ঢাকা, ‍বৃহস্পতিবার 9 May 2019, ২৬ বৈশাখ ১৪২৬, ৩ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ

মোঃ জাহিদ : প্রখ্যাত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ব্যাংককের একটি হাসপাতালে গত ২৭ শে এপ্রিল বাংলাদেশ সময় ১০.১৫ মিনিটে ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। উনার মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন সন্তান ও বহু শুভাকাঙ্খী রেখে আমাদের মাঝ থেকে না ফেরার দেশে চলে যান। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল প্রায় ৬৯ বছর। সাহসী সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ১৯৫০ সালে নোয়াখালীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞান ও সাংবাদিকতা স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী হিসাবে ৬৯ এ এগারো দফা আন্দোলন এ অংশ নেন। তিনি আইয়ুব খানের শাসন আমলে ঢাকা কলেজ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পরে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের একসময় জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রা ১৯৭২ সালে জন্মলগ্ন থেকে জড়িত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজী দৈনিক পত্রিকায় কাজ করেছেন। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেবেলপমেন্ট নামে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আন্তার্জাতিকভাবে পরিচিত একজন সক্রীয় পরিবেশবাদ ছিলেন। বাংলাদেশে তিনি প্রথম পরিবেশ বাদ সাংবাদিকতার সূচনা করেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটর এবং আন্তার্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনের ইন্টারনেশালান ফর কনজারবেশন অব লেকচারের আন্তার্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের প্রথম বাংলাদশের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি মাঝে চীনে বিশেষজ্ঞ হিসাবে, কোলকাতায় বাংলাদেশ উপ দূতাবাশের দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ডেপোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণ যোগাযোগ বিভাগের শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন বিষয় বাংলা ও ইংরেজীতে লেখা সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর বইয়ের সংখ্যা ৫০টির ও বেশি। তার সাম্প্রতীক সময়ে বইয়ের মধ্যে রয়েছে জিয়া অব বাংলাদেশ, এ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফী, যাদুর লাউ, যে কথা বলতে চাই, অভ্যুন্থান ৬৯, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, বেগম খালেদা জিয়া হার লাইফ হার স্টোরী, স্বাধীনতার ১ম দশকে বাংলাদেশ। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ছিলেন একজন সাহসী সাংবাদিক। তিনি যখন কথা বলতেন অত্যন্ত সাহসীকতা, দৃঢ়তা, তথ্য ভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ, রেফারেন্স ও যুক্তি উপস্থাপন করে বলতেন। তার কথার মাঝে আলাদা একটা আকর্ষন ছিল। যা অন্য দশ জনের চেয়ে ভিন্ন ও দর্শকের কাছে গ্রহনযোগ্য। সারা দেশে ও দেশের বাহিরে উনার অনেক ভক্ত ছিল। অনার কথার থেকে অনেক কিছু শিখার আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনার আকর্ষন, তত্ত্ব ভিত্তিক কথা বলার কারণে উনাকে খুবই পছন্দ করতাম। উনার কথা শূনার জন্য অনেক দর্শক ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া টকশোর দিকে তাকিয়ে থাকতো। ছাত্র জীবনে ছাত্র রাজনীতিদ করার সময় উনি ছাত্র সমাজের যতেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। তিনি ছাত্রজীবন থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন। এর জন্য বহুবার তার জীবনের উপর হুমকী এসেছিল। কিন্তু তিনি তার অবস্থান থেকে সরে যাননি। আমি টকশোএর মাধ্যমে উনার কথা যখন শুনতাম তখন আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হতো উনি একজন সত্যকার দেশপ্রেমীক মানুষ। দেশের স্বাধীনতার সার্বমৌমত্বের প্রতি যদি কোন দেশ বা ব্যক্তি আঘাত দিয়ে কথা বলতেন তিনি তার বিরুদ্ধে কথা বলতেন ও প্রতিবাধ করতেন। সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর কথা থেকে বুঝা যেতো যে এ দেশের স্বাধীনতার জন্য বড় একটা হুমকি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। এটা উনার কথার মাধ্যমে বুঝা যেতো। উনি গণমাধ্যমে আলোচনার সময় বলছেন যে, ভারত তাদের স্বার্থ্যরে কারণে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে সেনাবাহিনী দিয়ে বাংলাদেশকে সহযোগীতা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন যে, কোন দেশের সেনাবাহিনী অন্য দেশকে স্বাধীনতা যুদ্ধ বা যেকোন কারণে সহযোগীতা করলে সে দেশের স্বার্থ অবশ্যই জড়িত আছে। সে দেশের স্বার্থ্য ছাড়া সেনাবাহিনী অন্য দেশকে কোন কারণে সহযোগীতা করেনা। তিনি ফিলখানা হত্যাকান্ডের সাথে বাহিরের অপ শক্তি জড়িত আছে এটা তিনি অনেকভাবে বুঝানোর চেষ্টাও করতেন। ফিলাখানা হত্যাকান্ডে মারাত্মকভাবে মন ও মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছেন। তা বুঝানোর চেষ্টা করতেন। ফেলানী হত্যাকন্ডসহ সীমান্তে যে কোন হত্যাকান্ডের জন্য তিনি প্রতিবাধ করতেন ও এটা একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সেটা তিনি বলতেন। প্রতিবছর দুই হাজার কোটি টাকার পণ্য ভারত থেকে আমদানী করা, চিকিৎসার জন্য আমাদের কথায় কথায় ভারত চলে যাওয়া, তারফলে দুইশত কোটি টাকা ভারতে প্রচার হচ্ছে। ইদের কেনাকাটা ও ব্যক্তিগত কেনাকাটার জন্য আমরা ভারত নির্ভর হয়ে পড়েছি। তাতে এ দেশের অর্থনীতি বর্তমানে ও আগামীতে মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়বে। এমনকি ভারত থেকে শর্ত দিয়ে ঋণ নেওয়া এসব ব্যাপারে উনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং এগুলো প্রতিবাধ করতেন। ১৯৭৫ সালে র ১৫ই আগষ্ট শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার পর খন্দকার মোস্তাকের নেতৃত্বে যে মন্ত্রীপরিষদ গঠিত হয় তার তিন দিন পর ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত এসে খন্দকার মোস্তাকের মন্ত্রীপরিষদকে সমর্থন জানান। এর মাধ্যমে তিনি বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার ও দেশবাসীকে বুঝাতে চেয়েছেন ভারত প্রকৃতপক্ষে আওয়ামীলীগের ও বন্ধু নয়। তাদের স্বার্থের কারণে যেকোন দিকে অবস্থান নিতে পারে। নীতি আদর্শ বাদ দিয়ে নিজের স্বার্থ্যরে কথা যদি সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ চিন্তা করতেন তাহলে তিনি বর্তমান সরকারের কাছ থেকে অনেক সুযোগ সুবিধা নিয়ে আরাম আয়েশে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি এ সরকারের ৫ই জানুয়ারী নির্বাচন নিয়ে গঠনমূলক ও যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন ৫ই জানুয়ারী নির্বাচন একটা বিতর্কীত নির্বাচন। এ নির্বাচন বাংলাদেশের জনগনের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পায়নি। এটার জাতির জন্য অত্যন্ত কলঙ্কজনক। প্রখ্যাত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরি, হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মাসেতু দুর্নীতিসহ এসব বিষয় নিয়ে তিনি গণমাধ্যমের সামনে সাহসীকতা নিয়ে কথা বলেছেন। উনার মত সাহসীকতার লোক খুবই কম। বেগম খালেদা জিয়া গাড়ীবহরের উপর যতবার হামলা করা হয়েছে তিনি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাধ করে বলেছেন, রাষ্ট্র যখন সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তখন রাষ্ট্র একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি আরো বলেন ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার চেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতির কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে রাষ্ট্র বা জাতির তেমন সম্পর্ক নাই। কিন্তু সাবেক প্রধানন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে রাষ্ট্র, সতর কোটি মানুষের আবেগ অনুভুতি জড়িত। তাই বেগম খালেদা জিয়ার উপর হামালা রাষ্ট্রকে চেলেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তিনি ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচন নিয়ে তিনি গণমাধ্যমের সামনে অনেক গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন। দেশ, জাতি ও গণতন্তের স্বার্থে। উনি যে একজন নিঃস্বার্থ মানুষ ছিলেন তার প্রমাণ হল এই সরকারের সাথে কখনো আপোষ করে কথা বলেননি। তিনি ইচ্ছা করলে সরকারের সাথে হাত মিলিয়ে অনেক সুবিধা নিতে পারতেন। রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, এরশাদ, মাইনুদ্দিন খান বাদলদের মত তিনি ন। নীতি আদর্শ বাদ দিয়ে নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে সুযোগ সুবিধা নিয়ে আরাম আয়েশে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ