বাঁধ ও প্রকল্পের কারণে নদের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ভয়ানকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একযোগে ভরাট হয়ে যাচ্ছে তলদেশও। এভাবেই পানির ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র। বছরের পর বছর ধরে একই কারণে নাব্য হারিয়ে ক্ষীণকায় খালের মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে ব্রহ্মপুত্রর- যা মাত্র দশক চারেক আগেও ছিল উত্তাল ও প্রমত্ত একটি নদ।
এর প্রতিক্রিয়ায় শুষ্ক মওসুমের শুরুতেই বাংলাদেশের যমুনায় বিভিন্ন আকারের অসংখ্য চরের বিস্তার ঘটে চলেছে। জেগে উঠছে অনেক ডুবোচরও। যমুনায় কমে যাচ্ছে পানির উচ্চতা এবং প্রশস্ততা। একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি তথা চাষাবাদ, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নৌ চলাচল। মৎস্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ব্রহ্মপুত্রে পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ অনেক কমে যাওয়ায় বিভিন্ন চ্যানেলের নৌরুটে নৌ যোগাযোগ এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে নয়তো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সে কারণে গত কয়েক মাস ও সপ্তাহ ধরে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও মাঝি-মাল্লাদের দুর্ভোগ পৌঁছে গেছে চরমে।
বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূলত তিনটি নদ-নদীর ধারার সম্মিলিত যোগফল হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র। এর উজানের অংশ তথা তিব্বতের সাংপো যেটুকু পানি ধারণ করে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি পানির প্রবাহ রয়েছে ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য আসামের ব্রহ্মপুত্রে। ওদিকে ডিহাং বা সিয়াং নাম নিয়ে সাংপো প্রবেশ করেছে ভারতের আরেক রাজ্য অরুণাচলে। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় দুইশ কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর সাংপো তথা ডিহাং বা সিয়াং আসামের সাদিয়া শহরের পশ্চিমে এসে মূল ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে। পরিসংখ্যানে জানা গেছে, তিব্বতের সীমানা পেরিয়ে তুতিং পয়েন্টে আসার পর সাংপোর পানি প্রবাহ থাকে চার হাজার কিউসেক। একই নদী অরুণাচলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর এর পানি প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২ হাজার কিউসেক।
অন্যদিকে সাংপোর যে প্রবাহ অরুণাচল হয়ে মূল ব্রহ্মপুত্রে গড়াচ্ছে তার পরিমাণ নদটির মোট প্রবাহের মাত্র সাত শতাংশ। ব্রহ্মপুত্রের ওই অংশেই ভারতের অন্তত ২১টি সেচ প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আসামের বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে পানি দিয়ে সেচ দিচ্ছে ভারত। আর সে কারণেই বাংলাদেশের যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র পানির তীব্র সংকটে পড়েছে। সর্বাত্মকভাবে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের এই নীতি ও কর্মকান্ডকে ভয়ংকর পানি আগ্রাসন ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। ওদিকে রয়েছে আরেক মরণবাঁধ ফারাক্কা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রমত্তা নদী পদ্মাকে অনেক আগেই সরু খালে পরিণত করে ফেলেছে ভারত। দেশপ্রেমিকরা মনে করেন এবং একথা আরো অনেক উপলক্ষেই জানানো হয়েছে যে, সরকারের উচিত প্রথম কূটনৈতিক পন্থায় দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে ভারতকে বোঝানোর এবং দেশটির কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করার চেষ্টা করা। দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের ব্যাপারে ভারত সম্মত না হলে সরকারকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাধানের চেষ্টা চালাতে হবে। প্রয়োজনে ভারতের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করিয়ে দেয়া দরকার, ভাটির দেশ হিসেবে পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশকে তার প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি দিতে বাধ্য। অন্যদিকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলে ভারত শুধু ন্যায্য প্রাপ্য থেকেই বঞ্চিত করছে না, বাংলাদেশকে পানিপ্রতিবন্ধী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যও ভয়ংকর বিভিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে এমন অবস্থার অবসান ঘটানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠা। ভারত যাতে পানি চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশের ‘ন্যায্য হিস্যা’ দেয়ার ব্যাপারে চাপের  মুখে পড়ে। দেশটি যাতে তার নীতি-কৌশল ও কার্যক্রমে ইতিবাচক হয়ে ওঠে। আমরা চাই না, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগানটি কেবলই ইতিহাসের বিষয়বস্তু হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকুক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ