ঢাকা, বুধবার 1 May 2019, ১৮ বৈশাখ ১৪২৬, ২৪ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মে দিবসের চেতনা ও ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রাম

অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার : মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবময় দিন। আজ থেকে ১৩৩ বছর আগে ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক সংগঠনের যে বিজয় সূচিত হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কর্মঘন্টা নির্ধারণ, শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিকরা যে আত্মত্যাগ করেছিলেন তা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। শিকাগো শহরে “মকরম্যাক রীপার ওয়ার্কস” নামক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটি শ্রমিকদের রক্তদানের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল মে দিবসের ইতিহাস। এই ঘটনার ৩ বছর পর ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমাবেশ। এ সমাবেশে প্রতিবছর মে মাসের প্রথম দিনকে বিশ্বব্যাপী “আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস” হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এর পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। পরবর্তীকালে ১৯১৯ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএলও গঠিত হয়। কাজের সময়সীমা সম্পর্কে কনভেনশন গৃহীত হয়। এই কনভেনশন পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেরই অনুসমর্থন লাভ করে।  কনভেনশনের বিধান মোতাবেক স্ব-স্ব দেশে কাজের সময়সীমা সম্পর্কে আইন প্রণীত হয়। শ্রমিকদের এ আন্দোলনের ফলে শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন স্বীকৃতি পায়। ক্রমান্বয়ে শ্রমিকদের সামাজিক গুরুত্ব, দাবী আদায়ের আইনগত অবকাঠামো গড়ে উঠে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। মজুরী নির্ধারনের জন্য মজুরী বোর্ড ও মজুরী কমিশন গঠিত হয়। চাকুরীর শর্তাবলীর বিধান নির্দিষ্ট হয়। প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার স্বীকৃতি পায়। এসব শ্রমিক আন্দোলনেরই প্রতিফলন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
মে দিবসের চেতনা : কিন্তু বাস্তবে কি এত সব ব্যবস্থার পরও মেহনতী, দুঃখী বঞ্চিত শ্রমিক সমাজের প্রকৃত মুক্তি অর্জিত হয়েছে? এ প্রশ্ন আজ বিশ্ব জুড়ে। শ্রমিকদের ভাত-কাপড়, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের মত মৌলিক অধিকার আজ শুধু শ্লোগান আর নোংরা রাজনীতির অংশ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শ্রমিকের মুক্তির শ্লোগানকে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করে ক্ষমতার সিঁড়ি বানিয়ে এক শ্রেণীর শোষক নেতৃত্ব নিজেদের ভাগ্য বদল করেছে। কিন্তু অভাগা শ্রমিকদের ভাগ্যের বদল হয়নি। শ্রমিক শ্রেণীর প্রকৃত মুক্তি অর্জিত হয়নি। অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন, শ্রমজীবি মানুষের আহাজারি আজও দিকে দিকে ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত। আমরা বলতে বাধ্য যে, কার্যত মে দিবসের প্রকৃত চেতনা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। শ্রমিকের প্রকৃত মুক্তির চেতনা আলোর মুখ দেখেনি। মে দিবসের তাৎপর্য, মে দিবসের চেতনা তাহলে কি? মে দিবসের চেতনা হলো শ্রমিকের কল্যাণ, তাদের জীবন মানের উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরী নির্ধারণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমের মর্যাদা, শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, শ্রমিক-মালিক সু-সম্পর্ক। এ সবই যেন আজ সোনার হরিণ। সুদুর পরাহত তাই বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে শ্রমিক সমাজকে তার প্রকৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে আজ প্রয়োজন নতুন এক সংগ্রামের। নতুন বিশ্বজয়ী অনুপম এক শ্রমনীতি বাস্তবায়নের। সেই আদর্শ হলো কালজয়ী আদর্শ, বিশ্বনবী (সা.) এর আদর্শ। যে আদর্শ শ্রমনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মহানবী (সা.) দুনিয়ার মেহনতী মানুষকে প্রকৃত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। যার নজির বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই।
ইসলামী শ্রমনীতি : ইসলাম মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাত্র পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, শ্রমনীতি, ব্যবসানীতি, যুদ্ধনীতি, পরারাষ্ট্রনীতি তথা আন্তর্জাতিক নীতিসহ সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে সকল দিক ও বিভাগের মৌলিক বিধিবিধান সমূহ মহান আল্লাহতায়ালা ওহীর মাধ্যমে কুরআন মজিদে নাযিল করেছেন। যা প্রিয়নবী (সা.) এর জীবনের অনুপম আদর্শের মাধ্যমে মানব জাতির কাছে পৌঁছেছে। জীবনের সকল  ক্ষেত্রে এই নীতি ও আদর্শের অনুসরণের মধ্যেই মানবতার কল্যাণ নিহীত রয়েছে। এর ব্যতিক্রম কোন আইন, বিধান, নীতি যেমন আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি তাতে মানব জীবনের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত কল্যাণও সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনে মজিদে এরশাদ করেন-“নি:সন্দেহে জীবন বিধান হিসাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা” (আলে ইমরান: ১৯)। “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (জীবন ব্যবস্থা) পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ন করলাম। আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসাবে পছন্দ করলাম” (সূরা মায়েদা: ৩)।
তাই ইসলামের সকল দিক ও বিভাগের মধ্যে শ্রমনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শ্রমজীবি-পেশাজীবী মানুষের অধিকার মর্যাদা, মজুরীনীতি, চাকুরীর নিশ্চয়তা, মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক উভয়ের প্রতি কর্তব্যবোধ, উৎপাদনশীলতা, শ্রমবিরোধ নিস্পত্তি, চাকুরীবিধি ইত্যাদি সংক্রান্ত ইসলামী আইন ও বিধিকে ইসলামী শ্রমনীতি বলে। অর্থাৎ উল্লেখিত বিষয় ও সমস্যাসমূহের সমাধান করার জন্য কুরআন ও হাদীসের আলোকে যে মূলনীতি রচনা করা হয়, তাকে ইসলামী শ্রমনীতি বলে। ইসলামী শ্রমনীতির ইতিহাস মানবতার ইতিহাসের মত সুদীর্ঘ। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সময়ে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং খলিফাদের যুগে তা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয়। ইসলামের এই শ্রমনীতির সুফল সমাজের সকল স্তরে পরিব্যাপ্ত। এর দ্বারা শ্রমিক মালিক নির্বিশেষে সকল মানুষই লাভবান হবে। বরং এই শ্রমনীতি অনুসরণ করলে সামাজিক শান্তি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে গোটা মানবতা উপকৃত হবে। ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়িত হলে মালিক শ্রমিকের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব থাকবেনা। কেউ কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না, সবাই ভাই হিসেবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে দুনিয়ার জীবনে শান্তি ও আখিরাতে মুক্তির প্রত্যাশা করবে। সকল বিষয় আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার চেতনা জাগ্রত হবে।
আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক যে, ইসলামী শ্রমনীতি সম্পর্কে সুষ্ঠু কোন ধারণা তাদের নেই। এমন কি রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবেও শ্রমজীবী মানুষকে “ইসলামী শ্রমনীতি” বা তার সুফল সম্পর্কে জানাবার কোন উদ্যোগ প্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়। বরং মানবরচিত মতবাদ ও আইন বিধানের চর্চা শ্রমিক সমাজকে দিকভ্রান্ত করে ফেলেছে। তাই পথহারা শ্রমিক সমাজের প্রকৃত মুক্তি ও মর্যাদার জন্য ইসলামী শ্রমনীতির জ্ঞানচর্চা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রামকেও জোরদার করা। মে দিবসের মূল চেতনা তখনই বাস্তবায়ন হবে যখন ইসলামী শ্রমনীতির সুফল সম্পর্কে জনগণকে জাগ্রত করে ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রামকে জোরদার করা যাবে। নিম্নে ইসলামী শ্রমনীতির মৌলিক কয়েকটি বিধান উল্লেখ করা হলো:
মালিক শ্রমিক ভ্রাতৃত্ব : ইসলামের দৃষ্টিতে মালিক আর শ্রমিকের সম্পর্ক মনিব আর দাসের মত নয়। বরং তাদের সম্পর্ক ভাই ভাইয়ের। তারা একজন আরেক জনের অধীনে শ্রম দিতে আইনানুগভাবে বাধ্য ছিলনা। যেমন দাস তার মনিবের প্রতি আনুগত্যের শ্রম দিতে বাধ্য থাকে। বরং একজন শ্রমিক তার নিজের আর্থিক প্রয়োজনে-আর অপর ভাইয়ের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব এই দুইয়ের সংমিশ্রণ হয়েছে বলেই তার আরেক ভাইয়ের অধীনে কাজ করতে এসেছে। একইভাবে ধনী লোকটিও নিজের পণ্য উৎপাদনের প্রয়োজন এবং গরীব ভাইটির প্রতি সহযোগিতার মনোভাব এই দুইয়ের সংমিশ্রণ হয়েছে বলেই তার আরেক ভাইকে নিজের অধীনে কাজে খাটিয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা ভাই-ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে ( কোন বিরোধ হলে) সংশোধন করে নাও”। “আর আল্লাহকে ভয় করো। আশা করা যায় যে, তোমাদের প্রতি রহম করা হবে” (সূরা হুজুরাত: ১০)।
শ্রমিকদের প্রতি সদাচারণের ব্যাপারে মহান আল্লাহর সাধারণ ঘোষনা আল কুরআনের নি¤েœাক্ত আয়াতে পাওয়া যায়: “আর মুমিনদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করে তুমি তাদের প্রতি ¯েœহ মমতার ডানা অবনতিম করো” (সূরা শু’য়ারা: ২১৫)।
অতএব, একথা মাথায় রেখেই একজন শ্রমিককে কাজে খাটাতে হবে যে, সে আমাদের ভাই এবং তার ব্যাপারেও আমি মহান আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবো। সকলেই আদমের সন্তান তাই শ্রমিক-মালিক ভাই-ভাই। এ কারণে একজন শ্রমিককে হীন মনে করা যাবে না, তাকে অধিকার হতে বঞ্চিত করা যাবে না। ইসলামী বিধানে শ্রমিক-মালিক কোন ভেদাভেদ থাকবেনা। সবাই অনুগত ও আল্লাহর বান্দাহ হিসাবে জীবন যাপন করবে।
ন্যায্য মজুরি : শ্রমের বিনিময়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাওয়া একজন শ্রমিকের অধিকার। আর এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম কোন শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করার আগেই তার মজুরি বা পারিশ্রমিক নির্ধারণ করার তাকিদ দেয়। আবু সাঈদ আল খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রসুলুল্লাহ (সা.) কোন শ্রমিককে তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ না করে নিযুক্ত করতে নিষেধ করেছেন (বায়হাকী)। অর্থাৎ যতক্ষণ না তার সাথে তার মজুরি ঠিক করে নেয়া হবে ততক্ষণ শ্রমিককে কাজে খাটানো যাবে না। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ