ঢাকা, শনিবার 4 May 2019, ২১ বৈশাখ ১৪২৬, ২৭ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মে দিবসের চেতনা ও ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রাম

অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার : [তিন]
মহান আল্লাহ বলেন- “আল্লাহ তায়ালা যা কিছু (সম্পদ) জনগণের কাছ থেকে নিয়ে তার রসুলের নিকট ফিরিয়ে দিয়েছেন তা হচ্ছে আল্লাহর জন্য, রসুলের জন্য, আত্মীয় স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন ও অভাবীদের জন্য। যেন তা (সম্পদ) কেবল বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়”। (সূরা হাশর-৭)। তাই ইসলামী সমাজে সকল শ্রমিক ও নাগরিক অবসরকালীন ভাতা পাবে।
চাকরির পদোন্নতি
চাকরিতে পদোন্নতি অবশ্যই প্রয়োজন। শ্রমিকদের কাজে পদোন্নতি যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়াই ইনসাফের দাবি। যোগ্যতার সাথে এ ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্বজনপ্রীতি, আঞ্চলিকতা ও পক্ষপাতিত্ব পরিহার করা প্রয়োজন। সার্বিক উপযুক্ততার বিচারে চাকুরীতে পদোন্নতি পাওয়া একটি  অধিকার। এ অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা অপরাধ।
মহান আল্লাহ বলেন- “ধন সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নির্ধারিত করেছেন। তোমরা তা নির্বোধ লোকদের হাতে ছেঁড়ে দিওনা। অবশ্য তাদের খাওয়া ও পরার ব্যবস্থা কর এবং তাদেরকে উপদেশ দাও” (সূরা নিসা-৫)।
শিক্ষা প্রশিক্ষণ
শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। মালিক ব্যর্থ হলে সরকারকে সকলের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ছাড়াও বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মক্ষম করা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের সন্তানদের লেখা-পড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামী সমাজে শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
তাই ইসলামের প্রথম বাণী- “পড়, তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন” (সূরা আলাক-১)। “বলে দিন যাদের জ্ঞান আছে এবং যাদের জ্ঞান নেই, তারা কি সমান হতে পারে”? (সূরা যুমার-৯)।
“প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ” (বুখারী)।
ছুটির ব্যবস্থা
শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের জন্য বিশ্রাম, আপনজনের সাথে একত্রে থাকা, পারিবারিক ও সামাজিক উদ্দীপনা ইত্যাদির জন্য সাপ্তাহিক ও বাৎসরিক ছুটি প্রয়োজন।
মহান আল্লাহ বলেন- “আল্লাহ তোমাদের প্রতি সহজতা ও ন¤্রতা আরোপ করতে চান। কঠোরতা ও কঠিনতা আরোপ করতে ইচ্ছুক নন”। নবী করিম (সা.) বলেছেন- তোমরা তোমাদের কর্মচারীদের থেকে যতটা হালকা কাজ নেবে, তোমাদের আমলনামায় ততটা পুরস্কার ও পূণ্য লেখা হবে (তারগীব ও তাহরীব)। সুতরাং ইসলামী শ্রমনীতিতে মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ সকল ধরনের ছুটির ব্যবস্থা থাকবে।
ন্যায় বিচার লাভের অধিকার
ইসলামে সকল নাগরিকের ন্যায় বিচার লাভ করা মৌলিক অধিকার। আল কুরআনে ন্যায় বিচারের কঠোর নির্দেশ রয়েছে। “তোমরা যখন লোকদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করবে তখন অবশ্যই ন্যায় বিচার করবে” (সূরা নিসা-৫৮)।
“কোন বিশেষ শ্রেণীর লোকদের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের কোন রকম অবিচার করতে উদ্ধুদ্ধ না করে” (সূরা মায়েদা-৮)।
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা সকলে ন্যায়নীতি নিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াও। আল্লাহর জন্য স্বাক্ষী হও তোমাদের সুবিচার যদি তোমাদের নিজেদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধেও হয়। আর পক্ষদ্বয় ধনী কিংবা গরীব যাই হোক না কেন, তাদের সকলের অপেক্ষা আল্লাহ উত্তম। তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে গিয়ে ন্যয় বিচার হতে বিরত থেকোনা” (সূরা নিসা-১৩৫)।
হযরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.) বলেন- রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “তোমরা নিকটবর্তী এবং দূরবর্তী সকলের উপরে আল্লাহর দন্ডবিধি কার্যকরী কর। আল্লাহর ব্যাপারে যেন কোন অত্যাচারী তোমাদেরকে বাধা দিয়ে রাখতে না পারে (ইবনে মাজাহ)।
আজকের বিশ্বে বিচার ব্যবস্থা ক্ষমতাসীন সরকার পুঁজিবাদী ও প্রভাবশালী লোকদের হাতে বন্দী। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রভাব খাটিয়ে বিচারের রায় উল্টে দেয়া হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে রায় কেনা বেচা হচ্ছে। তাই গরীব ও শ্রমিক সমাজের জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামী শ্রমনীতির বাস্তবায়ন অনিবার্য।
উপসংহার
উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের শ্রমনীতি প্রকৃতপক্ষে পেশা ও কর্মসংশ্লিষ্ট পক্ষ সমূহ; মালিক ও শ্রমিকের  জন্য সত্যি মহা কল্যাণকর। ইসলামী নীতিতে শ্রমের বিশাল মর্যাদা রয়েছে। কাজহীন মানুষকে সমাজের জন্য মানহানিকর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈধ-অবৈধ কাজের সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। কারণ বৈধ ও পবিত্র বস্তু মানুষের জন্য কল্যাণকর। অবৈধ বস্তু মানুষের জন্য সাধারণত অকল্যাণ ও ক্ষতিকর। একইভাবে ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং তার অধিকারের উপর পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক কল্যাণের নিশ্চয়তা দিয়েছে। আবার মালিকের দায়িত্ব কর্তব্য এবং তার অধিকারের ব্যাপারেও ইসলাম সুরক্ষা দিয়েছে।
তাই ইসলামের শ্রমনীতি এক অনুপম, সার্বজনীন ও চিরশ্বাশ্বত নীতিমালা। আধুনিক বিশ্বের অস্থির ও বৈষম্যপূর্ণ শ্রম ব্যবস্থায় শ্রমিক মালিকের মধ্যে শুধু হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বঞ্চিতদেরকে তাদের অধিকার রক্ষায় অনেক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মানবতা সেখানে পদদলিত হচ্ছে। যা পৃথিবীর সার্বিক পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলছে। মানুষ শান্তির বদলে অশান্তির দাবানলে জ¦লছে। এমতাবস্থায় ইসলামী শ্রমনীতি অনুসরণের ফলে মালিক ও শ্রমিক পক্ষ উভয়ই তাদের নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করতে পারে। তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় মানবিক সুসম্পর্ক, সম্প্রীতি যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে শ্রমিক-মালিক, কল-কারখানা, শিল্প ও কর্মস্থলে। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি হয়। মান, পরিসংখ্যান, পরিকল্পনা সবকিছুতেই উন্নতির পরশ লাগে। শ্রমিক-মালিক, উর্ধ্বতন, অধ:স্তন, ইত্যাদি, ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ, জিঘাংসা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য মনোভাবসহ সকল ক্ষতিকর উপসর্গের অবসান হয়। মহান মে দিবসের মূলত এটাই ছিল শ্রমিকদের আত্মদানের মূল চেতনা। কিন্তু সে চেতনা বাস্তবায়ন হয়নি, বরং আজ এটা বাস্তবে প্রমাণিত যে, মানবরচিত মতবাদ নয়-ইসলামেই কেবল এমন ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা এবং চিরকল্যাণকর মহাব্যবস্থা রয়েছে। এজন্য প্রয়োজন ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।
এ জন্য প্রচলিত ধারার বাইরে প্রয়োজন এক নতুন ধারার শ্রমিক আন্দোলন। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন এ দেশে ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী এবং সরকারের নিবন্ধিত একক শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে তাই ইসলামী শ্রমনীতির সংগ্রামকে জোরদার করে মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব। আল্লাহ আমাদেরকে তৌফিক দান করুন, আমীন। [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ