ঢাকা, রোববার 5 May 2019, ২২ বৈশাখ ১৪২৬, ২৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খুলনা আধুনিক রেল স্টেশনে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা নেই

আব্দুর রাজ্জাক রানা : খুলনার আধুনিক রেল স্টেশনে নেই কাঙ্ক্ষিত যাত্রী সেবা। ওয়েটিং রুম, টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন স্থানে জনবল সংকটের কারণে যাত্রীদের কাক্সিক্ষত সেবা দিতে পারছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তবে জনবল নিয়োগ দেয়া হলে এই সমস্যা আর থাকবে না। নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা বসানোর কথা থাকলেও তা নেই। এছাড়া রয়েছে খাবার পানির সংকটও। অন্যদিকে রেল স্টেশনের প্লাটফর্ম নিচু থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ রয়েছে আগের মতোই। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান চান যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৮ সালের ৩ মার্চ সার্কিট হাউজের জনসভায় খুলনা আধুনিক রেল স্টেশনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ২৫ নবেম্বর নব-নির্মিত এই স্টেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ট্রেন। এদিন সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ‘চিত্রা এক্সপ্রেস’। এরপর থেকেই নতুন এই স্টেশন থেকে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। আধুনিক রেল স্টেশন নির্মাণ হওয়ায় খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের সেবার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়। নতুন ভবন, ৬টি টিকিট কাউন্টার, তিনটি বিশ্রামাগার, রেস্টুরেন্ট, কিচেন রুম, ব্যাংক বুথ, নতুন প্লাটফর্ম, পার্কিং সুবিধা, স্টেশন মাস্টারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের পৃথক কক্ষসহ নানা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তবে, যাত্রীদের সেই সুযোগের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে যাত্রীরা কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে জনবল সংকটের কারণে যাত্রীদের কাক্সিক্ষত শতভাগ সেবা দিতে পারছে না বলে স্বীকার করেছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারাও।
স্টেশনে আসা কমার্স কলেজের ছাত্র আরিফুর রহমান সেতু নামের এক যাত্রী বলেন, স্টেশনটি অনেক সুন্দর। আধুনিক স্টেশন পাওয়ায় আমরা আনন্দিত। তবে স্টেশনের বিশ্রামাগার সকালে অনেক সময় বন্ধ থাকে। ফলে এখানে আসার পর লাগেজ, ব্যাগসহ পরিবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এর আগেও একদিন এমন সমস্যায় পড়েছি। একই সাথে ওয়েটিং রুমের বাথরুমগুলো থেকেও দুর্গন্ধ ছড়ায়। প্লাটফর্মটা আরো উঁচু হলে যাত্রীদের উঠা-নামায় ভালো হতো। তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান হলে যাত্রীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাবে।
মাদারীপুর থেকে আসা আমেনা সুলতানা নিশি নামের আরেক যাত্রী বলেন, এখানে টিকিট কাউন্টার রয়েছে ৬টি। কিন্তু সন্ধ্যায় চালু মাত্র ২টি। মহিলা কাউন্টার থাকলেও সেখানে কেউ নেই। বন্ধ রয়েছে কাউন্টারটি। ফলে পুরাতন রেল স্টেশনের মতোই পুরুষ কাউন্টারে যেয়ে টিকিট কাটতে হয়েছে। মহিলাদের পৃথক কাউন্টার থাকলেও বন্ধ থাকায় মহিলা যাত্রীদের সমস্যা হচ্ছে। একইসাথে সবগুলো কাউন্টার চালু থাকলে যাত্রীদের টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। দ্রুত টিকিট সংগ্রহ করতে পারতো। এমনই অভিযোগ অন্যান্য যাত্রীদেরও। যাত্রীরা বলেন, দীর্ঘদিন পর আধুনিক রেল স্টেশন হয়েছে এতে খুলনাবাসী আনন্দিত ও উচ্ছ্বাসিত। তবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার এই স্টেশনের প্লাটফর্ম পূর্বের ন্যায় দুর্ভোগ থেকেই যাচ্ছে। আধুনিক রেল স্টেশনে স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে ট্রেনের বগির সিঁড়ির উচ্চতা বেশি। যে কারণে মালামাল এবং বয়স্ক ও রোগীদের ওঠা-নামায় সমস্যা হচ্ছে। ফলে পুরাতন স্টেশনের দুর্ভোগ এখানেও পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া প্লাটফর্মের ফ্লোরটি সমান করা হলেও আরো ভালো হতো। এতে ট্রলি টানতে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়। দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
যাত্রীসেবার বিষয়ে রেল স্টেশনের মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার জানান, আধুনিক রেল স্টেশন হওয়ায় যাত্রীরা খুবই আনন্দিত। তবে নতুন স্টেশনে আসার পর জনবল সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত যাত্রীসেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই কারণে ৬টি কাউন্টারের পরিবর্তে ৩টি কাউন্টার খোলা রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি কাউন্টার ভারতের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বন্ধন এক্সপ্রেসের। বতর্মানে ৭ জন থাকলেও ৬টি কাউন্টার চালু রাখতে আরো ৬ জনের প্রয়োজন। আর ওয়েটিং রুমের জনবল মাত্র ২ জন। এতে আরো ২ জন প্রয়োজন। ফলে সকালে মাঝে মধ্যে দেরিতে ওয়েটিং রুম খোলা হতে পারে। এছাড়া তিনি জানান, পুরাতন স্টেশনের জনবল অনুযায়ী ট্রাফিকে ৮২ জনের বিপরীতে ৭৬ জন আছে। ঘাটতি রয়েছে ৬জন। আর নতুন স্টেশন অনুযায়ী সবমিলিয়ে এখনও ১৪ জন লোক প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছেন।
এসব ব্যাপারে রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী বিরবল মন্ডল জানান, জনবল সংকটের জন্য কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে জনবল নিয়োগ হলে দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। আর খাবার পানির সমস্যা সমাধানে রবির সাথে চুক্তি হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদী। এর আগে গত ২৫ নবেম্বর নতুন স্টেশন থেকে প্রথম ট্রেন যাত্রা শুরুর সময় রেলের (পশ্চিমাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক মো. মজিবর রহমান ভবিষ্যতে প্লাটফর্ম উঁচু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
এ স্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায় বন্ধন নামের একটি এক্সপ্রেস। বন্ধন এক্সপ্রেস বা কলকাতা-খুলনা এক্সপ্রেস এটি একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন যাত্রীবাহী ট্রেন। যা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতা থেকে বাংলাদেশের খুলনা শহরের মধ্যে যাতায়াত করে। এটিই দ্বিতীয় ট্রেন যা এই দুই দেশের মধ্যে চলাচল করে। এটি চালু হয় ৫২ বৎসর পর। বন্ধন শব্দের অর্থ হল সংযোগ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ২০১৭ সালের ১৬ নবেম্বর এই ট্রেন সাভিসটি চালু করা হয়। ট্রেনের বগি ও ইঞ্জিন হিসেবে দুই দেশের মধ্যে উভয় দেশের বগি ও ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয় এর ফলে যাত্রীদের সীমান্তে ট্রেন পরিবর্তন করতে হয় না। ভারত থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি কলকাতা রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছাড়ে, এখানে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা হয়, যদিও ভারতীয় দূতাবাস থেকে আগে থেকেই ভিসা সংগ্রহ করতে হয়। বাংলাদেশের খুলনা স্টেশন থেকে কলকাতাগামী বন্ধন এক্সপ্রেস ছাড়ে। কলকাতা থেকে খুলনা পর্যন্ত পৌণে দুশ’ কিলোমিটার রেলপথ পাড়ে দিতে সময় লাগে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা।
সকাল সাড়ে সাতটায় কলকাতার চিৎপুর থেকে যাত্রী নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় বন্ধন পৌঁছায় খুলনায়। এরপর দুপুর দেড়টায় খুলনা থেকে যাত্রী নিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ফের কলকাতায় পৌছায়। ট্রেনটি কলকাতা থেকে দমদম-বনগাঁ-পেট্রাপোল-বেনাপোল-ঝিকরগাছা-যশোর হয়ে খুলনা আসে ট্রেনটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সপ্তাহে বৃহস্পতিবার এক দিন করে এ ট্রেন সার্ভিস কলকাতা থেকে ছেড়ে আসে বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৭টায়, আর খুলনা স্টেশনে পৌঁছে দুপুর দেড়টায়। খুলনা থেকে আবার দুপুর ২টায় ছেড়ে যায় এবং কলকাতা স্টেশনে পৌঁছার কথা সন্ধ্যা ৭টায়। তবে বেশিরভাগ দিনই এক থেকে দেড় ঘণ্টা, কখনও কখনও তার চেয়ে বেশি সময় নেয় ট্রেন আসতে এবং ছেড়ে যেতে।
এ রুটে যাতায়াতকারীরা বলছেন, মূলত তিন কারণে খুলনা-কলকাতা ট্রেন সার্ভিস বন্ধন এক্সপ্রেসের যাত্রী না বেড়ে দিন দিন কমছে। ফলে লোকসান নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে এ সার্ভিসের। যাত্রীদের অভিযোগ, ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ খুলনা থেকে ছেড়ে কলকাতা স্টেশনে পৌঁছে রাত ৮টায় বা তারও পরে। খুলনা থেকে চিকিৎসা বা ভ্রমণেচ্ছু যাত্রীরা প্রাথমিকভাবে আবাসন সমস্যায় পড়েন। এ রুটের নিয়মিত যাত্রী আর রাফি নাজু বলেন, রাত ৮টায় কলকাতা পৌঁছানোর কারণে আবাসিক হোটেল পেতে বেগ পেতে হয়। অনেক চেষ্টা করে বেশি ভাড়া দিয়ে হোটেলে উঠতে হয়। তার মতো একই সমস্যায় পড়েন বন্ধন এক্সপ্রেসে আসা বেশিরভাগ যাত্রী। দিনের বেলা কলকাতায় না পৌঁছলে আবাসিক হোটেলগুলোয় সিট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু কলকাতায় পৌঁছায় রাতে। এ কারণে খুলনা থেকে কেউ ট্রেনে আসতে চান না।
যাত্রীরা বলেন, ট্রেনে যাত্রী না হওয়ার পেছনে অতিরিক্ত ভাড়াও একটি বড় ফ্যাক্টর। সব মিলিয়ে মাত্র ১৭০ কিলোমিটার দূরত্বের রেল যাত্রায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে এসি সিট ২ হাজার টাকা এবং এসি চেয়ার ১ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ খুলনা থেকে যশোর হয়ে গাড়িতে বেনাপোল পৌঁছতে একজনের ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা খরচ হয়। কেউ চাইলে তার চেয়ে আরও কমে যেতে পারেন। সেখানে কয়েকগুণ ভাড়া আদায় করার কারণেই এ রুটে যাত্রী পাওয়া যায় না। ভারতীয় পাসপোর্ট যাত্রী মনতোষ বসু বলেন, দুই দেশের মধ্যে বন্ধন ট্রেনটি নিয়ে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা না থাকায়, গুরুত্বপূর্ণ দু’টি স্টেশনে টিকিট বিক্রি না করায় যাত্রীরা ট্রেন যাতায়াতে আগ্রহ হারাচ্ছে। অনলাইনের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি ও স্টপেজের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে ট্রেনে যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশি পাসপোর্ট যাত্রী এইচ এম আলাউদ্দিন বলেন, ভারতীয় কাস্টমসে যাত্রী হয়রানি বন্ধসহ সম্প্রতি বাংলাদেশি পাসপোর্ট যাত্রীদের ভারতে গিয়ে কমপক্ষে দুই রাত অবস্থান বাধ্যতামূলক করায় এবং সপ্তাহে এই রুটে একদিন বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন চালু থাকায় ট্রেনে করে কেউ আর যাতায়াত করতে চায় না। যদি সপ্তাহে দুই/তিনদিন ট্রেন চলাচল ও ভাড়ার পরিমাণ কমালে যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বেনাপোল ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তা জানান, বন্ধন এক্সপ্রেসে যে সকল যাত্রী সরাসরি যাতায়াত করেন, আমরা সেই সকল যাত্রীকে ভালো সার্ভিস দিচ্ছি। আপাতত যাত্রীর সংখ্যা একটু কম আছে। যতদ্রুত সম্ভব আমরা ইমিগ্রেশনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করি বিধায় আমাদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের কোনো অভিযোগ নেই। খুলনা রেলের স্টেশন মাস্টার মানিক চন্দ্র সরকার বলেন, সপ্তাহে এক দিন ট্রেন ছাড়ার কারণে ট্রেন শিডিউলে একটা সমস্যা হয়েছে। কলকাতা গিয়ে অনেক সময় ভালো হোটেল পেতে সমস্যা হয়। এসব কারণে যাত্রী কম। এসব বিবেচনায় নিয়ে খুলনা কলকাতা ট্রেন সার্ভিকে লাভজনক করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ