ঢাকা, ‍শুক্রবার 10 May 2019, ২৭ বৈশাখ ১৪২৬, ৪ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কর্মক্ষেত্রে নারী-পুুরুষের অবাধ মেলামেশা

জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর হলেও দেশে ধর্ষণসহ যৌন হয়রানি আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। শুধু ধর্ষণ নয়, ধর্ষণের পর প্রচ- নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যাকা-ের নিষ্ঠুরতাও দেখাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। এ ব্যাপারে তরুণী ও কম বয়সী মেয়েরা তো বটেই, রেহাই পাচ্ছে না এমনকি শিশুরাও। গ্রামে ও পাড়া-মহল্লার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে আবার চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা যুক্ত হতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে এক নারী এ ধরনের নৃশংসতার শিকার হয়েছিল। এতে জড়িত বাস চালক ও তার সহকারীকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কিন্তু এরপর ওই মামলা সম্পর্কে আর কিছু জানা যায়নি। 

এমন বিচার ও শাস্তিহীন অবস্থাকেই দুর্বৃত্তরা নিজেদের জন্য প্রশ্রয়ের কারণ হিসেবে ধরে নিয়েছে। সুযোগ নিতেও পিছিয়ে থাকছে না তারা। গত মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদিতে ঢাকার একটি হাসপাতালের নার্সকে একা পেয়ে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে হত্যা করেছে বাস চালক এবং তার সহকারীসহ বন্ধুরা। এ ঘটনার পর অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্তরা অস্বীকার করলেও জেলা সিভিল সার্জনের অফিস থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে। এখন চলছে বিচারের নামে আসলে কি করা হয় তা দেখার জন্য অপেক্ষার পালা।

এখানে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ধর্ষণ এবং হত্যাসহ যৌন নির্যাতন আসলে ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পাড়া-মহল্লা ও অফিসের পাশাপাশি যৌন নির্যাতন চলছে বিভিন্ন শিল্প-কারখানাতেও। কোনো একটি স্থানেই নারীরা নিরাপদে কাজ করতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ কিছু আশংকাজনক তথ্য উপস্থাপন করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ‘তৈরি পোশাক শিল্প-কারখানায় নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি : সংগ্রাম ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা রিপোর্টে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, গার্মেন্ট শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে ২২ দশমিক ৪ শতাংশই নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এদের বাইরে ৩৫ দশমিক ৩ ভাগ নারী বলেছে, তারা নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানির ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। অর্থাৎ তাদের সামনেই ধর্ষণসহ যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ওই গবেষণা রিপোর্টে যৌন হয়রানির বিভিন্ন ধরন সম্পর্কিত তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে। গার্মেন্ট শিল্পে কর্মরত ৭৯ শতাংশ নারী এবং ৮২ দশমিক ৫৬ শতাংশ পুরুষ কর্মী মনে করেন, শুধু ধর্ষণকেই যৌন হয়রানি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তাদের মতে নারী দেহের কোনো স্থানে অপ্রত্যাশিত স্পর্শই যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। সেই সাথে রয়েছে কোনো নারীর দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকানোÑ ৪২ দশমিক ৩৩ শতাংশ যাকে যৌন হয়রানি বলে মনে করেন।  

এভাবে বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানের মাধ্যমে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন উপস্থাপিত গবেষণা রিপোর্টের মূলকথায় জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এদের মধ্যে সরাসরি জানা গেছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমিক সম্পর্কে। উল্লেখ্য, মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের সমাজ অত্যন্ত রক্ষণশীল। তাছাড়া নিজেরা ধর্মপরায়ণ বলেও নির্যাতিত নারী শ্রমিকরা সবকিছু প্রকাশ করেন না। তাদের কাছে চাকরি তথা মাসশেষে পাওয়া বেতনের গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনেক। এজন্যই যৌন হয়রানির, এমনকি ধর্ষণের শিকার হলেও তারা তা প্রকাশ করেন না বরং গোপনে সহ্য করেন। অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের এই অসহায়ত্তকেই দুর্বৃত্তরা শোষণ করে নিষ্ঠুরভাবে।

আমরা মনে করি, এমন অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। কারণ, গার্মেন্ট কোনো সাধারণ শিল্প নয়। দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই উপার্জিত হয় গার্মেন্টের খাত থেকে। আর খাতটিতে তথা গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি শ্রমিকই নারী। অন্যদিকে সে নারী শ্রমিকদেরকেই যৌন হয়রানির শিকার বানানো হচ্ছে। বলা দরকার, সবকিছুরই একটা সীমা থাকা দরকার। সরকারের উচিত কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশাজনিত যৌন অপরাধ মোকাবিলার ব্যাপারে জরুরিভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া। বিদেশী ক্রেতাদের কাছেও নারী নির্যাতনের খবর নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তেমন অবস্থায় একদিকে শ্রমিক সংকট মারাত্মক হয়ে উঠবে, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা পিছিয়ে গেলে কিংবা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আমদানি বন্ধ করলে বা কমিয়ে দিলে জাতীয় অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে পড়বে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ