ঢাকা, বুধবার 8 May 2019, ২৫ বৈশাখ ১৪২৬, ২ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

লাগামহীন বাজার এবং বিষাক্ত খাবার

এবারের পবিত্র রমযানেও পণ্যের বাজার যথারীতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকসহ গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকা সত্ত্বেও রমযান শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই হঠাৎ প্রায় সকল পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। প্রথম রমযানের আগেরদিন কমবেশি ৪৫০ টাকা দরের দেশি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা করে। সে হিসাবে দেশি মুরগির দাম গরুর মাংসের চাইতেও বেশি নেয়া হচ্ছে। কারণ, বড় বড় কিছু ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছাড়া সাধারণ বাজারে একই দিন প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে কমবেশি ৫৫০ টাকা দরে। ওদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৫২৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। খাশির মাংসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫০ টাকা।
কিন্তু খোলা কোনো বাজারেই সরকার তথা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত দামে গরু বা খাশির মাংস বিক্রি করতে দেখা যায়নি। সাধারণ ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন, খোলা বাজারে তো বটেই, প্রায় প্রতিটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেও মুরগি ও মাংসের দাম বেশি রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে আবার চাতুরিপূর্ণ কৌশল খাটিয়ে একই গরুর মাংসকে নানা নামে ভাগ করে ৭৮০, এমনকি ৮৫০-রও বেশি টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। খাশির মাংসের বেলায়ও বিক্রেতারা সরকার ও সিটি করপোরেশনের বেঁধে দেয়া দর মেনে চলছেন না। ফলে অত্যধিক দামে মুরগি ও মাংস কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
মাংসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হয়েছে মাছের দামও। এমনিতেই বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে মাছের সংকট সৃষ্টি করা হয়েছিল। মাছ পাওয়া যাচ্ছিল না বললেই চলে। তার ওপর রমযান এসে যাওয়ায় পরিপূর্ণ সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ব্যবসায়ী নামের দুর্বৃত্তরা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম ধরনের যুক্তি দেখিয়ে তারা যথেচ্ছভাবে মাছের দাম বাড়িয়ে চলেছে। ফলে মাছের দাম চলে গেছে সাধারণ মানুষের সাধ্যের অনেক বাইরে। অথচ রমযানে সুস্থ থাকার প্রয়োজনে রোযাদাররা সাধারণত মাংসের চাইতে মাছই বেশি খেয়ে থাকেন। সে মাছ এখন পাওয়াই যাচ্ছে না।
ওদিকে শাক-সবজির পাশাপাশি ফলের দামও লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। রমযানের শুরুতেই প্রতি কেজিতে সব ধরনের ফলের দাম বেড়েছে ২০/৩০ থেকে ৫০/৬০ টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে নাশপাতির দাম। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে রয়েছে খেজুর। প্রতি কেজিতে এর দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিটি বেল বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা দরেÑ কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে। আম, লাল ও সবুজ আপেল, লিচু, আঙ্গুর, মাল্টা, বেদানা, আনারস ও বাঙ্গিসহ এমন কোনো ফলের কথা বলা যাবে না, রমযানের শুরুতেই যার দাম না বেড়েছে। অথচ রমযানে বিশেষ করে ইফতারির সময় রোযাদাররা বেশি পরিমাণে ফল খেয়ে থাকেন। অনেকে ইফতারির শুরুই করেন খেজুরের মতো ফল দিয়ে। অন্যদিকে সে ফলই সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাইরে চলে গেছে।
আরো একটি ভয়ংকর অপরাধেও নেমেছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী এবং সিন্ডিকেট। তারা ফল থেকে শুরু করে মুড়ি ও পিঁয়াজু পর্যন্ত সকল পণ্যের মধ্যেই ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে বিক্রি করছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ট্যানারির বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড মিশিয়ে তারা মুড়িকে সাদা ও আকারে বড় করছে। বেগুণি, পিয়াজু, চপ এবং জিলাপিতেও তারা টেক্সটাইলের রং তথা বিষাক্ত রাসায়নিক মেশাচ্ছে। সাধারণ শরবতে পর্যন্ত রাসায়নিক মেশাতে দ্বিধা করছে না ব্যবসায়ী নামের এই দুর্বৃত্তরা। তারা পেপে, কমলা, আঙ্গুর, খেজুর, বাঙ্গি, বেল, আনারস ও তরমুজের মতো ফলে ফরমালিন ছাড়াও কারবাইড এবং রাইপেন নামের বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে পাইকারি বাজারে পাঠাচ্ছে। সেগুলোই বিক্রি হচ্ছে খোলা বাজারে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসবের কিছুই জানা বা বুঝে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। তারা তাই ফলের নামে প্রকৃতপক্ষে মারাত্মক ধরনের বিষ কিনে আনছেন। সেসব ফলই খাচ্ছেন সকল বয়সের রোযাদাররা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সব মিলিয়েই দেশে রমযানের বাজারে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, প্রতিটি পণ্যের মূল্য একদিকে সাধারণ মানুষের সাধ্যের অনেক বাইরে চলে গেছে, অন্যদিকে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক। আমরা মনে করি, এমন অবস্থা কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না এবং চলতে দেয়া যায় না। একথা অতীতেও বিভিন্ন উপলক্ষে বলা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোসহ সরকারের প্রশ্রয় ছাড়া ব্যবসায়ী নামের দুর্বৃত্তদের পক্ষে যেমন, নানা পর্যায়ে তৎপর সিন্ডিকেটগুলোর পক্ষেও তেমনি এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়।
সম্ভব আসলে হচ্ছেও না। সবকিছুর সঙ্গেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি লোকজন জড়িত রয়েছে। এজন্যই ঘটনাক্রমিক পদক্ষেপের বাইরে এমন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না, যার ফলে মানুষকে ঠকানোর এবং শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার কর্মকান্ড বন্ধ হবে। সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে বাস্তবে গণবিরোধী চক্রগুলো এমনকি মানুষের জীবন নিয়ে পর্যন্ত ছিনিমিনি খেলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। 
আমরা আশা করতে চাই, দুই সিটি করপোরেশনসহ সরকারের সকল সংস্থা জরুরিভিত্তিতে তৎপর হয়ে উঠবে এবং আকাশচুম্বি মূল্য ও জীবনবিনাশী খাদ্যপণ্যের কবল থেকে জনগণকে রক্ষা করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ