ঢাকা, শুক্রবার 3 May 2019, ২০ বৈশাখ ১৪২৬, ২৬ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মে দিবসের চেতনা ও ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রাম

অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার : [দুই] ইমাম বাইহাকী বর্ণনা করেছেন- আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী (স.) থেকে বর্ণনা করেন যে “আর যে ব্যক্তি কাউকে শ্রমিক নিযুক্ত করতে চায় সে যেন তাকে তার পারিশ্রমিক জানিয়ে দেয়”।

নবী করিম (সা.) বলছেন, “মালিক যা খাবে পরবে, তার অধীনস্থরাও তাই খাবে এবং পরবে”।

সময়মত মজুরি প্রদান

এক হাদীসে কুদসীতে এসেছ: আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন যে, রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবো। আর আমি যাদের প্রতিপক্ষ হবো তাদেরকে পরাজিত করে ছাড়বো। তারা হলো-এমন ব্যক্তি যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে, এমন ব্যক্তি যে আযাদ মানুষকে ধরে এনে তাকে বিক্রয় করে এবং এমন ব্যক্তি যে কাউকে মজুর নিয়োগ করে পুরোপুরি কাজ আদায় করে নেয়, কিন্তু তাকে তার পারিশ্রমিক পরিপূর্ণ আদায় করে না”।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (র.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগে তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও”। যদি চুক্তির মধ্যে মালিক সাপ্তাহিক/দৈনিক মজুরি প্রদান করে তাহলে বৈধ। কিন্তু তা নিয়ে টাল বাহানা সম্পূর্ন অন্যায়।

নারী ও পুরুষ শ্রমিকের সমতা

শ্রমিকদের মধ্যে যারা নারী তাদের গুরুত্ব কোন মতেই কম নয়। তারা একই পেশায় নিয়োজিত হলে একই রকম সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত হবে। নারী হওয়ার অযুহাতে তাদেরকে কম সুবিধা দেবার কোন সুযোগ নেই। বরং তাকে তার মাতৃত্বজনিত ছুটিসহ কিছু অতিরিক্ত সুবিধা দিতে হবে, যা পুরুষের ক্ষেত্রে দিতে হয়না। 

মহান আল্লাহ নারী পুরষের কাজের প্রতিদানের ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য করেন না। 

আল্লাহ বলেন “আর পুরুষ কিংবা নারী যদি মু’মিন অবস্থায় কোনো সৎকাজ করে তবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাদের প্রাপ্য তিল পরিমাণও নষ্ট হবে না”।

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, “পুরুষ যা অর্জন করে সেটা তার অংশ এবং নারী যা অর্জন করে সেটা তার অংশ” (সূরা নিসা-৩২)।

সাধ্যাতীত বোঝা না চাপানো এবং কর্মঘন্টা নির্ধারণ

আল্লাহ পাকের নির্দেশ: “কারো সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কাজ চাপানো যাবে না” (সূরা বাকারা-২৩৩)। হুযাইফাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (দ.) বলেছেন, তোমাদের পূর্বেকার এক লোকের জান কবজ করার জন্য ফেরেশতা আসলো। তারা (লোকেরা) বলল, তুমি কোন (উল্লেখযোগ্য) নেক আমল করেছো? সে বলল, আমি আমার শ্রমিক ও কর্মচারীদেরকে আদেশ করতাম যেন তারা অভাবীকে অবকাশ দেয় ও ক্ষমা করে। তিনি (বর্ণণাকারী) বলেন, তিনি নবী (স.) বলেছেন, তখন তারাও (ফেরেস্তা) তাকে ক্ষমা করে দিল।

মালিক একজন শ্রমিকের দ্বারা কি ধরনের কাজ নেবে? এবং কত ঘন্টা কাজ করতে হবে? তা উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারন করতে হবে। শ্রমিকের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন কাজও তার উপর চাপানো অন্যায়। রৌদ্র তাপের মধ্যে আট ঘন্টা মাটি কাটার কাজ, আর এয়ারকন্ডিশনে বসেও আট ঘন্টা কাজ, এটা ইনসাফ হতে পারে না। তাই কাজের প্রকৃতি ও কাজের পরিবেশের উপর ভিত্তি করে কাজের সময় নির্ধারিত হওয়া উচিত।

আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শক্তি সামর্থের অতিরিক্ত কাজ শ্রমিকের ওপর চাপাবে না। যদি তার সামর্থের অতিরিক্ত কোন কাজ তাকে দাও তাহলে সে কাজে তাকে সাহায্য কর (বুখারী, মুসলিম)। 

“কাজের প্রকৃতি ও পরিমাণ না জানিয়ে কাউকে কাজে নিয়োগ করা যাবে না”। (আল হাদীস)।

পোষ্যদের ভরণ পোষণ 

প্রত্যেক শ্রমিক তার উপার্জন দ্বারা স্ত্রী-সন্তান ও পিতামাতার ভরণ পোষণের চেষ্টা করে। তাই বেতন এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে নিজের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের পরে তার পোষ্যদের প্রতিও দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিশে^র অন্যতম ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.) বলেন, “সাধারণ নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিবারের লোকসংখ্যা অনুপাতে বেতন নির্ধারণ সহজ নয়। তবে এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের গ্রহণ করা উচিত। আর বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সমূহকে এ জন্য বাধ্য করা যেতে পারে” (রাসায়েল ও মাসায়েল)।

হযরত আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, নবী করীম (স.) এরশাদ করেছেন, “যার উপর যার লালন পালন করার দায়িত্ব রয়েছে, তা উপেক্ষা করাই একজন ব্যক্তির গোনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট” (মিশকাত)।

বর্তমান বিশে^ মজুরির ক্ষেত্রে পোষ্যদের বিষয়টি বিবেচনায়ই আনা হয় না। অথচ মানবিক দিক থেকে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইসলামী শ্রমনীতি বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। 

অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভার টাইম

কোন শ্রমিকের দ্বারা অতিরিক্ত কাজ করানো হলে তাকে অতিরিক্ত মজুরি দেয়া ইসলামী শ্রমনীতির বিধান। যেন সে খুশী হয়ে কাজ সম্পন্ন করে। মহান আল্লাহ বলেন- ‘যে লোক এক বিন্দু পরিমাণ উত্তম কাজ করবে সে তা দেখতে পাবে’ (সূরা যিলযাল-৭)।

নবী করিম (সা.) বলেছেন- “তাদের উপর সাধ্যের অধিক কাজ চাপাবে না। যদি অতিরিক্ত কাজ চাপানো হয়, তাহলে সাহায্য কর” (বুখারী)।

লভ্যাংশে শ্রমিকের অধিকার

প্রতিষ্ঠানে লাভ তখনই আসে যখন পুঁজি বিনিয়োগ করে তাতে শ্রম যোগ করা হয়। মালিকের পুঁজি হল অর্থ, আর শ্রমিকের পুঁজি হলো শ্রম। দুটোর মিলিত শক্তি “লাভের” জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। তাই লাভের অংশটা শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে বন্টন হবে। এটাই ইসলামের চূড়ান্ত মত। 

মহান আল্লাহ বলেন, “সম্পদ এমনভাবে বন্টন কর, যেন তা শুধু ধনী লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে” (সূরা হাশর-৭)।

“বিত্তবানদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে” (সূরা যারিয়াত-৭)।

নবী করীম (দ.) বলেন, “মজুরকে তার কাজ হতে অংশ দান কর। কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যেতে পারে না। শ্রমিককে তার উপার্জন থেকে দাও। কারণ শ্রমিককে বঞ্চিত করা যায় না” (মুসনাদে আহমদ)।

পুঁজিবাদী সমাজে মালিকরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করে বিলাসবহুল জীবন যাপনের জন্য লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে অপচয় করে থাকে। সমাজতান্ত্রিক দেশে লাভের সবটুকু অংশ রাষ্ট্রের অধীনে চলে যায়। শ্রমিক সমাজকে পশুর মত খাটিয়ে মারে, আর শাসকগোষ্ঠি ও তার পেটোয়া বাহিনী নিজেদের জন্য স্বর্গ তৈরি করে। তাই ইসলাম লভ্যাংশে শ্রমিকের অংশ নিশ্চিত করে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করতে চায়।

ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের অংশগ্রহণ

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানার ভাল মন্দের সাথে যেমনি মালিকের ভাগ্য জড়িত, তেমনি শ্রমিকেরও ভাগ্য জড়িত। কারণ শ্রমিকের পুঁজি, শ্রম, সেখানে বিনিয়োগ করা এবং শ্রমিকরা বাস্তব ময়দানে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সম্পর্কে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকাটাই স্বাভাবিক। ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে পারলে শ্রমিকদের সুচিন্তিত মতামত প্রদান করে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতির পথে ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রমিক মালিক ভাই-ভাই এবং সুখ দু:খের সমান অংশীদার ও সংরক্ষক-এটাই এ চেতনার মূলনীতি।

মহান আল্লাহ বলেন- “তুমি লোকদের সাথে প্রত্যেক বিষয়ে পরামর্শ কর” (সূরা আলে ইমরান-১৫৯)। 

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী করিম (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের শাসকরা চরিত্রবান হবে, সম্পদশালী লোকেরা দানশীল হবে এবং পারস্পারিক বিষয়ে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করবে তখন পৃথিবীর নীচের অংশের চাইতে উপরের অংশ তোমাদের জন্য উত্তম হবে (তিরমিযী)।

শ্রমিকদের প্রতিনিধির ব্যবস্থাপনায় থাকার অধিকার ইসলাম দিয়েছে।

চাকরির নিরাপত্তা

প্রতিটি নাগরিকের চাকরির নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের। বিনা কারণে মালিক যদি কোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে তাহলে সে মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকার বাধ্য থাকবে। শ্রমিকদের কোনো অপরাধ হলে তার বিচার করার দায়িত্ব সরকারের। তা কোনো ব্যক্তি বা মালিকের খেয়াল খুশির উপর ছেড়ে দেয়া যাবে না।

মহান আল্লাহ বলেন: “ঈমানদার লোকদের মধ্যে যারা তোমাদের অধীনস্থ তাদের সাথে ন¤্র ব্যবহার কর” (সূরা শু’আরা-২১৫)।

“তোমাদের অধীনস্থরা যদি সত্তরবারও অপরাধ করে তা হলে ক্ষমা করে দাও (আল হাদীস)।

এসব নিদের্শনার মাধ্যমে ইসলাম প্রত্যেকের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।

ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষি অধিকার

সংগঠন হচ্ছে এক প্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম। যোগ্য ও উপযুক্ত সংগঠন ছাড়া উৎপাদন এবং শ্রমিক সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সংগঠন বিষয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে ইসলাম আগাগোড়া একটি সংগঠন ছাড়া কিছুই নয়। নামাযের মধ্যে ইমামত, রাষ্ট্রের মধ্যে খেলাফত ও হজে¦র মধ্যে ইমারাত  (নেতৃত্ব) এসব কিছুতেই ইসলামী সংগঠনের পরিচয় মেলে। হযরত উমর (রা.) বলেছেন- “জামায়াত ব্যতীত ইসলাম হয়না”।

ইসলামী শ্রমনীতি ব্যবস্থায় প্রত্যেক শ্রমিক সংগঠন করার অধিকার পাবে। শ্রমিকদের জন্য শ্রমিকদের দ্বারা আইনানুগভাবে গঠিত ট্রেড ইউনিয়নের একটা মৌলিক দায়িত্ব হলো মালিক পক্ষের সাথে দরকষাকষি ও আলোচনা করে সমস্যার সমাধানে পৌঁছা। দরকষাকষি মানবজীবনের সকল ব্যাপারেই একটি স্বভাবজাত প্রক্রিয়া। দরকষাকষির মাধ্যমে প্রতিটি জিনিসের মূল্য নিরুপিত হয়ে থাকে। যেমন হযরত মূসা (আ.) হলেন শ্রমিক এবং হযরত শোয়ায়েব (আ.) হলেন মালিক। তাদের দুজনের মধ্যে দরকষাকষি হয়েছিল। সূরা কাছাছ এর ২৭.২৮ নং আয়াতে সেই চাকরি, বিনিময় ও চুক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আধুনিক যুগে শ্রমজীবি মানুষের অধিকার আদায়ের একটি শক্ত হাতিয়ার হল দরকষাকষি। যা পবিত্র কুরআনে দৃষ্টান্ত হিসাবে মহান আল্লাহ পেশ করেছেন।

অবসরকালীন ভাতা

শ্রমিকের প্রতি মালিকের দায়িত্ব শুধু চাকরি চলাকালীনই নয়, বরং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরও শ্রমিকের দায়িত্ব মালিককে সাধ্য অনুসারে অবশ্যই নিতে হবে। মালিক অসহায় বৃদ্ধ, অসুস্থ, বিকলাঙ্গ হওয়া শ্রমিকের প্রতি দায়িত্ব পালনে যদি অবহেলা করে, তা হলে রাষ্ট্রীয় আইনে মালিকের শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। ইসলামী সমাজে সকল শ্রমিক ও নাগরিক অবসরকালীন ভাতা পাবেন এবং সকল অসহায় মানুষ বয়স্ক ভাতা পাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ