ঢাকা, মঙ্গলবার 7 May 2019, ২৪ বৈশাখ ১৪২৬, ১ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নিয়ম এখন অনিয়মে পরিণত হয়েছে

এইচ এম আব্দুর রহিম : পবিত্র রমযান, ঈদ, পূজা-পার্বন আসার বহু আগেই আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দিয়ে জনজীনে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করে থাকেন। পবিত্র রমযানকে সামনে রেখে প্রতি বছর অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের আর্বিভাব ঘটে। এসব ব্যবসায়ী চিনি, ছোলা, ডাল, পিঁয়াজ, আদা, রসুন, চাল, সয়াবিন খেজুর, পাঞ্জাবী, শাড়ি ইত্যাদি পণ্যের পণ্য সাজিয়ে থাকেন। অনেকে আবার ডিও ব্যবসার মতো পণ্যদ্রব্যের আমদানি ও বাজারজাত করে থাকেন।
কথিত আছে এসব ব্যবসায়ী বলে থাকেন রমযানের একমাস ব্যবসা করব, সারা বছর আরামে কাটাব। পবিত্র রমযান মাস মুসলিম বিশ্বের জন্য নিয়ামত বা দান। এটি সংযম ও নাজাতের মাস, পাপমুক্তির মাস হলেও এসব মৌসুমি ব্যবসায়ী নামধারী মূল্য-সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যের কারণে জনজীবন হয়ে ওঠে অসহনীয় ও যন্ত্রণাদায়ক।
পবিত্র রমযান উপলক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রমযানের ব্যবহার্য সব পণ্য এবং পবিত্র বড় দিন উপলক্ষে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে পণ্য বাজারে বিশাল মূল্যহ্রাস প্রথা চালু আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তীদেশ ভারতেও পূজোর সময় মূল্যহ্রাসসহ নানা প্রথা চলমান আছে। কিন্তু আমাদের দেশে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো।
 রমযান, ঈদ, পূজা এলেই আমাদের দেশের খুচরা থেকে মাঝারি বড় বড় ব্যবসায়ীরা সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটার উৎসবে মেতে উঠেন ‘শুভ মূল্য বৃদ্ধি’ এ স্লোগান দিয়ে। ফলে জনগণের নাভিশ্বাস ওঠে।
 রমযান মাস নাজাতের মাস হলেও এখন আতঙ্কের মাসে পরিণত হতে যাচ্ছে। পবিত্র ইসলামে অতিরিক্ত মূল্য আদায়কে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিস শরীফে বলা হয়েছে ‘ব্যবসায়ীরা যদি সীমাতিরিক্ত মূল্য আদায় করে এ সুযোগে যে, ক্রেতা পণ্যের মূল্য জানে না; তাহলে অতিরিক্ত পরিমাণের মূল্য সুদ পর্যায়ের গণ্য হবে।’ আবার মজুদদারী সম্পর্কে হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন, ‘মজুদ খুব নিককৃষ্টতম । যদি জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায়, তবে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে, আর দাম বেড়ে গেলে আনন্দিত হয়।’ (মেশকাত)।
রহমত বরকত ও মাগফিরাতের অমীয় বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে হাজির হতে যাচ্ছে মাহে রমযান। কিন্তু মুনাফাখোর ব্যবসায়ীরা রমযানের আগেই পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। রমযান মাসে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের নানা রকম অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু বরাবর দেখা গেছে, কোনো বিশেষ উপলক্ষে বাজারের নাটাই থাকে অশুভ চক্রের হাতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি থাকে বটেই, অসাধু ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও তারা আমলে নেয় না।
তাই বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অসুস্থ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিছু মধ্যস্বত্বভোগী, আগাছা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীর আর্বিভাব ঘটেছে। আর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ভোক্তা সংগঠনগুলোর ব্যবধান এত বেশী হয়ে গেছে এবং তাদের ক্ষমতা এত বেশী যে, ফলে তাদের হাতে সাধারণ মানুষ নয়, সরকারি প্রশাসন যন্ত্র ও অসহায় হয়ে পড়ে। সে কারণে পবিত্র রমযান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সহনীয় পর্যায় রাখার জন্য সরকার প্রধান থেকে শুরু করে সব মহল ব্যবসায়ীদের বার বার অনুরোধ করার পরও তাদের সেই প্রতিশ্রুতি কাজে আসে না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে পুরো দেশ বর্তমানে অন্য দেশের বাজারে পরিণত হয়েছে। পাউরুটি, বিস্কুট, পরাটা, থেকে শুরু করে আমদানি করা হয় না এমন দেশের পণ্যের তালিকা হয়ত দেশে নেই। মাছ ও আমদানির তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখর করে আছে। সরকারের কিছু কর্তা তারা নিজেদের আখের গোছাতে আমদানিকৃত পণ্যে শুল্কহ্রাস ও ভর্তুকি প্রথা চালু করে দেশীয় উৎপাদক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রায় পথে বসিয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে প্রচলিত জেলা প্রশাসন, ডিএমপি, র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার অভিযান পরিচালিত হলেও এর সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। উল্টো বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। ঢাকার কাঁচা বাজারের তথ্যানুসন্ধ্যান করে জানা গেছে, সব ধরনের সবজির দাম আকাশছোঁয়া। সবজির কেজি ছুঁয়েছে ১০০ টাকা। বাকীগুলো বেশীর ভাগ কেজি ৭০-৮০ টাকা। গত দু মাসে সব চাইতে দাম বেড়েছে ব্রয়লার মুরগীর। দুই মাস আগে দাম ছিল ব্রয়লার মুরগীর ১২০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা। এখন তা ১৬৫-১৭৫ টাকায়। বেড়েছে অন্যান্য মুরগীর দামও। গত এক মাসে গরুর গোশের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। আর খাসির মাংশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭২০ থেকে ৮০০ টাকায়। সব ধরনের মাছ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। বেড়েছে খোলা বোতলজাত সোয়াবিনের দামও। গত দুই মাস ধরে এ ধারা অব্যাহত থাকলেও গত দুই সপ্তাহে বেড়েছে সবচেয়ে বেশী। এ মূল্য বৃদ্ধির জন্য পাইকাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের এবং খুচরা বিক্রেতারা পাইকারদের দায়ী করছেন।
৩ এপ্রিল জাতীয় দৈনিকের শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  রমযানের আগেই বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। রমযানের কারসাজির শঙ্কা রয়েছে পিঁয়াজ নিয়ে। সরবরাহ পরিস্থিতি ভাল থাকায় রমযানের প্রয়োজনীয় পণ্য মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা। এটা সত্য যে, দেশের মানুষের আয় বাড়ছে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে আয়ের তুলনায় কয়েকগুণ। তাও তো অসত্য নয়। মানুষের সঞ্চিত অর্থে হাত পড়েছে এবং আয় বাড়া সত্ত্বেও সমাজে এ জন্য ইতিবাচক প্রভাব যেভাবে পরিলক্ষিত হওয়ার কথা সেভাবে হচ্ছে না। মূল্য বৃদ্ধির কারণে ১৬ কোটির মধ্যে ১২ কোটি মানুষকেই অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ জনসংখ্যা ভোগান্তিতে পড়তে হয় এ কথা জানা গিয়েছিল গত বছর বাংলাদেশ কনজুমারস এসোসিয়েশনের (ক্যাব) প্রতিবেদনে। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের চড়া মূল্যে বাড়তি আয় খেয়ে ফেলছে। সর্বাধিক বিরুপ প্রভাব পড়ছে অতি দরিদ্র দুই কোটি মানুষের ওপর।
 ভোক্তাদের সঙ্গে আর একটি অধিকার লংঘন হচ্ছে, তা হল-  ভোক্তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্বের অধিকার হরণ। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত যে কোন নীতি নির্ধারণীমূলক ক্ষেত্রে ভোক্তাদের অসম অংশগ্রহণ থাকে নামেমাত্র। যেমন আঞ্চলিক সড়ক পরিবহন কমিটিতে বাসভাড়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সে কারণে যাত্রীদের প্রকৃত সমস্যা উদঘাটনের পরিবর্তে এখানে বাস মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়। ঠিক একইভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ, মূল্য নির্ধারণে বিষয়ক যে কোন সভায় শুধু ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সেক্টরের সরকারি কর্মকর্তারা অংশ নিয়ে থাকেন। এখানে ভোক্তাদের অংশ গ্রহণ নেই। এসব নীতি নির্ধারণী সভায় শুধু ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব থাকার কারণে সাধারণ ভোক্তা বা জনগণের তাদের সমস্যা ও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরতে পারেন না। এখন প্রয়োজন সরকারের একচেটিয়া ব্যবসায়ী তোষণনীতি পরিহার করে ভোক্তাদের সত্যিকার অর্থে ক্ষমতায়ন। ক্রেতা-ভোক্তা হিসেবে নিজেদের ইচ্ছামত, আসল নকল পরখ করে পণ্য ক্রয়ের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভোক্তা হিসেবে তাদের সচেনতার ও পণ্যের মান সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করা গেলে এ ভোগান্তির মাত্রা অনেকাংশে লাঘব হবে। কাজেই বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবসায়ী ভোক্তাদের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে ভোক্তা সংগঠনগুলোর প্রতি সরকারী বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ান জরুরী।
 সরকার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতো ভোক্তা সংগঠন, বিশেষ করে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) -এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও শাখাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে পারে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয় রক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো। তবে বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ী নির্ভরতা এবং আসন্ন রমযান মাস সামনে রেখে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মজুদদারী বৃদ্ধির কারণেই বেশীরভাগই পণ্যের দাম বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। কারণ এখানে ভোক্তাদের পছন্দ অপছন্দের সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাংক ও বহুজাতিক দাতা সংস্থাগুলো যেভাবে বাংলাদেশের পাট শিল্প বন্ধ করতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে, পক্ষান্তরে ভারতে পাটশিল্প বিকাশে অর্থ বিনিয়োগ করেছে; একইভাবে বহুজাতিক শক্তিগুলো ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করলে ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, ক্ষমতায়ন ও তাদের সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য কোনো অর্থ বিনিয়োগ করছে না। ফলে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও শিক্ষার অভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতা-ভোক্তা তাদের অধিকার, দায়িত্ব-কর্তব্য সর্ম্পকে সচেতন নয় অধিকন্তু অধিকাংশ ভোক্তা আসল-নকল চিহ্নিত করে সঠিক পণ্য পছন্দ করার যোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। সরকার ও বিভিন্ন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ে সুস্থ ধারার বিকাশ সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে এখানে ফটকাবাজ, মৌসুমি ব্যবসায়ী, অসৎ ধান্ধাবাজ ব্যবসায়ীর আবির্ভাব ঘটেছে ব্যাপকহারে। ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা ও শিক্ষা প্রদান করতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ভিতরকার ব্যবধান হ্রাস করতে পারে। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, সেবা সার্ভিসসহ ব্যবসা বাণিজ্য ও ভোক্তা সাধারণ সংরক্ষণ বিষয়ে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। তাহলে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া আধিপত্য ও প্রভাব খর্ব হবে। তখন জনগণ আর মূল্য-সন্ত্রাসীর দ্বারা সর্বস্বান্ত হবে না। মনে রাখতে হবে জনগণ তথা সাধারণ ভোক্তা মূল চালিকা শক্তি। সাধারণ জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের মূল্য ইচ্ছামত বাড়ায়, কমায়, সরবরাহ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে জনগণকে জিম্মী করে কোটি কোটি টাকা নিজেদের পকেটস্থ করেন। এ কারণে রিকশা, সিএনজি, বাড়িভাড়া, বাসভাড়া থেকে আরম্ভ করে নগরীর সেলুন, ফটোস্টাট, বিস্কুট, পাউরুটি, কাঁচা বাজার, ফলমূলের ব্যবসায়ী, ফার্মেসিসহ সবাই তাদের পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারণ করছে; সেখানে সমন্বয় তো দূরের কথা। সরকার সংশ্লিষ্ট লোক-এর খবর রাখছে না। উপরন্তু পবিত্র রমযান মাস এলেই তাদের কর্মকা- বৈধতা দেয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট লোকজন এসব খবর রাখছে না। উপরন্তু রমযান মাস এলেই এদের কাজের বৈধতা দেয়া, সরকারের ভর্তুকি লাভের আশায় ও কর ফাঁকির কুমতলবে এসব ব্যবসায়ী সুদৃশ্য মোড়কে ন্যায্যমূলের দোকান খুলে সাধারণ জনসাধারণের সাথে ছলচাতুরি করছে। কিন্তু পাইকারী ও খুচরা বাজারের মধ্যে সমন্বয় থাকলে, মজুদদারী ও একচেটিয়া আমদানির দৌরাত্ম্য কমাতে পারলে দ্রব্য মূল্য অনেকাংশে কমে যেত। পবিত্র রমযান, ঈদ, পূজা  সামনে রেখে একশ্রেণীর মজুদদারী, সিন্টিকেট চক্র প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনের নাকের ডগায় তাদের বৃদ্ধাঙ্গলি প্রদর্শন করে চিনি, ছোলা, পিঁয়াজ গম, মসলা ও সয়াবিন সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব মজুদদারী অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্টিকেটকারীদের সঙ্গে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু লোকের আঁতাতের কারণে জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মূল্য-সন্ত্রাসী, মুনাফাখোর, মজুতদারী সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেমূল্যের ও ঊর্ধ্বগতি, নকল ভেজাল ও মানহীন পণ্যের দৌরাত্ম্যের কারণে আজ নাগরিক জীবন অতিষ্ঠ; মানুষের জীবন-জীবিকার অধিকার মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। এক শ্রেণীর নীতি-আদর্শহীন, অতি মুনাফালোভী, অসাধু ব্যবসায়ীদের অল্পদিনে কোটিপতি হওয়ার বাসনায় ইচ্ছামতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করে ও দাম বাড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা প্রায় অচল করে দিয়েছে; যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ালেও ওই পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার কমলেও তারা আর কমায় না। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল গুটিকয়েক অসৎ ব্যবসায়ীর স্বার্থ সংরক্ষণে যাবতীয় রীতিনীতি প্রণয়ন করে।
তাই এখন প্রয়োজন অবিলম্বে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণের আমদানি নির্ভরশীলতা হ্রাস করে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। এতে দেশের সমৃিদ্ধ ও জাতি উপকৃত হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরি, দেশে ন্যায্য ব্যবসা প্রসার ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ ধারা প্রবর্তনের স্বার্থে ব্যবসায়ী সংগঠন, বিশেষ করে ফেডারেশন অফ চেন্বারস অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজসহ বিভিন্ন চেন্বারে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি, তাদের সশ¯্র সংগঠনগুলোর দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি অনুদান, ছাড়াও সরকার জি এস পি সুবিধা, কর রেয়াত, বিভিন্ন প্রণোদনা, ভর্তুকিসহ নানা ধরনের নগদ সহায়তা প্রদান করে থাকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিগত অর্থ বছরে এফবিসিসিআই ও অন্যন্য চেন্বারগুলোকে বিপুল পরিমাণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো থেকে বিশেষ অনুদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। অন্য দিকে বাংলাদেশের ভোক্তা আন্দোলন শুধু স্থানীয় জনগণের দান, অনুদান, মুষ্টিমেয় বেসরকারি সংস্থার সহায়তা পরিচালিত হচ্ছে। এটি অনেকটা স্থানীয় জনগণের চাহিদার কারণে চ্যারিটি আকারের জনকল্যাণে পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের জানামতে, ভোক্তা সংগঠনগুলো সমগ্র জেলা ও উপজেলা, মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে পৌরসভার শাখা কমিটি গঠন করে ভোক্তাদের সংগটিত ও ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। এ জন্য সদ¯্র সদস্যাদের চাঁদা, স্থানীয় জনগণের অনুদান, সদস্যদের স্বেচ্ছাশ্রম নিয়েই যাবতীয় কর্মযজ্ঞগুলো সম্পন্ন করতে হয়। আর্থিক সংকট, দক্ষ জনবল, লজিষ্টিক ও অন্যন্য সুবিধাদির অভাবে ভোক্তা সংগঠনগুলো জনগণের বিপুল চাহিদা মিটাতে পুরোপুরি সক্ষম হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠন ও ভোক্তা সংগঠনগুলোর মাঝে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে বিশাল আকারের পার্থক্য রয়ে গেছে যেটি বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যে সুস্থ ধারার বিকাশে বড় প্রতিবন্ধক। উন্নত বিশ্বে ভোক্তারা পণ্যের নিয়ামক হলে ও বাংলাদেশে তার পরিস্থিতি উল্টো। এখানে খুচরা ও পাইকারী ব্যবসায়ীরাই পণ্যের মূল নিয়ামক। তারা যা বাজারজাত করবে, ভোক্তারা তাই হজম করতে বাধ্য। লক্ষ্যণীয়, নিত্যপণ্যের বাজার মনিটরিংসহ বাজার দর সহনশীল রাখতে সরকার কে যে সব উদ্যোগ নিতে দেখা যায়, তার সব কটি ব্যবসা নির্ভর। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রী পবিত্র রমযানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার মনিটরিংসহ বাজারদর সহনশীল রাখতে সরকার কে যে সব উদ্যোগ নিতে দেখা যায়, তার সব কটি ব্যবসা নির্ভর। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী যে সব বৈঠক করলেন। বেঠকে যারা আমন্ত্রিত হলেন,তারা সবাই ব্যবসায়ী ও কয়েকজর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। স্বাভাবিক কারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থহানি হয়,এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত তারা নেবেন না। সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ সেবা সার্বিসসহ সবখাতে ব্যবসায়ীদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা। বাজার মনিটরিং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস স্থিতিশীলতা রাখার প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বিস্তার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার মনিটরিংসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রশাসনিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার সংস্কৃতি চলমান রয়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য স্থিতিশীল রাখার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে টিসিবিকে অকার্যকর করতে ব্যবসায়ীদের নানামুখী চাপ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া খোলা বাজারে চাল বিক্রি ও এম এস ফেয়ার প্রাইম ইত্যাদি অকার্যকর করা,নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়লেই ব্যাংকের সুদ বেশী, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অজুহাত তুলে জনগণকে বোকা বানান চেষ্টা করে থাকেন ব্যবসায়ীরা। আবার ব্যবসায়ী চেম্বারগুলোকে সরকার ও বহুজাতিক সরকারগুলো পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ও তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির অনেক উদ্যোগ নিলেও ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা তৈরি ও তাদের সংগঠনগুলোর প্রতি অবহেলার কারণে দেশে ব্যবসার সুষ্ঠু পরিবেশ ও সংস্কৃতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বল্প দিনে কোটিপতি হওয়ার বাসনায় অনেক লোক অনৈতিক কাজে ঝুঁকছেন। তাদের সেই অপবাসনার স্বীকার হচ্ছে সাধারণ ভোক্তারা; যার পরিনতিতে পবিত্র রমযান, ঈদ ও পূজা পার্বণে বাজার থেকে চিনি, ছোলা, সয়াবিন, পিঁয়াজ উধাও হয়ে যায়।
 রমযানে বাজারে যে বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, এর পশ্চাৎ কারণ অজানা নয়। অতি মুনাফা খোর ব্যবসায়ীদের কঠোর আইনের আওতায় আনা প্রযোজন। মজুদ বৃদ্ধি ও সিন্টিকেটের দিকে নজর দিতে হবে। দুষ্টি দিতে হবে একেবারে উৎসে। বাজারে চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান। বাজারে পর্যাপ্ত চালের মজুদ তার পর কেন মূল্য বাড়ছে এর কারণগুলো অনুসন্ধান করা জরুরী। আমরা প্রত্যাশা করি এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের নেতৃবৃন্দের যথাযথ সহযোগিতা মিলবে। আর একটি বিষয় আমলে নিতে হবে ব্যবসায়ীরা একাধিবার বলেছেন রমযান উপলক্ষে চাঁদাবাজি বেড়ে যায়। এবং নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভোগ্য পণ্যের উপর। তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়া যাবে না চাঁদাবাজদের শিকড় উৎপাটনে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। তাদের দমন করা না গেলে বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত করা যাবে না। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করার অপচেষ্টা থামাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সম্পর্ক নেই এমন কতগুলো পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। প্রতি বছর রমযান উপলক্ষে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকারি সংস্থা টিসিবির এই ‘ট্রাকসেল’ সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো। নিয়মিতভাবে বাজার মনিটরিং এর কথা ইতিমধ্যে নানা মহল থেকে বলা হয়েছে, কিন্তু দু:খজনক হলে সত্যযে এটা কথার কথা হয়ে গেছে। এমতবস্থায় ইতিবাচক কিছু আশা করা দুরাশার নামান্তর ছাড়া আর কিছুই না। বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির ক্ষমতা বড়ানো হয়নি। অসাধু ব্যবসায়রা যে কারসাজি করে ভোক্তা ও ক্রেতার বিড়ন্বনা বাড়ায় এ বিষয়টি নতুন কিছু নয়ু। কিন্তু সরকারের সৎ ইচ্ছা এ ব্যাপারে কতটা রয়েছে এ প্রশ্নের জওয়াব সরকারের দায়িত্বশীলরা ভালো দিতে পারবেন। আমাদের এই অভিজ্ঞতায় এও আছে, রমযান যত শেষের দিকে এগোবে তখন ঈদ সামনে রেখে বাজারে অস্তিরতা আর ও এক দফা বাড়বে। আমরা হয়ত এও শুনব, দায়িত্বশীলরা এ ব্যাপারে সজাগ। কিন্তু মানুষ যদি সুফল পায় শুধু তাদের পরিকল্পনায় সার্থকতার কথা বলা যাবে। মাত্রাতিরিক্ত কৃত্রিম সংকট তৈরি যারা করে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। চাল আমাদের একটি স্পর্শকাতর পণ্য। এর প্রয়োজন সর্বাগ্রে। চালের বাজার অশুভ চক্রের মুঠো বন্দী থাকে। এ ক্ষেত্রে আড়তদার, মজুদদার, পাইকার মিলে যে চক্র গড়ে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিলে যতই কথা বলা হোক না কেন এর সুফল মেলা ভার। গত বছর পিঁয়াজ নিয়ে কি তুঘলকি কান্ড ঘটে গিয়ে ছিল। তা অনেকের মনে রাখার কথা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ