ঢাকা, রোববার 5 May 2019, ২২ বৈশাখ ১৪২৬, ২৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণ অর্থনীতি পরিপূরক হতে পারে

সংবাদপত্রের খুব সাম্প্রতিক একটা শিরোনাম ‘কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে সামাজিক বৈষম্য’। এই শিরোনামের অধীন রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, ‘দেশে ২০১৮ সালে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন। এর আগের বছর মানে ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭১ হাজার ৬০০ জন। এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে এক বছরের ব্যবধানে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার হাজার। খুব সহজ কথায় এর অর্থ হলো, ধনীর সংখ্যা বেড়েছে অন্যদিকে গরিবের আয় কমেছে। অর্থাৎ প্রান্তিক গরিবের তালিকায় আরও বেশি গরিবের নাম যোগ হয়েছে। এই চিত্রটিই উন্নত অর্থনীতিতে আরেকটু অন্যভাবে দেখা যায়। আমাদের উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে আমরা দেখছি, ধনীর সংখ্যা বাড়ছে গরিবের সংখ্যাও বাড়ছে। এই চিত্রটাই উন্নত অর্থনীতিতে এইভাবে দেখি যে, সেখানে ধনীর সংখ্যা কমছে কিন্তু সম্পদ তাদের বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু ধনী গরিবের তালিকায় নেমে যাচ্ছে, আর বাড়ছে গরিবের সংখ্যা। গোটা দুনিয়ায় আজ সম্পদের মালিকানা চিত্রের এটাই প্রবণতা।
অন্যকথায় পুঁজিবাদী অর্থনীতির এটাই চরিত্র। মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধ প্রতিযোগিতা আসলে প্রবল একটা অর্থনৈতিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যার যত জোর, তার বাঁচার অধিকার, মানে ধনশালী হবার অধিকার তত বেশি। এই যুদ্ধে পুঁজির নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বড় করে দেখা হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে যে কোনো মূল্যে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়াবার জন্যে রফতানি বাড়াতে হবে এবং রফতানির জন্যে দখলে আনতে হবে ক্রমবর্ধমান মার্কেট। সবাই চায় যখন মার্কেট, তখন মার্কেট পাওয়া সহজ না, খুবই কঠিন। এই কঠিন কাজকে সহজ করার জন্যেই শক্তিশালী অর্থনীতির বড় বড় শক্তিগুলো লোভনীয় মার্কেটগুলোর উপর, অন্যকথায় সম্ভাবনাময় মার্কেটের দেশের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে তৎপর হয়। এই আধিপত্য অনেকটাই ‘ছায়া আধিপত্য’ ধরনের। দুর্বল দেশগুলো প্রত্যক্ষভাবে পরাধীন না হলেও তাদের রাজনীতি-সংস্কৃতি এবং অবশ্যম্ভাবি ফল হিসেবে অর্থনীতিও পরোক্ষভাবে  বন্দী হয়ে পড়ে শক্তিমান দেশগুলোর হাতে। ধীরে ধীরে এই দুর্বলদের সংখ্যা দুনিয়াতে বাড়ে এবং জোর যার মুল্লুক তার নীতির কবলে শক্তিমানরা আরও বড় হয় আর কমে আসে তাদের সংখ্যা। দেশের ক্ষেত্রে যেমন, ব্যক্তি-মানুষের তেমনটাই ঘটছে। দেশের উন্নয়ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধনীদের উন্নয়ন, গরিবরা আরও গরিব হয়ে পড়ছে। সম্ভাবনাময় উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়নের একটা পর্যায়ে পর্যন্ত ধনীদের সংখ্যা বাড়ে, বাড়ে গরিবদের সংখ্যাও। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন সীমিত সম্পদ বা সুযোগ বা বাজার নিয়ে কাড়াকাড়ি যখন ধনীদের মধ্যে বেড়ে যায়, তখন বড় ধনীরা আরও বড় হয়, ছোট ধনীরা প্রতিযোগিতায় হেরে গরিবের দল ভারি। যেমন আমাদের দেশে আজ বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাছে দুর্বল দেশীয় অনেক কোম্পানি প্রতিযোগিতায় পরাজিত হয়ে মার্কেট ছেড়ে দিয়ে সরে যাচ্ছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধ প্রতিযোগিতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যে খারাপ নয়, যদি তার ঘাড়ে নীতি, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শৃঙ্খল পরানো হয়। তেমনি ব্যক্তি ক্ষেত্রে ধনীদের যেকোন মূল্যে অতি ধনী হওয়ার প্রবণতায় নীতি-নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের শৃঙ্খল পরানো যায়, তাহলে গরীবরা, ছোট ধনীরা বাড়তি সুযোগ-সুবিধার আনুকূল্য লাভ করে প্রতিযোগিতার সুস্থ পরিবেশে ফিরে আসতে পারে। ইসলামের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতির অবাধ প্রতিযোগিতার মুখে এবং ধনীকে অতি ধনী করার অন্যায় ও অনৈতিক আইন-আনুকূল্যের উপর সুস্থ ও কল্যাণকর নিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খল পরিয়ে থাকে। আমাদের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকান্ডে এই মানবিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা খুব তীব্রভাবেই অনুভূত হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ