ঢাকা, বুধবার 8 May 2019, ২৫ বৈশাখ ১৪২৬, ২ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সমাগত মাহে রমযান

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির : খোশ আমদেদ মাহে রমজান। বছর ঘুরে আবার এলো রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজান। মহান আল্লাহ তায়ালার করুনা, বরকত, ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির পয়গাম নিয়ে ১৪৪০ হিজরী সনের মাহে রমজানুল মোবারক আমাদের মাঝে সমাগত। এ মাস হলো কল্যাণ , বহুগুন পুরষ্কার লাভ ও গুনাহ মাফের উপযুক্ত সময়। পবিত্র রমজান মাস নিঃসন্দেহের অন্যান্য মাস সমূহ থেকে পৃথক ভাবে মাহাত্ম্যের দাবী রাখে। কারণ, মানবতার মুক্তির সনদ সর্বযুগের সর্বাঙ্গীন জীবন ব্যবস্থার অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ আল কোরআন যে মাসে নাযিল করা হয়, সে মাসের পবিত্রতা, মাহাত্ম্য ও মহিমা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। আরবী মাস সমূহের এই ‘রমজান’ এ পরম করুনাময় আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেন আসমানী কিতাব সমূহের সর্বশেষ গ্রন্থ আল কোরআন। কোরআন শরীফে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে এরশাদ করেন, ‘রমজান এমন এক মহিমাময় ও গৌরবামন্ডিত মাস যে মাসে (আল্লাহতায়ালার পাক কালাম) কোরআন শরীফ নাযিল হয়েছে।
শুধু কোরআন শরীফই নয়, পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থসমূহ ও সহীফাগুলোও এই পবিত্র রমজান মাসে নাযিল করা হয়। রমজান মাসের পহেলা (কিংবা ৩রা তারিখে) হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সহীফা লাভ করেন, ৬ তারিখে হযরত মূসা (আঃ) এর কাছে পবিত্র ‘তাওরাত’ পৌছায়। হযরত দাউদ (আঃ) এর কাছে পবিত্র যাবুর নাযিল হয় এই পবিত্র মাসের ১৮ তারিখে, আর হযরত ঈসা (আঃ) এর পবিত্র ‘ইনজিল’ লাভ করেন এই মাসের ১২ তারিখে। এ থেকে সহজেই পবিত্র রমজান মাসের গুরুত্ব, পবিত্রতা ও মাহাত্ম্য বোঝা যায়। ‘রোজা’ একটি ফারসী শব্দ, আরবী ভাষায় রোজাকে ‘সিয়াম’ বলা হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা ও সংযম করাকে রোজা বলে। ‘সিয়াম’ শব্দেরও ঐ একই অর্থ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হল সিয়াম বা রোজা। শুধু পানাহার থেকে  বিরত থাকা বা ‘উপবাস’ ব্রত বললে ‘সিয়াম’ এর সঠিক রূপ প্রকাশ পায় না। ‘উপবাস ব্রত’ পৃথিবীর সকল ধর্মেই রয়েছে। তবে সুদীর্ঘ একমাস ব্যাপী ভোর (সোবহে সাদেক) থেকে সূর্যান্ত পর্যন্ত উপবাস এবং সেই সঙ্গে কঠোর সংযম সাধনার বিধান ইসলাম ছাড়া পৃথিবীতে আর অন্য কোন ধর্মে নেই। ‘রমজ’ শব্দ থেকে এসেছে ‘রমজান’। ‘রমজ’ শব্দের অর্থ হল জ্বালিয়ে দেওয়া, দগ্ধ করা। পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনা মানুষের মনের কলুষ- কালিমা পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়ে মনকে নির্মল ও পবিত্র করে তোলে, পাপ রাশিকে সম্পূর্ণ রূপে দগ্ধ করে দিয়ে মানুষকে করে তোলে পুণ্য এবং যোগ্য। যাতে করে সাধারণ মানুষ পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার অসাধারণ করুনা ও ক্ষমা পেয়ে ধন্য হতে পারে।
কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা  হয়েছে, যেমন তোমােেদর পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল। আশা যে, তোমরা মুত্তাকী হবে।’’ এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যত শরীয়ত দুনিয়ায় নাজিল হয়েছে তার প্রত্যেকটিতেই রোজা রাখার বিধি- ব্যবস্থা ছিল। নামাজের মত এই রোজাকেও আবহমানকাল থেকেই সকল নবীর শরীয়তেই ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র রমজানের রোজা তিনটি ভাগে বিভক্ত ‘রহমত’ ‘মাগফেরাত’ ও ‘নাজাত’। প্রথম দশদিন পরম করুণাময় আল্লাহ-তায়ালার অসীম রহমত ঝরে পড়তে থাকে পৃথিবীর উপরে, তাঁর রোজাদার মোমেন বান্দাদের উপর। দ্বিতীয় দশদিনে পাওয়া যায় ‘মাগফেরাত’ বা ক্ষমা- অন্যায় কাজ ও চিন্তার জন্য ক্ষমা, পাপাচার ও চারিত্রিক নোংরামির জন্য ক্ষমা। শেষ দশদিনে পাওয়া যায় মুক্তি-দোজখের শাস্তি থেকে মুক্তি, পাপ থেকে মুক্তি, যৌন-ক্ষুধা থেকে মুক্তি, কামনা থেকে মুক্তি, অশ্লীলতা থেকে মুক্তি, লোভ- লালসা থেকে মুক্তি, সকল প্রকারের অযৌক্তিক বন্ধন থেকে মুক্তি, সকল অশুভ কার্যকলাপ ও অন্যায় থেকে মুক্তি। আর এই মুক্তির জন্য ইতিকাফের সাধনা। মাহে রমজানের এই রোজার মাধ্যমে সংযম সাধনার ফলে মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় পরম করুণাময়ের নৈকট্য লাভ করার। কারণ, রমজানের ‘সিয়াম’ মানুষের মনের রিপুগুলোকে সংযত করে, দীন-দরিদ্র ক্ষুধার্তদের কষ্ট ও যন্ত্রণা ব্যথা ও বেদনা হৃদয়ঙ্গম করতে সাহায্য করে, মানুষকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। দয়াল নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন ‘আমি সেই মহান আল্লাহর কসম করিয়া বলিতেছি, যাঁহার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় জানিও আল্লাহর নিকট রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ মেশক বা কস্তরীর’ চেয়ে অধিক সুগন্ধি বলিয়া বিবেচিত”। সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো এরশাদ করেছেন, ‘রোজাদারের নিদ্রা এবাদতের সমতুল্য। তাহার নীরবতা তসবীহ পড়ার সমতুল্য। সে সামান্য এবাদতেই অন্য সময় অপেক্ষা অনেক বেশী সাওয়াবের অধিকারী হয়, তার দোয়া কবুল হয় এবং গোনাহ মাফ হয়। ঈমান ও ইতিকাফের সাথে যে ব্যক্তি রোজা রাখবে তার অতীতের সব গোনাহ- অপরাধ মাফ করে দেওয়া হবে”। সুতরাং পবিত্র রমজান মাসের ‘সিয়াম’ এর ফজিলত সত্যিই অসীম ও অতুলনীয়। কঠোর ‘সিয়াম’ এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য  লাভের সর্বাতœক চেষ্টা করা সকল মুসলমানের কর্তব্য। রোজার মাধ্যমে, তারাবির মাধ্যমে, সেহরী ও ইফতারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ একমাস ব্যাপী সংযম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভের এই সুযোগ আর কোন মাসেই পাওয়া যায় না। উপরন্তু এই পবিত্র মাসে যেভাবে আল্লাহর রহমত আমাদের উপর বর্ষিত হয়, সে ধরণের দুর্লভ ও অসাধারণ সুযোগ আমরা কেউ কোন দিনও হারাতে চাই না। মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন ঃ ‘মানুষ যত প্রকার নেকী বা নেক কাজ করে আমি তার সাওয়াব দশগুন থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেই। কিন্তু রোজা এই নিয়মের বহির্ভুত। রোজার সওয়াব এভাবে সীমাবদ্ধ বা সীমিত নয়। রোজার পুরষ্কার আমি স্বয়ং প্রদান করিব।’
পরিশেষে, দয়াময় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, হে প্রভু! তুমি আমাদেরকে এই মাহে রমজানের যথাযথ হক আদায় করা তাওফিক দান কর এবং দূর কর সব অন্যায়-অবিচার, পাপাচার। আমাদের দাও একটি সুন্দর ও আলোকিত সমাজ। যে সমাজে থাকবে সুখ, শান্তি। যে সমাজের মানুষ হবে সত্যিকারের মানুষ, হবে তোমার প্রেম পাগল এবং তোমার হাবিবের প্রেমিক। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক ভাবে আমরা যেন আল্লাহ তায়ালার প্রিয় ভাজন হতে পারি। আমিন। বিহুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরসালিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ