ঢাকা, রোববার 5 May 2019, ২২ বৈশাখ ১৪২৬, ২৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিএনপির ৫ সদস্যের শপথ গ্রহণ বিভিন্ন মহলে বিভ্রান্তি

আল্লাহর কাছে লাখ শোকর, ঘূর্ণিঝড় ফণী বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলে গেছে, তবে  এই দেশে মরণ ছোবল হানে নাই। অবশ্য ১৮টি প্রাণ ঝরে গেছে। এটিও কম ক্ষতি নয়। ১৮ জনের মধ্যে ৬ জনই মারা গেছেন বজ্রপাতে এবং অন্যদের মধ্যে অধিকাংশই ঘর ধসে যাওয়ায় চাপা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি আগের ঘূর্ণিঝড়গুলোর তুলনায় তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। তবে আমরা অবাক হই যে ভারতের উড়িষ্যায় ২১০ কিলো মিটার বেগের ঝড়ে যেখানে মৃতের সংখ্যা মাত্র ৩ সেখানে বাংলাদেশে ৬২ থেকে ৮২ কিলো মিটার ঝড়ের বেগে নিহত হলেন  ৮ জন। যাই হোক, মৃতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি আমরা এবং বাংলাদেশকে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য পরম করুণাময়ের কাছে আবার শোকর গোজার করছি।
এখন আসছি মূল আলোচনায়। গত সপ্তাহের পুরোটা জুড়েই আলোচনায় ছিল বিএনপির ৫ জন সদস্যের শপথ গ্রহণ এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ না নেওয়া এবং তার আসন শূন্য হওয়া। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ২৯ ডিসেমম্বর রাতের ভোট এবং ৩০ ডিসেম্বর মহা-ভোট ডাকাতি করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে গেলেও দেশের ৯০ শতাংশ জনগণ তখনও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল এবং এখনও আছে। সেই ৯০ শতাংশ জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিএনপির এই ৫ এমপির শপথ গ্রহণের কারণে চরমভাবে ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত। তারা ঠিক ভেবে পাচ্ছেন না যে, তারা শপথ গ্রহণ না করলে বিএনপির কি এত বড় ক্ষতি-বৃদ্ধি হতো।
কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যত্র। বিএনপির তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমানের নির্দেশক্রমেই ৫ এমপিলের মধ্যে ৪ জন শপথ গ্রহণ করেছেন। ঠিক এই স্থানে এসে সাধারণভাবে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ^াসী এবং আওয়ামী বিরোধী ঘরানার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি। বিভ্রান্তির কারণ হলো এই যে, এই শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিএনপির হাইকমান্ড মাত্র ৬ জনের ক্ষেত্রে ৩ ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। চাঁপাই নবাব গঞ্জের জাহিদুর রহমানকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে শপথ গ্রহণ না করতে। তাকে বলা হয়েছে যে, শপথ গ্রহণ করলে তাকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাহিদুর রহমান শপথ নিয়েছেন। শপথ নিয়ে তিনি গর্বভরে বলেছেন যে, আমি জানি, আমার দল আমাকে বহিষ্কার করবে। তারপরেও আমার এলাকার জনগণের চাপে আমি শপথ গ্রহণ করেছি। তিনি শপথ গ্রহণ করার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
অবশিষ্ট ৪ জনের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়েছে ভিন্ন সিদ্ধান্ত। প্রথম যখন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে  চাঁপাই নবাবগঞ্জের হারুনুর রশীদের নেতৃত্বে ঐ ৪ জন শপথ গ্রহণ করেছেন তখন বিএনপি হাইকমান্ড থেকে তাদেরকে হুমকি দেওয়া হয় যে শপথ গ্রহণ করলে তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে। এই সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে দলের স্থায়ী কমিটি। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তারা সেটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানায়। তারা এও জানায় যে তাদেরকে বারণ করা সত্ত্বেও শপথ গ্রহণের ব্যাপারে তারা অনড়। তারেক রহমান একবার স্থায়ী কমিটির সাথে কথা বলেন, আরেকবার ঐ ৪ জন এমপি ডেজিগনেটের সাথে কথা বলেন। উভয়ের সাথে কথা বলার পর তিনি ঐ ৪ জনের শপথ গ্রহণের ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করেন। ফলে এটি দলীয় সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। অতঃপর ঐ ৪ জন সদস্য শপথ গ্রহণ করেন।
কিন্তু এখানেও একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকে যায়। ঐ ৪ জন সদস্য দলীয় সিদ্ধান্ত এবং সম্মতিক্রমে শপথ গ্রহণ করেন, কিন্তু তার পরেও যে একজন সদস্য থেকে যান তার বেলায় কি হলো? তিনি হলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। প্রথমে এই মর্মে খবর রটে যায় যে, তিনি পরে শপথ নেবেন। সেজন্য সময় চেয়ে তিনি স্পীকারের নিকট আবেদন করেছেন। এগুলো সব ২৯ তারিখের ঘটনা। ২৯ তারিখই ছিল সংবিধান এবং কার্যপ্রণালী বিধি মোতাবেক শপথ গ্রহণের শেষ দিন। ঐ দিন রাতে (অর্থাৎ ঐ ৪  জন শপথ গ্রহণের অন্তত ৪ ঘন্টা পর) মির্জা ফখরুল এক সাংবাদিক সন্মেলনে জানান যে সময় বৃদ্ধির জন্য তিনি কোনো  আবেদন করেননি। তাহলে কি তিনি শপথ নেবেন না ? অথবা পরে নেবেন? মির্জা ফখরুলের উত্তর ছিল, সময় হলেই আপনারা সব জানতে পারবেন।  পরদিন অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল এক আলোচনা সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল সাফ জানিয়ে দেন যে, তিনি শপথ গ্রহণ করবেন না। এটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। তখন জানতে চাওয়া হয় যে, ৪ জন শপথ নিলেন, সেটিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পারমিশন দিলেন, আবার একই নেতৃত্ব তাকে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত রাখলেন। তাহলে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত কেন ? জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন যে, ঐ ৪ জনের শপথ গ্রহণের সম্মতি দেওয়াটা যেমন একটি দলীয় কৌশল, তেমনি তার শপথ গ্রহণে বিরত থাকাটাও একটি দলীয় কৌশল। তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, তাহলে ঠাকুর গাঁয়ের জাহিদুর রহমানকে বহিষ্কার করা হলো কেন? তার বহিষ্কারাদেশ কি প্রত্যাহার করা হবে? এব্যাপারে মির্জা ফখরুল বলেন যে সময় হলে দেশবাসী সেটিও জানতে পারবেন।
॥দুই॥
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের ৮ জন এমপি ডেজিগনেটের ব্যাপারে ৪ রকমের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুলতান মনসুর এবং জাহিদুর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, মোকাব্বির খানকে বহিষ্কার নয়, শো’কজ করা হয়েছে। তৃতীয়ত, বিএনপির ৪ জনকে শপথ গ্রহণে সম্মতি দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে শপথ গ্রহণে বিরত রাখা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের ৮ জন সদস্যকে ঘিরে ৪ ধরণের সিদ্ধান্তে গণফোরাম, বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট কিভাবে লাভবান হলো সেটি এখন পর্যন্ত  ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের নেতা, কর্মী এবং সমর্থকদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না।
অধিকাংশ মিডিয়াতে এই মর্মে জল্পনা কল্পনা করা হয় যে, এক্ষেত্রে পর্দার অন্তরালে বিএনপির সাথে সরকারের একটি ডিল হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ডিলের কোনো আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। বরং যে সব ঘটনা এর পর ঘটে গেছে তাতে মনে হচ্ছে যে, মিডিয়ার জল্পনা কল্পনার সাথে বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিষয়াবলীর কোনো মিল নাই।
বলা হচ্ছিলো যে, একটি প্যাকেজ ডিল হয়েছে, যে ডিলের মাধ্যমে বিএনপির ৬ জন সদস্য শপথ গ্রহণ করবেন, বিনিময়ে বেগম খালেদা জিয়াকে জেল থেকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি বিদেশে বিশেষ করে লন্ডনে যাবেন। কিন্তু বেগম জিয়া স্বয়ং  প্যারোলে বিদেশে যেতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন। তিনি এবং বিএনপির নেতারা মনে করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতির আকাশে যে উচ্চতায় উঠেছেন সেখান থেকে প্যারোলে গেলে তার ইমেজ এবং জনপ্রিয়তার দ্রুত পতন ঘটবে। তাই বেগম জিয়া স্বয়ং যেমন প্যারোল চাননি তেমনি বিএনরি নেতারাও বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তি চাননি।
॥তিন॥
বেগম জিয়া নিজেই প্যারোল অস্বীকার করার পর সংবাদপত্রে এই মর্মে রটনা হয় যে, ৫ জন সদস্যের যোগদানের বিনিময়ে বেগম জিয়াকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু এটির কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং যেদিন বিএনপির ঐ ৪ জন সদস্য শপথ গ্রহণ করেন সেদিনই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি হাইকোর্টে আপিল করে। আপিলের জন্য মামলাটি গৃহীত হয়। আপিলের শুনানিকালে হাইকোর্টের মাননীয় সংশ্লিষ্ট বিচারপতি পরবর্তী শুনানি দুই মাস পরে হবে বলে জানান। এই দুই মাস সময় দেওয়া হয় নিম্ন আদালত থেকে নথি হাইকোর্টে প্রেরণ করার জন্য। আপিলটি গ্রহণের সময় হাইকোর্ট বলেন যে, আরও একটি মামলায় তিনি দন্ডিত হয়ে কারারুদ্ধ রয়েছেন। তাই এই মামলায় জামিন পেলেও তো তিনি বের হতে পারছেন না। হাইকোর্টের এই সর্বশেষ সিদ্ধান্ত থেকে দুটি বিষয় বেরিয়ে আসে। প্রথমটি হলো, আগামী দুই মাসের আগে বেগম জিয়ার জেলখানা থেকে জামিনে বেরিয়ে আসার কোনই সম্ভাবনা নাই। দ্বিতীয়ত জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেও জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তিনি যে ১০ বছরের জন্য কারাদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসবেন কিভাবে? হাইকোর্টের এই দন্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি সুপ্রীম কোর্টে আপিল করেছে। সুপ্রীম কোর্টে আপিলের কবে শুনানি হবে এখনও তার কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি। সুপ্রীম কোর্ট জামিন দেবে কিনা সেব্যাপারেও কোনো নিশ্চয়তা নাই। এছাড়া বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয় যে, নিম্ন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত সব কিছ্ইু সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং নিম্ন আদালত বলুন, আর উচ্চ আদালত বলুন, সরকার যদি সদিচ্ছা পোষণ না করে তাহলে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে  বেগম জিয়ার কারামুক্তি আগামী ১৭ বছরেও সম্ভব নয়। আর সরকারের সেই সদিচ্ছা তখনই হতে পারে যখন নেপথ্যে সরকারের সাথে বিরোধী দলের একটি ডিল বা গোপন চুক্তি হয়। এ ধরনের চুক্তি সাধারণত মৌখিক চুক্তি হয়।
আলোচ্য ক্ষেত্রে সরকারের সাথে বিএনপির কোনো গোপন মৌখিক ডিল হয়েছে কিনা, সেটি বোঝা যাচ্ছে না। আর বিএনপির সব মহল যেমন এই ধরনের কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করছেন তেমনি সরকারও বিএনপির সাথে এই ধরনের কোনো সমঝোতার কথা অস্বীকার করছেন।
তাই যদি হয়, তাহলে বিএনপির ঐ ৫ জন সদস্য কেনই বা শপথ গ্রহণের জন্য ধনুর্ভঙ্গপণ করেছিলেন, অথবা বিএনপি হাইকমান্ড তাদের জেদের কাছে নতি স্বীকার করলেন সেটি বেশ কিছুদিন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার কাছে হেঁয়ালি হয়ে থাকবে। তবে এধরণের হেঁয়ালি বিএনপি বা তার মিত্রদের নেতা ও কর্মীদের কাছে ভাল কোনো বার্তা দেয় না।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ