ঢাকা, মঙ্গলবার 7 May 2019, ২৪ বৈশাখ ১৪২৬, ১ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দুর্নীতি জাকাত ও রমযানের তাকওয়া

ড. মো. নূরুল আমিন : আনিছুজ্জামান খান পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের একজন খ্যাতিমান সদস্য ছিলেন। নীতি ও নিয়মনিষ্ঠ দক্ষ একজন কর্মকর্তা হিসাবে তার যেমনি খ্যাতি ছিল তেমনি কঠোরতার জন্য অনেকে তাকে ভয়ও করতেন। তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। এরশাদ আমলের মাঝামাঝি সময়ে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। ঐ সময়ে দেশে খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর অধীনে সরকারের তরফ থেকে সেচাধীন জমির পরিমাণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং এলএলপি সরবরাহের বিরাট কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল।  ঠাকুরগাঁও গভীর নলকূপ প্রকল্পের পুনর্বাসন, গভীর নলকূপ-২ প্রকল্প, ভাড়া ভিত্তিক গভীর নলকূপ প্রকল্প, অগভীর নলকূপ ভিত্তিক পল্লী উন্নয়ন-২, ৭২৪ বিডি এবং ১১৪৭ বিডি প্রকল্প প্রভৃতি ছিল ঐ সময়ের উল্লেখযোগ্য সেচ প্রকল্প। শেষোক্ত তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে অন্যূন এক লক্ষ অগভীর নলকূপ খনন করে এক কোটি একর জমিতে পানি সেচের সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বোরো চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। এক লক্ষ অগভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য আমদানি করা হয়েছিল ৯০ লক্ষ ফুট স্টীলের পাইপ, ২০ লক্ষ ফুট স্ট্রেইনার এবং চীন,ভারত ও জাপান থেকে এক লক্ষ ইঞ্জিন। দেশের শীর্ষ স্থানীয় ২২টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে এই নলকূপগুলো খননের জন্য টার্নকি কন্ট্রাক্টার নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে অনেকেই দুর্নীতিপরায়ণ ছিলেন। তারা কম গভীরতায় নলকূপ স্থাপন করে বেশি গভীরতার বিল করে সরকারকে ফাঁকি দিয়েছেন বলে জানা যায়। আবার কেউ কেউ নলকূপ না বসিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে সাটিফিকেট আদায় করে বিল নিয়েছেন। যত দূর মনে পড়ে ১৯৮৭ সালের কথা। একদিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় জনাব আনিছুজ্জামান আসন্ন রোজার মাসে তার জাকাত পরিশোধ নিয়ে কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, অর্থ সংকটে জাকাতের টাকা যোগাড় করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কথা বলার পরই গল্প শুরু। পরবর্তী মাসের এডিপি রিভিউ মিটিং এর শুরুতেই জনাব জামান ঘটনাটি বলে ফেললেন। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী জেনারেল মুনিম এতে সভাপতিত্ব করছিলেন। তিনি জানালেন যে একদিন অফিসে এসে তিনি তার টেবিলের একটি দর্শনীয় স্থানে একটি খাম পেলেন। তিনি খামটি খুলে তাতে একটি চিরকুট ও নগদ ৩২০০০/- টাকা পেলেন। চিরকুটটিতে লেখা ছিল “স্যার সালাম নিবেন। বেশি কিছু করতে পারলাম না। আপনার জাকাতের টাকাটা দিয়ে দিলাম।” জনাব আনিছুজ্জামান ঘটনাটি বলে আমাদের অধঃপতিত সমাজ ও চরিত্রহীন কিছু সরকারি কর্মকর্তার দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে কিভাবে দুর্নীতি ছড়ানো হচ্ছে তার একটা চিত্র তুলে ধরেছিলেন। আমাদের দেশে খুব কম ব্যবসায়ী আছেন যারা ঘুষ বাণিজ্যের সাথে জড়িত নন এবং সৎ সরকারি কর্মকর্তাদের অসৎ বানাতে চাননা। সরকারি কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই সৎ, কিন্তু পরিবেশ তাদের অসৎ হতে বাধ্য করে। অনেকে আছেন এতই নীতিনিষ্ঠ যে শত প্ররোচনাও তাদের ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়াতে পারে না। জনাব আনিছুজ্জামান তার টেবিলে ঘুষের খাম আসার পেছনে টার্ন কি কন্ট্রাক্টরদের মধ্যে কেউ তার পিএস এবং এ.ওর সাথে যোগ সাজশ করে রেখে থাকবে বলে তার ধারণা ছিল, ঘটনাটি সবাই উপভোগ করেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তার এই ঘোষণার ফলে অন্যান্য স্থানে তো বটেই, সচিবালয়ে নথি চলাচল ও ক্ষেত্র বিশেষে অনুমোদনের রেইট দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা ছিল সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করলে সরকারি অফিসে দুর্নীতি কমবে। ধারণাটি যে সত্য নয় বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং ব্যাংক সহ অর্থ প্রতিষ্ঠান সমূহের কর্মচারীদের বেতন ভাতা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় যেখানে দুর্নীতি কমার কথা সেখানে দুর্নীতি বেড়েছে অপ্রতিহত গতিতে। ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির এতই অবনতি ঘটেছে যে এর ফলে সরকারি বেসরকারি খাতের আমাদের সকল ব্যাংকগুলোই ধ্বংসপ্রায়। রাস্তাঘাটে পুলিশের হয়রানি ও উৎকোচ গ্রহণ বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেই শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত নয়, এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য সরকার অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করছে। দুর্নীতি দমনের জন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। তার সাথে প্রয়োজন দুনিয়া ও আখেরাতের জবাবদিহিতা। তা না হলে দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টা জবাবদিহিতা। তা না হলে দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টা নতুন দুর্নীতির সৃষ্টি করবে, পুরাতন দুর্নীতির শিকড় আরো মজবুত হবে।
আরেক আমলা ড. আকবর আলী খান দুর্নীতি প্রসঙ্গে কিছু মজার তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। বাংলাদেশ কখনো দুর্নীতিমুক্ত ছিল একথা তিনি স্বীকার করেন না। তার মতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মত বাংলাদেশেও ব্যাপক দুর্নীতি ছিল এবং আছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে দুর্নীতির জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম লিখেছেন:
“সরকার হইলা কাল খিল ভূমি লিখে নাল বিনা উপক রে খায় ধুতি”
অর্থাৎ রাজস্ব কর্মকর্তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা অনাবাদি জমিকে (খিল) কর্ষিত জমি (নাল) গণ্য করে অতিরিক্ত খাজনা নিচ্ছে। ধুতি ঘুষ নিয়েও সঠিকভাবে কাজ করছে না। বাংলা লোকসাহিত্যেও এ ধরনের দুর্নীতির উল্লেখ রয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সকল সমাজেই দুর্নীতি আছে এবং এটি একটি পুরাতন ও জটিল রোগ হওয়া সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা তাদের তত্ত্বে দুর্নীতির ক্ষতিকর দিকগুলোকে সর্বদা উপেক্ষা করে এসেছেন। এর কারণ দু’টি। একটি ঐতিহাসিক অন্যটি তাত্বিক।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে দুর্নীতির সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক উন্নয়নের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এটা সত্য যে পুঁজিবাদের শতদল দুর্নীতির পক্ষেই বিকশিত হয়েছে। একচেটিয়া ব্যবসায়ের লাইসেন্স এবং কর ইজারার মত সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে ইউরোপের পুঁজিপতিদের জীবনযাত্রা শুরু হয়েছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মত প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া আফ্রিকা লুণ্ঠন করে যে অর্থ যুগিয়েছিল তা দিয়েই ইংল্যান্ডের মত দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটেছিল। উনবিংশ শতাব্দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ের ব্যাপক দুর্নীতি বিশ^ বিশ্রুত ছিল। লুন্ঠন থেকে প্রাথমিক পুঁজি সংগ্রহ করে যারা বড়লোক হয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তারাই দস্যু কুবের (ৎড়ননবৎ নধৎড়হ) নামে পরিচিত ছিলেন। একটি চীনা প্রবাদ আছে, যারা বড় মাপের ডাকাত তারাই ব্যাংক স্থাপন করে। অবশ্য সাম্প্রতিক গবেষণা সমূহে দুর্নীতির চার ধরনের কুফল ধরা পড়েছে এবং এর প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমনকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। প্রথমত: দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘিœত হয়। দুর্নীতির ফলে সরকার এক দিকে সম্পদ সংগ্রহে ব্যর্থ হয় অন্যদিকে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দেয়। ফলে আয় ব্যয়ে অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়, বাজেটে ঘাটতি দেখা দেয় এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত: দুর্নীতি-প্রবণ সমাজে পরিবেশের দ্রুত অবক্ষয় ঘটে। দুর্নীতির কারণে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন কানুন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় না। দুর্নীতি ইনসাফের পরিপন্থী। এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকটতর হয়, ধনী আরো ধনী এবং গরীব আরো গরীব হয়। দুর্নীতি বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে, নেহায়েৎ নিরুপায় না হলে কোন বিদেশীই ঘুষ দিয়ে বিনিয়োগ করতে চান না।
পত্র-পত্রিকায় একটি খবর দেখলাম। সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে একজন বক্তা বলেছেন যে বাংলাদেশে বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার জাকাত আদায় করা সম্ভব। যে হারে দেশে ধনী, অতিধনী ও জাকাত পরিশোধের উপযুক্ত লোকের সংখ্যা বেড়েছে তাতে আমার হিসাব অনুযায়ী ৩০ হাজার নয় অন্তত: ৭০ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জাকাত শাখা এর বিপরীতে প্রতি বছর আদায় করে মাত্র কয়েক কোটি টাকা। সরকারের প্রতি আস্থা না থাকার কারণেই মানুষ সরকারের জাকাত তহবিলে জাকাত দিতে চায় না। অনেকে মনে করেন সরকারের মন্ত্রী-কর্মকর্তারাই নিজেরা এই অর্থ খেয়ে ফেলেন, শরিয়া অনুযায়ী যে আটটি নির্দিষ্ট খাতে জাকাতের অর্থ ব্যয় হবার কথা সেখানে ব্যয় হয় না। অভিযোগটি অমূলক নয়। মানুষের আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাকাত আদায় ও ব্যয় হওয়া প্রয়োজন।
আজ থেকে পবিত্র রমজান শুরু হয়েছে। এই এক মাসের সিয়াম সাধনা প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে তাক্বওয়ার সৃষ্টি করবে, তাদের ঈমান মজবুত হবে। তারা মিথ্যা পরিহার করে সত্যকে গ্রহণ করবে এবং সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করবে এটাই আমাদের কামনা। মানুষের মধ্যে যদি আল্লাহর ভয়, আখরাতের জবাবদিহিতার অনুভুতি শক্তিশালী হয় তাহলে সে কারুর উপর জুলুম করতে পারে না, দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না। একটি মুসলিম দেশের সরকার হিসেবে এই রমজান মাসে তাক্বওয়া অর্জনের লক্ষ্যে ব্রতি হবার জন্য সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ