ঢাকা, বুধবার 1 May 2019, ১৮ বৈশাখ ১৪২৬, ২৪ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইসলাম মুসলিম ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ

ইবনে নূরুল হুদা : গত মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের ২টি মসজিদে উগ্র বর্ণবাদী হামলায় নিহত অর্ধশতাধিক মুসলমানের রক্তের দাগ না শুকাতেই ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো এবং তার নিকটবর্তী অন্য এক শহরে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় প্রায় ৪শ মানুষের প্রাণহানীর ঘটনা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও বিবেকবান মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দিনটি ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব ‘ইস্টার সানডে’ হওয়ায় প্রচার পেয়েছিল যে, ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের হত্যার জন্যই মুসলিম উগ্রবাদীরা এই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু তিনটি গির্জার পাশাপাশি বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলসহ আরো দু’টি পৃথকস্থানে এসব হামলায় শুধু খ্রিষ্টানরা নয় বরং বেশ কিছু মুসলমানও হতাহত হয়েছেন। তাই বলা যায়, হামলা কেবল খ্রিষ্টানদের হত্যার উদ্দেশে চালানো হয়নি বরং এর পেছনে থাকতে পারে ভিন্নতর কোন রহস্য। অথচ উদোরপিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর জন্যই কোন প্রকার তথ্য-প্রমাণ ছাড়ায় মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করা হয়েছে এই হামলার জন্য।
ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী একটি চিহ্নিত মহল শ্রীলঙ্কার এ হত্যাকান্ডকে গত মাসে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে জুমার নামাজে মুসল্লীদের হত্যার প্রতিশোধের পদক্ষেপ প্রচার করার চেষ্টা করছে। এমনকি ২৩ এপ্রিল সংসদে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুয়ান বিজেবর্ধনে দাবি করেন, গত মাসে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দু’টি মসজিদে গুলী করে হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিতেই শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে উদযাপনের সময় ধারাবাহিক বোমা হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে এ ধরনের প্রচারণা ও চেষ্টা বাস্তবে চরম উস্কানী এবং এতে অপরাধীরাই আস্কারা পাবে বলে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোনো এক বা একাধিক শক্তি ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সুকৌশলে হত্যাকান্ড ঘটিয়ে আবারও শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত বাঁধানোর সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছে না আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। আর পাশ্চাত্যের কয়েকটি রাষ্ট্রের কারণে যেহেতু ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী প্রচারণা চালানো সহজেই সম্ভব সে কারণে কথিত সন্ত্রাসবাদী ইসলামী সংগঠনকে জড়িত করার চেষ্টাও চালানো হয়ে থাকতে পারে বলেও অনেকেই ধারণা করছেন।
অতিউৎসাহীদের পক্ষে ২১ এপ্রিলের কলম্বো ট্রাজেডির ঘটনা গত মার্চের নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ হিসেবে দাবি করা হলেও তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি বরং খোদ নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তা রীতিমত প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দাবি করেছে, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদের হামলা ও শ্রীলঙ্কার ইস্টার সানডেতে চালানো সিরিজ বোমা হামলার মধ্যে কোনো সম্পৃক্ততা তারা দেখছেন না। তাদের কাছে এ অভিযোগের অনুকূলে কোন গোয়েন্দা তথ্যও নেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য সাম্প্রদায়ীকতা, বর্ণবাদ, ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদ প্রধানত দায়ী হলেও এসব ঘটনার সাথে পরিকল্পিতভাবেই মুসলমানদের দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে ভিন্নচিত্রই দেখা যায়। বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করার জন্য এসব বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি।
বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রতিভূ হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। আর সাম্প্রদায়িকতা (Communalism) হচ্ছে এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী বা মনোভাব। কোন ব্যক্তির মনোভাব তখনই সাম্প্রদায়িক বলে বিবেচনা করা হয়, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্তিতে ভিন্ন  ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি অহেতুক হিংসা-বিদ্বেষ, বিরুদ্ধচারণ এবং ক্ষতিসাধনের চেষ্টায় নিয়োজিত থাকে। এ ক্ষেত্রে মানুষ, মনুষত্ব ও মানবতা নিতান্তই গৌণ; মুখ্য হয়ে দেখা দেয় বিশেষ শ্রেণি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় তোষণ।
উগ্র বা চরমপন্থী সাম্প্রদায়িকতার পরিশিলীত রূপই হচ্ছে বর্ণবাদ। যা সন্ত্রাসবাদের প্রতিভূ। সাম্প্রতিক সময়ে বর্ণবাদ আশ্রিত সন্ত্রাসবাদ সভ্যতা ও মানবতার বিরুদ্ধে মারাত্মক হুমকী হয়ে দেখা দিয়েছে। বস্তুত বর্ণবাদ সেই দৃষ্টিভঙ্গি, চর্চা এবং ক্রিয়াকলাপ যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকগুলো গোষ্ঠীতে (races) বিভক্ত এবং একই সাথে আরও বিশ্বাস করা হয়; কোন কোন গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে উঁচু অথবা নিচু; কিংবা তার উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী; অথবা অধিকতর যোগ্য কিংবা অযোগ্য।
অবশ্য বর্ণবাদের এক এবং অভিন্ন সংজ্ঞা নির্ধারণও সহজসাধ্য বিষয় নয়। কারণ, গবেষকদের মধ্যে গোষ্ঠী (race) ধারণা নিয়েই মতবিরোধটা বেশ প্রবল। এছাড়াও কোনটি বৈষম্য এবং কোনটি বৈষম্য নয় সেটি নিয়েও মতবিরোধ বেশ স্পষ্ট। বর্ণবাদ কখনো গাত্রবর্ণ, কখনো আঞ্চলিকতা, কখনো গোত্র, কখনো বর্ণ (caste) দিয়ে হতে পারে। কারো কারো মতে, মানুষের আচরণ যদি কখনো তার জাতি বা বর্ণ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটি অন্য কারো জন্য ক্ষতিকর না হলেও তাকে বর্ণবাদ বলা হবে। এ বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মত হলো, শুধুমাত্র আঞ্চলিকতা, গোত্র বা বর্ণচিন্তায় প্রভাবিত হয়ে কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা; নিগ্রহ, শোষণ এবং অত্যাচার চালানোর নামই বর্ণবাদ। শেষোক্ত এই মতটিই অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।
বস্তুত ধর্মান্ধতাও  সাম্প্রদায়িকতার নামান্তর মাত্র। ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক উপযোগিতা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন না করেই স্বল্প ও ভাসাভাসা জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে গোঁড়ামী বা চরমপন্থা অবলম্বন করায় হচ্ছে ধর্মান্ধতা। অতীব দুঃখের বিষয় যে, বিশেষ উদ্দেশে ধর্মানূরাগী মানুষদেরকেই এখন ধর্মান্ধ তকমা লাগানো হচ্ছে এবং এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবেই বাড়ছে। কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থে ধর্মান্ধ তারা থাকেন একেবারেই আলোচনা-সমালোচনার বাইরে। এমনকি ‘ধর্মান্ধতা’ শব্দের অপব্যবহারও বেড়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।
ধর্মান্ধতা কী তা যথাযথভাবে উপলব্ধি না করেই ধর্মপ্রাণ মানুষকে ধর্মান্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রীতিমত সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যা এখন বৈশ্বিক সমস্যার রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এই শব্দের অপব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ বলে গালি দেয়া হচ্ছে। অথচ শুধু ইসলাম নয় বরং ‘ধর্মান্ধ’ কথাটি কোন ধর্মেরই ধর্মপ্রাণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আর ইসলামে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ, চরমপন্থা, বর্ণবাদ ও ধর্মান্ধতার কোন স্থান নেই। যা অমুসলিম মনীষীরাও অকুন্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন।
বিখ্যাত ইংরেজ পন্ডিত জর্জ বার্নার্ড শ ইসলাম ও মহানবী (সা.) সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে বলেছেন, ‘চমৎকার প্রাণবন্ততার কারণে মুহাম্মদের ধর্মের প্রতি আমি সবসময় সুউচ্চ ধারণা পোষণ করি। আমার কাছে মনে হয় এটাই একমাত্র ধর্ম যেটা সদা পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। যা প্রত্যেক যুগেই মানুষের হৃদয়ে আবেদন রাখতে সক্ষম। আমি মুহাম্মদকে নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেছি। তিনি অতি চমৎকার একজন মানুষ এবং আমার মতে খ্রিষ্টান বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে অবশ্যই মানবতার ত্রাণকর্তা বলতে হবে’। (Sir George Bernard Shaw in `The Genuine Islam’, Vol. 1, No. 8, 1936.
বস্তুত ভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকার ক্ষুন্ন করে, স্বার্থহানি ঘটিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা-অপপ্রয়াসই সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে গণ্য করা হয়। আর বর্ণবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মান্ধতা উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িকতার পরিশীলিত রূপ মাত্র। আর অন্যের স্বার্থে কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটিয়ে, ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই নিজ সম্প্রদায়ের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা কোনভাবেই কোন নীতি গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। তা সাম্প্রদায়িকতার পর্যায়ভুক্ত বিবেচনার কোনসুযোগও নেই।
সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলমানরাই এখন এর প্রধান ভিকটিম। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ হুমকির মুখে পড়েছে-এমন উদ্ভট ও কল্পিত বিশ্বাস থেকে চালানো সর্বশেষ হামলায় গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে নির্বিচার গুলীবর্ষণে নিহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।  সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা বিশ্বসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব সন্ত্রাসবাদী ও বর্ণবাদী হামলার ঘটনা ঘটেছে তার প্রায় সবগুলোই হয়েছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ঘটনার আদ্যপান্ত পর্যালোচনায় এক ভয়াবহ চিত্রই বিশ্ববাসীর সামনে ওঠে এসেছে। যা বিশ্বশান্তির জন্য মারাত্মক হুমকী হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ২০১৫ সালের অক্টোবরে সুইডেনের ট্রোলহাটনের স্কুলে হামলায় নিহত হন ৩ জন। এ হামলার লক্ষ্যবস্তুও ছিল মুসলমান। নিহতদের মধ্যে ছিলো ১৫ বছর বয়সী আহমেদ হাসান। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিশুটি কয়েক দিন আগেই সুইডেনে এসেছিলো। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে কানাডার কুইবেক অঙ্গরাজ্যের এক মসজিদে সদ্য নামাজ শেষ করা মুসল্লিরা যখন বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ২৯ বছর বয়সী বিসোনেত্তে নামের ব্যক্তি তাদের ওপর গুলীবর্ষণ শুরু করে। বন্দুক হামলাকে প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হয় আজেদাইন সৌফিয়ান নামে এক ব্যক্তি। ওই হামলায় আহত হয় আরও ১৯ জন।
২০১৭ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ডে ছুরিকাঘাতে নিহত ২ জন। অভিযুক্ত হত্যাকারী আদালত কক্ষে চিৎকার করে বলেছিলো, ‘স্বাধীনভাবে কথা বলতে দাও নইলে মরো। তুমি একে সন্ত্রাসবাদ বলতে পারো, আমি এটাকে দেশপ্রেম বলবো’। একই বছরের জুনে যুক্তরাজ্যের ফিনসব্যুরি পার্কের বাইরে একটি মসজিদের বাইরে মুসল্লিদের ওপর চালিয়ে দেওয়া ভ্যানের চাপায় নিহত হয় মুকাররম আলি ও অপর ১২ জন আহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, ড্যারেন অসবর্ন নামের হত্যাকারী ভ্যান হামলার পর চিৎকার করে বলেছিলো, ‘আমি সব মুসলমানকে মারতে চাই-অল্প কয়েকজনকে মারলাম’।
২০১৭ সালের জুনে পূর্ব লন্ডনের বেকটনে ব্রিটিশ মুসলিম মডেল রেশাম খান (২১) এবং তার চাচাতো ভাই জামিল মুখতারের (৩৭) ওপর এসিড হামলা হয়। এতে প্রচন্ডরকমের দগ্ধ হন দু’জনই। রেশাম ও জামিলের ওপর এসিড নিক্ষেপকে মুসলিমবিদ্বেষী হামলা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।
বিশ্বব্যাপী একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, অধিকাংশ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী হামলার সাথে মুসলমানরা জড়িত। কিন্তু চুলচেরা বিশ্লেষণে তা অসার বলেই প্রমাণিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার গবেষণার ফলাফলেও সে চিত্রই ফুটে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা সংস্থার জরিপের ফলাফলে দেখা দেছে, গত ১০ বছরে দেশটিতে শতকরা ৭১ ভাগ হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা।
নিউইয়র্ক-ভিত্তিক সংস্থা অ্যান্টি-ডিফেম্যাশন লিগ কাজ করে ইহুদি-বিরোধী ও বিভিন্ন জাতিগত বিদ্বেষমূলক ঘটনা নিয়ে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যতোগুলো সহিংস হামলার ঘটনা ঘটেছে সেগুলো মধ্যে ৭১ শতাংশ চালিয়েছে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী ও আধিপত্যবাদীরা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালের তুলনায় গতবছর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বেড়েছে ৩৫ শতাংশ।
এদিকে, দ্য ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস অব অস্ট্রেলিয়া নামের স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থাটি জানিয়েছে যে ‘এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে।’ সিডনি-ভিত্তিক সংস্থাটির ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাস সূচক ২০১৮’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে (সারাবিশ্বে) উগ্র-ডানপন্থি দল ও ব্যক্তিরা ১১৩টি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। এতে মৃত্যু হয়েছে ৬৬ জনের।’
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই হামলা হয়েছে ৫৯টি। আর সে বছর মারা গেছেন ১৭ জন। ২০১৭ সালে ১২টি হামলা হয়েছে যুক্তরাজ্যে, ছয়টি সুইডেনে এবং গ্রিস ও ফ্রান্সে দুটি করে হামলা চালানো হয়েছে। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা হয়েছে ৩০টি। তাতে নিহত হয়েছেন ১৬ জন। সংস্থাটির হিসাবে সেসব হামলার অধিকাংশই পরিচালিত হয়েছে ‘মুসলিমবিরোধী ভাবাবেগে আক্রান্ত উগ্র-ডানপন্থি শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা।’
গ্লোবাল টেরোরিজম ডাটাবেজ এর দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সেসব সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে সেগুলো তিনভাগের দু’ভাগ চালিয়েছে বর্ণবাদী, মুসলমানবিরোধী, ইহুদিবিরোধী, ফ্যাসিস্ট, সরকারবিরোধী এবং জাতিবিরোধী ভাবাবেগে প্রভাবিত ব্যক্তিরা।
‘বৈশ্বিক সন্ত্রাস সূচক ২০১৮’ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, চলতি শতাব্দীর শুরুতে উত্তর আমেরিকায় অনেক সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জেহাদি দলগুলোর জড়িত থাকার খবর আসে। কিন্তু, গত দুই বছরে উগ্র-ডানপন্থি রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত চোখে পড়ার মতো। এতে আরও বলা হয়, ‘২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নয়টি সন্ত্রাসী হামলায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। সেসব হামলার জন্যে দায়ী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা।’ প্রতিবেদনটির ভাষ্য মতে, ইসলামপন্থি সন্ত্রাসীদের কথা বেশি শোনা গেলেও বাস্তবতা হচ্ছে, গত ১০ বছরে উগ্র ডানপন্থিরাই বেশি হামলা চালিয়েছে।
মূলত ধর্মীয় সন্ত্রাসের ঘটনাগুলো যেভাবে প্রচারিত হয় উগ্র-ডানপন্থিদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সেভাবে প্রচারিত হয় না। এখন সেদিকটিতে নজর দেওয়া সময় এসেছে। কেননা, সব জায়গাতেই উগ্র-ডানপন্থিদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। উল্লেখ্য, গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দু’টি মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার সময় শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীদের হামলায় অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
উগ্র বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদ সব সময়ই বিশ্ব শান্তি, প্রগতি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। ইতিহাস পর্যালোচনায় সে চিত্রই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। বর্ণবাদী ও সন্ত্রাসবাদীরা প্রতিনিয়ত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করলেও পরিকল্পিতভাবে এসব উগ্রবাদী তৎপরতার জন্য দায় চাপানো হয় মুসলমানদের ওপর। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গবেষণায় এসব অভিযোগের কোন সত্যতা মেলে না।
ইসলাম যেকোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসবাদ, বর্ণবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরোধী। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘কোনো মানুষকে হত্যা করার কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ (করার শাস্তি বিধান) ছাড়া (অন্য কোনো কারণে) কেউ যদি কাউকে হত্যা করে, সে যেন গোটা মানব জাতিকেই হত্যা করলো; (আবার এমনিভাবে) যদি কেউ একজনের প্রাণ রক্ষা করলো তবে সে যেন গোটা মানব জাতিকেই বাঁচিয়ে দিলো’। (সূরা আল মায়িদা-৩২) রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিনে মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিচার করা হবে, তা তাদের মধ্যে সংঘটিত রক্তপাত ও হত্যার বিচার’। (বোখারী, মুসলিম)
গত মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের ২টি মসজিদে বর্ণবাদী খ্রীষ্টান যুবকের হামলায় অর্ধশতাধিক মুসলমান নিহত হওয়ার পর পুরো খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে দায়ী করা হয়নি বরং এজন্য সংখ্যালঘু চরমপন্থীদেরই দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু কলম্বো হামলায় কোন প্রকার তথ্য প্রমাণ ছাড়াই ‘ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত’কে দায়ী করে পুরো মুসলিম সম্প্রদায়কেই দায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে মুসলিম-খ্রিষ্টান দাঙ্গার কোনো উল্লেখযোগ্য কোন নজির নেই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা বারবার খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের ওপর সহিংস আক্রমণ চালিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সহিংস ঘটনায় মেতে উঠছে। তারা গেরুয়া পোশাকের অন্তরালে মাদকের ব্যবসায় করছে, অনেকে অস্ত্র ব্যবসায় পর্যন্ত করছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মুসলমানেরা কখনো কোনো সহিংসতার জন্ম দেয়ার উদাহরণ নেই।
মূলত তিন দশক ধরে শ্রীলঙ্কার মুসলমানেরা নৃতাত্ত্বিক সহিংসতার ‘বলি’ হয়েছে। তবুও তারা লঙ্কার উন্নয়ন ও সামাজিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। অতিনগণ্য সংখ্যক উগ্রপন্থী রয়েছে যাদের অস্তিত্ব সব সম্প্রদায়েই রয়েছে। কিন্তু নানা ছলছুতায় মুসলমানদের আক্রমণ করা হয়। তাদের দোকান ও ঘরবাড়ি লুট করা হয় এমনকি পবিত্র মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ২০১৮ সালে সেন্ট্রাল হিলের ঘটনা এমনই একটি।
বস্তুত, ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীরা কখনোই বিশ্বশান্তির জন্য হুমকী নয় বরং সংখ্যালঘু শ্বেতসন্ত্রাসীরাই এখন বিশ্বশান্তির জন্য প্রধান অন্তরায়। অথচ এসব অপরাধীরা থাকে নেপথ্যে। এরা কোন ধর্মেরই প্রতিভূ নয় বরং সভ্যতা ও মানবতারই প্রতিপক্ষ। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ ট্রাজেডির মাধ্যমে বিশ্বের শান্তি প্রিয় মানুষের অন্তরদৃষ্টি খুলে দিয়েছে। কিন্তু কলম্বোর বিয়োগান্তক ঘটনাকে পুঁজি করে তা আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে কি না সে সন্দেহ করছেন অনেকেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ