ঢাকা, বুধবার 1 May 2019, ১৮ বৈশাখ ১৪২৬, ২৪ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আবারও শেয়ার বাজার সেই বিপর্যয়ে

ঢাকার শেয়ার বাজারে আবারও যথেচ্ছ লুণ্ঠনের শিকার হয়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। প্রতিদিন দরপতন তো হচ্ছেই, মাত্র ২৫ দিনের টানা দরপতনে ২৩ হাজার কোটি টাকা লোপাটও হয়ে গেছে। সুকৌশলে কারসাজি করে বিপুল পরিমাণ এই অর্থের সম্পূর্ণটুকুই হাতিয়ে নিয়েছে শেয়ার বাজারে তৎপর শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গতকাল দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একই সিন্ডিকেট ধারাবাহিকভাবে লুণ্ঠনের কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই শেয়ার বাজারে মূলধন পতনের পরিমাণ কেবল বাড়ছে। এমন অবস্থার ধারাবাহিকতায় গত সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসই’র প্রধান সূচক ফিরে গেছে ২৭ মাস আগের অবস্থানে। একদিনের ব্যবধানেই ৬২ পয়েন্ট খুইয়ে প্রধান সূচক নেমে এসেছে ৫ হাজার ১৭৫ পয়েন্টে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি এর চাইতেও কম তথা ৫ হাজার ১৫৮ দশমিক ৭০ পয়েন্ট নিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়েছিল। গত সোমবার লেনদেন নেমে এসেছিল ২৯৮ কোটি ৬১ লাখ টাকায়, যা তার আগেরদিনের চাইতে ৪৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা কম।
ধারাবাহিক এই দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশ স্টক এক্সচেঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থায় কর্মকর্তা পর্যায়ে পরিবর্তন ঘটানোসহ সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে এবং বিনিয়োগকারীরাই শুধু সর্বস্বান্ত হবে না, দেশের পুঁজি বাজারও ধ্বংস হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে সেরকম লক্ষণও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কারণ, ছোট ছোট মূলধনী কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি বড় বড় কোম্পানির শেয়ার কিনেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। কারসাজির মাধ্যমে সব মুনাফা লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে সিন্ডিকেট।
বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও অভিযোগ করেছেন, প্রতিরোধের পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে বরং কারসাজিকারী সিন্ডিকেটের হাতেই শেয়ার বাজার ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা যথেচ্ছভাবে লুণ্ঠনের বাধাহীন সুযোগ পেয়েছে বলেই প্রতিদিন দরপতন ঘটছে এবং পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদে বিনিয়োগকারীরা ডিএসইর সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। অনেকে অনশনও করেছেন। বলা হচ্ছে, অবিলম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থায় পরিবর্তন না ঘটানো হলে শেয়ার বাজারে ২০১০ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটবে এবং লাখ লাখ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হবেন। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, পুঁজি বাজারের এমন অবস্থা কোনোক্রমেই কাম্য নয় এবং যে কোনো পন্থায় দরপতন যেমন ঠেকানো দরকার তেমনি দরকার চিহ্নিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। স্মরণ করা দরকার, ২০১০ সালেও আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় ছিল। তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিতÑ যিনি তার বিভিন্ন নেতিবাচক বক্তব্য ও পদক্ষেপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশের পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন। সে সময় সুচিন্তিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে শেয়ার বাজারে মহা লুণ্ঠন চালানোর পর ৩২ লাখের বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারী যখন রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, অনেকে যখন এমনকি আত্মহত্যা পর্যন্ত করছিলেন, তখনও অর্থমন্ত্রী তাদের ‘কিছু লোক’ বলে তামাশা করেছিলেন। তার সে তামাশাকে নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায়নি। দুঃখ প্রকাশ কিংবা লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাকুক, মিস্টার মুহিত বরং এমনভাবেই কথা বলেছিলেন যেন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার প্রচেষ্টায় অংশ নিয়ে সাধারণ ও গরীব বিনিয়োগকারীরাই উল্টো মহা অপরাধ করে ফেলেছিলেন! চিন্তা-ভাবনায় জনগণকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি বলেই সে সময় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক খাতে একের পর এক কেলেংকারির জন্ম হয়েছিল- যেগুলোর প্রতিটিই ছিল বড় ধরনের ক্রিমিনাল বা ফৌজদারি অপরাধ এবং যেসবের কোনো একটির ব্যাপারেই মিস্টার মুহিতকে তথা সরকারকে কার্যকর এবং সুফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। অথচ এ ধরনের যে কোনো একটি ঘটনার জন্যই সভ্য কোনো দেশের হলে সে দেশের অর্থমন্ত্রী মাথা নিচু করে এবং জনগণের কাছে মাফ চেয়ে পদত্যাগ করতেন। কোনো কোনো দেশে অমন অর্থমন্ত্রীকে বিচারের সম্মুখীনও করা হতো। অন্যদিকে মিস্টার মুহিত বরং আরো বেশি দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে বেড়িয়েছেন। শেষ পর্যন্তও তাকে লজ্জিত হতে দেখা যায়নি।
আমরা জানি না, জনাব মুহিতের পর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে আগত জনাব আ হ ম মুস্তফা কামালও তার পূর্বসুরীকে অনুসরণ করার লক্ষ্যই নির্ধারণ করেছেন কি না। বলা দরকার, অমন ভাবনার কারণও নতুন অর্থমন্ত্রী নিজেই সৃষ্টি করেছেন। কারণ, দায়িত্ব যেখানে ছিল ঋণের অর্থ আদায় করাসহ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া, মন্ত্রী মুস্তফা কামাল সেখানে ঋণ মওকুফ করার ঘোষণা দিয়েছেন। বলা হচ্ছে, এই ঘোষণারও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে শেয়ার বাজারে। লুণ্ঠন ও কারসাজিতে ব্যস্ত সেন্ডিকেটগুলোর গণবিরোধী খেলোয়াড়রা অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্যে নিজেদের জন্য চমৎকার সম্ভাবনা আবিষ্কার করেছে এবং তার ফলেই তারা শেয়ার বাজার ধ্বংস করে দেয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারী সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করার ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমরা মনে করি, দেশের পুঁজি বাজারে যথেচ্ছ লুণ্ঠনের এমন কর্মকান্ড চলতে দেয়া যায় না। সরকারের উচিত অবিলম্বে তৎপর হয়ে ওঠা এবং ক্ষুদে বিনিয়োগকারীদে পুঁজি ও অর্থ বাঁচানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিকেও সর্বনাশের কবল থেকে রক্ষা করা। বলা দরকার, ২০১০ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটানো হলে তার পরিণতি সরকারের নিজের জন্যই অশুভ এবং ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ