ঢাকা, ‍বৃহস্পতিবার 9 May 2019, ২৬ বৈশাখ ১৪২৬, ৩ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মূল্যস্ফীতি

সরকারের পক্ষ থেকে বাজারদর স্থিতিশীল থাকার কথা প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম যেমন বেড়ে চলেছে তেমনি বাড়ছে মূল্যস্ফীতিও। শুধু তা-ই নয়, মূল্যস্ফীতির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানেও পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে কেবল পাকিস্তান। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বিগত বছর ২০১৮ সালের শেষে দেশের মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০১৯ সালের শুরু থেকেও মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
ধারণা করা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অব্যাহতই রয়েছে এবং এপ্রিল ও মে মাসের পরিসংখ্যানেও সেটাই জানা যাবে। উল্লেখ্য, পাকিস্তান সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গেলেও বাংলাদেশের তুলনায় প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে কিন্তু মূল্যস্ফীতি অনেক কম হয়েছে। ২০১৮ সালে ভারতের মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের দিক থেকে দেশটি অবশ্য বাংলাদেশের চাইতে পিছিয়ে রয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জিডিপি যেখানে ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ সেখানে ভারতের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দুই শতাংশ কম। কিন্তু জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সামান্য পিছিয়ে থাকলেও ভারত মূল্যস্ফীতি কঠোরভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি এবং মূল্যস্ফীতির দিক থেকে একমাত্র দেশ পাকিস্তানের পর সর্বোচ্চ তথা দ্বিতীয় অবস্থানে পৌঁছে যাওয়ার খবর অত্যন্ত আশংকাজনক। কারণ, অর্থনীতির নিয়ম ও ব্যাখ্যার মূলকথা হলো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকার অংকে পণ্য ও পণ্যসেবার মূল্য বেড়ে গেলে তাকেই মূল্যস্ফীতি বলা হয়। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশে পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আগে ১০০ টাকায় যে পণ্য কেনা যেতো সেটাই এখন ১০৫ দশমিক ৫৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা অবশ্য মনে করেন, এ পরিসংখ্যানও সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশে সাধারণত র‌্যান্ডম স্যামপ্লিং-এর পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ ও রিপোর্ট তৈরি করা হয় এবং এতে প্রায় ক্ষেত্রেই সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও বলা দরকার, ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতিও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বড়কথা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপই এখনো সরকারকে নিতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে যায়। অন্যদিকে সাধ্যের বাইরে গিয়ে হলেও চাহিদা পূরণ করার জন্য মানুষকে বেশি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে হয়। এতে বেশি বিপদে পড়ে বিশেষ করে নি¤œ ও সীমিত আয়ের মানুষেরা। নাভিশ্বাস ওঠে মধ্যবিত্ত হিসেবে পরিচিতদের- লজ্জায় যারা নিজেদের অক্ষমতা ও দুরবস্থার কথা বলতেও পারেন না।
আমরা মনে করি, প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে দেখিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর ওঠানোর কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। কারণ, ভারতের শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের উদাহরণও বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। ২০১৮ সালে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতির হার ছিল এক শতাংশেরও অনেক নিচে- মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানও বাংলাদেশকে লজ্জায় ফেলেছে। কারণ, ২০১৮ সালে মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এ ধরনের বৃদ্ধিকে কোনো গুরুত্বই দেয়া চলে না।
বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আমরা বেশি উদ্বিগ্ন আসলে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। কারণ, ২০১৮ সালের শেষদিকেও যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সেখানে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে এবং মার্চ শেষে পৌঁছেছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এভাবে বাড়তে থাকলে জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তিই শুধু বাড়বে না, একই সঙ্গে সরকারের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতারও প্রকাশ ঘটবে। জাতীয় অর্থনীতি তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। আমরা তাই পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। আমরা মনে করি, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও ভারতের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানও যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কমিয়ে আনতে পারে তাহলে বাংলাদেশেও সেটা সহজেই সম্ভব হওয়া উচিত। এজন্য দরকার শুধু সুষ্ঠু পরিকল্পনার এবং সরকারের সদিচ্ছার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ