ঢাকা, শনিবার 4 May 2019, ২১ বৈশাখ ১৪২৬, ২৭ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মৃতদেহ জড়িয়ে ঘুমিয়েছি সারারাত

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আমার এ কলামে অনেকের কথাইতো লেখি। মানুষের সুখ, দুঃখ, হাসি-কান্না, কতো কিছু নিয়েইতো প্রায় চল্লিশ বছর ধরে লেখছি। দুয়েকটা ব্যতিক্রম ব্যতীত এসব লেখা কারুর তেমন উপকারে এসেছে বলে মনে হয় না। তবু লেখি। লেখালেখিই পেশা এবং নেশা বলে লেখি। রাজনীতি, সমাজের অসঙ্গতি, অনিয়ম অনেক কিছুই অল্পস্বল্প উঠে এসেছে এসব লেখায়।
আজ নিজের জীবনের একটি বাস্তব সত্য ঘটনা উপস্থাপন করতে চাই। কেউ কেউ হয়তো ঘটনাটা জানেন। তবে অনেকেই জানেন না। তাই নতুন করে প্রায় পাঁচ দশক আগের দিনে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
আমি তখন ছয়-সাত বছরের শিশু। এক অনিবার্য কারণে মা বেঁচে থেকেও নেই। বাবা প্রায় বাউন্ডেলে। গৃহলক্ষ্মী স্ত্রী না থাকলে যা হবার তাই হয়েছে  বাবার। কোথাও গেলে ঘরে ফেরার কথা মনে থাকে না। দিনের পর দিন চলে যায়। কখনও কখনও কয়েক মাসও চলে যায় তার বাইরেবাইরে।
ভাগ্যিস পত্রেশ্বরী অর্থাৎ আমার মা পার্বতী রায়ের দাদি বেঁচে ছিলেন। সংসারটা তিনপায়ে হাঁটা পত্রেশ্বরীকেই দেখতে হয়। তাঁকে সাহায্য করে আরও দুই নাতি ভট্ট রায় আর চৈতন্য রায়।
মায়ের অবর্তমানে পত্রেশ্বরীই আমার মা। আমরা মায়ের দাদিকে জেঠিমা ডাকি। রাতে ঘুমাইও তিনপায়ে হাঁটা জেঠিমার সঙ্গে। বুকসেঁটে।
একদিন শীতের সকাল। জলখাবার বা সকালের নাস্তার সময় চলে যাচ্ছে। কিন্তু জেঠিমা ঘুম থেকে জাগছে না। সবার নাস্তা প্রায় শেষ। বড়মামা ভট্ট রায় আমাকে বললেন....
: বাবু যাও তো তোমার জেঠিমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে নাস্তা খেতে নিয়ে এসো।
বড়মামার নির্দেশ পেয়ে জেঠিমাকে ঘরে ডাকতে গেলাম। জেঠিমার গায়ে হাত দিয়ে বললাম—-
: জেঠিমা! জেঠিমা! খাবে, ওঠো। বেলা অনেক হয়েছে। জেঠিমা, ওঠো!
 জেঠিমার শরীর ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডেকেও যখন জাগাতে ব্যর্থ হলাম তখন ঘর থেকে বেরিয়ে বললাম....
: না, জেঠিমা ওঠে না। এখনও ঘুমোচ্ছে।
আমার কথা শুনে মনে হয় সবার সন্দেহ হলো। তাই দৌড়ে ঘরে গিয়ে বড়মামা ভট্ট রায় জেঠিমার গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন। বলে উঠলেন, ‘না। আর নেই।’
নিথর হিমশীতল দেহটা পড়ে আছে। কখন জেঠিমা মারা গেছে কেউ জানেও না। অথচ এই মৃতদেহটা জড়িয়ে আমি ও আমার দু’তিন বছরের বোন প্রমিলা সারারাতই ঘুমিয়েছিলাম নিশ্চিন্তমনে। নির্ভয়ে। জ্ঞাতসারে কেউই মৃতমানুষের সঙ্গে ঘুমোয় না। ঘুমোবার সাহস পায় না।
 জেঠিমা মারা গেছে বুঝতে পেরে সারাবাড়ি কান্নার রোল পড়ে গেল। জলদি জলদি  আত্মীয়স্বজনদের খবর দেয়া হলো। অন্যদিকে শবদাহের আয়োজন চললো।
প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে খোল-করতাল আর শঙ্খ বাজিয়ে, সাদা কাপড়ে কফিন সাজিয়ে শবযাত্রার কীর্তন গাইতে গাইতে টাঙ্গননদীর শ্মশানঘাটের দিকে রওয়ানা দেবে সবাই। এমন সময় আমি জেঠিমার সঙ্গে যাবার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। অথচ শিশুদের শবযাত্রায় নেবার নিয়ম নেই। আমি জোরে জোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেই চললাম....
: জেঠিমাকে কোথায় নিচ্ছো? আমিও যাবো। আমরা রাতে কার কাছে ঘুমোবো? জেঠিমা ঘুমিয়ে আছে। আমিও ঘুমোবো। জেঠিমাকে নিওনা....
আমাকে থামাতে না পেরে শবযাত্রার সঙ্গে নিতে বাধ্য হলো সবাই।
শ্মশানঘাটে চিতা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। শবযাত্রা চিতাস্থলে পৌঁছুলে ‘হরিবোল হরিবোল’ ধ্বনি দিতে দিতে সঙ্গীতের তালে তালে মৃতদেহটা সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় চিতায় রাখা হলো। তারপর আরও শুকনো কাঠ দেয়া হলো। এরপর ভট্ট রায় শবদেহে মুখাগ্নি করলে চিতার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। মুহূর্তে কাফনের কাপড় পুড়ে গিয়ে জেঠিমার দেহটা বিবস্ত্র হয়ে পড়লো। টাকিমাছ আগুনে পোড়ালে যেমন শরীরটা ছড়িয়ে দেয়, তেমনই যেন শবদেহটা চিতার আগুনে হাতপা ছড়িয়ে দিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে  জেঠিমার অন্তিম অবস্থা প্রত্যক্ষ করলাম। কাঁদলামও অনেকক্ষণ ধরে।
প্রাচীন পদ্ধতিতে শবদেহ পুড়তে অনেকক্ষণ সময় নেয়। চিতার ধোঁয়া আর মৃতদেহ পোড়ার আঁশটে গন্ধে আশপাশের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। শবযাত্রার সঙ্গে আসা দু’তিনজন লোক কাঁচা বাঁশের সূচালো আগা দিয়ে  জেঠিমার মৃতদেহটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাড়াতাড়ি পোড়ার উপযোগী যখন করছিল, তখন আমার কিশোর কলজেটাও যেন এফোঁড়-ওফোঁড় হচ্ছিল বারবার!
পরবর্তীকালে বড় হয়ে পড়ালেখা শিখে জেঠিমার মৃতদেহ পোড়ানোর বিষয় নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করি। শবদাহের লাকড়ি, বড়লোক হলে ঘি ইত্যাদি বাবদ অঢেল অর্থ ব্যয় হয়। পরিবেশ দূষিত হয়। গাছপালা নষ্ট হয়। ছাইভষ্ম নদীর জলে মিশে দূষণ ছড়ায়। অথচ অন্য ধর্মের প্রতিবেশীদের মতো সযতœ শবদেহ দাফনের ব্যবস্থা করলে মাটির দেহ মাটিতেই মিশে জমি উর্বর হয়। ফসলের উৎপাদন বাড়ে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হয় না। পরিবেশসহ নদী ও সমুদ্রের জল দূষণ থেকে বেঁচে যায় অনেকখানি।
মৃতদেহ দাহ করবার মতো অসম্মানজনক ও অবৈজ্ঞানিক উপায়ে শেষকৃত্য না সম্পন্ন করে অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের মতো দাফনের ব্যবস্থা করলে কতই না সুন্দর ও বিজ্ঞানসম্মত হতে পারতো।
সেদিনের আমি পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে আজও যখন টাঙ্গনের তীরে হাঁটি তখন জেঠিমাকে চিতায় পোড়াবার সময় যে আঁশটে বিশ্রী গন্ধ বাতাস ভারি করে তুলেছিল তা যেন আজও আমাকে কুঁকড়ে দেয়। বেদনার্ত করে। কাঁদায়। প্রিয়জনের মৃতদেহ পোড়াবার পুরনো নির্দয় ও অমানবিক প্রথা আমাকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। নাসিকা কুঞ্চিত হয় শবদাহের অসহনীয় উৎকট গন্ধে। এইতো ক’দিন আগে আমার চেয়ে বয়সে ছোট  মাসিমা নিধু রায়কে একইভাবে দাহ করা হয়েছে। মামা ভট্ট রায়কেও কয়েক বছর আগে দাহ করা হয় টাঙ্গনের শ্মশানঘাটে। তবে জেঠিমাকে স্বচক্ষে যেভাবে দাহ হতে দেখেছি তা আমি আজও ভুলিনি। ভুলতে পারিনি।
আজকাল বৈদ্যুতিক চুল্লিতে শবদাহের সিস্টেম চালু হলেও এ উপমহাদেশের কোটি কোটি গ্রামে প্রাচীন পদ্ধতিতেই শবদাহ করা হয়। অপব্যয়, পরিবেশ আর নদনদীর জলদূষণের এ অপকর্মটি কবে বন্ধ হবে কে জানে!
বিষয়টি আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবায়। জেঠিমার নির্মম দাহদৃশ্য মনে হলেই দু’চোখ দিয়ে টাঙ্গনের স্রোতধারা নেমে আসে। বুকের ভেতর যেমন চিতার আগুন জ্বলে ওঠে, তেমনই চোখের জলও যেন টাঙ্গনের ক্ষীণ স্রোতধারা হয়ে বয়ে চলে নিরন্তর।
তবে সারারাত জেঠিমার হিমশীতল মৃতদেহটা জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকবার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা জীবনচলার পথে আমাকে যথেষ্ট সাহস জুগিয়েছে। রোমাঞ্চিত এবং প্রাণিত করেছে বারবার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ