ঢাকা, ‍শুক্রবার 10 May 2019, ২৭ বৈশাখ ১৪২৬, ৪ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী আন্দোলন

মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : [এক] সিলমুন বা সালমুন মূল ধাতু থেকে ইসলাম শব্দের উৎপত্তি। এর শাব্দিক অর্থ ‘আনুগত্য করা’, ‘কোনো কিছু মাথা পেতে নেয়া’। পারিভাষিক অর্থ- একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (সাঃ) প্রদর্শিত জীবন-পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং এর বিপরীত সমস্ত স্বার্থবাদী, অলিক চিন্তা, মত-পথ ও স্বেচ্ছাচারী দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে চলা।

কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবন বিধান হচ্ছে ইসলাম। যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারা এ দ্বীন থেকে সরে গিয়ে যেসব বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, সেগুলো অবলম্বনের এ ছাড়া আর কোন কারণই ছিল না যে, প্রকৃত জ্ঞান এসে যাওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যে পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করার জন্য এমনটি করেছে। আর যে কেউ আল্লাহর হিদায়াতের আনুগত্য করতে অস্বীকার করে, তার কাছ থেকে হিসেব নিতে আল্লাহর মোটেই দেরি হয় না।’ (আল ইমরান : ১৯)

মানুষের মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা একমাত্র জীবনবিধান আল ইসলামকে মনোনিত করেছেন। সকল নবী ও রাসূল এই একটি মাত্র জীবনবিধানের প্রতি আহবান জানিয়েছেন এবং তা কায়েম করার জন্য সংগ্রাম করতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়েছিলেন। (সূরা আশ-শুরা : ১৩ ) 

অতএব মানুষের মুক্তির জন্য সিরাতুল মোস্তাকিম অর্থাৎ মানুষের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল সহজ-সরল পথ একটাই যা মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে বিষয়ের ফায়সালা আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই চূড়ান্ত করেছেন কৌশলের নামে সে বিষয়ের ব্যাপারে অন্য কোন কাঠামো বা পদ্ধতি কিংবা অন্য কোন দেশ বা ব্যক্তির মডেলকে সামনে আনার অপচেষ্টা সুস্পষ্টভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর তা’য়ালার বাণী: ‘তোমাদের মধ্যে রাসুলুল্লাল্লাহর জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ’। (সূরা আহযাব: ২১)

অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ববাসীর জন্য একমাত্র আদর্শ নেতা হচ্ছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর বিকল্প খোঁজার বা আবিস্কারের অপচেষ্টা একটি ব্যর্থ চেষ্টা ও হীনমন্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যে কোন দেশ বা জাতির কাঙ্খিত মুক্তির লক্ষ্যে যে বা যারাই যে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করুক না কেন, প্রকৃত ও স্থায়ী সাফল্যের জন্য তাকে আল্লাহর দেয়া সিরাতুল মোস্তাকিমের পথ ও তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আর্দশ নেতা হিসেবে গ্রহণ ও মেনে নিয়েই তা করতে হবে। অন্যথায় দুনিয়ায় তো বটেই আখেরাতেও তাদেরকে হতে হবে ব্যর্থ, আশাহত ও বঞ্চিত। 

মহান আল্লাহর তা’য়ালার বাণী: ‘এ আনুগত্য (ইসলাম) ছাড়া যে ব্যক্তি অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে চায় তার সে পদ্ধতি কখনোই গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ব্যর্থ, আশাহত ও বঞ্চিত।’ (সূরা আলে ইমরান: ৮৫) 

সুতরাং নগদ পাওয়ার হাতছানিতে পড়ে কৌশলের নামে আল্লাহর বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোন চিন্তা-চেতনা পোষণ করা, ইসলামকে বাদ দিয়ে নতুন কোন তথাকথিত কাঠামো, পদ্ধতি বা মডেলের নামে ইসলামের পথ থেকে সরে পড়ার বাহানা এবং প্রকৃত ঈমানদারদের মনে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টির যেকোন অপচেষ্টা কোন মুমিন সুলভ কাজ হতে পারে না এবং এ ধরনের অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

‘না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুনিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পারিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোন প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে।’ (সূরা নিসা : ৬৫)

মহান আল্লাহ তা’য়ালা এ দ্বীন বা জীবনব্যবস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা হিসেবে আমাদের জন্য মনোনিত করেছেন। অর্থাৎ ইসলামের মধ্যে কোন সীমাবদ্ধতা বা দেউলিয়াত্ব নেই যে, জীবন সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামকে বাদ দিয়ে অন্য কোন আদর্শ বা মডেলের কাছে ছুটাছুটি করতে হবে।

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছি, আমার নিয়ামত তোমাদের প্রতি সম্পূর্ণ করেছি এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছি। কাজেই তোমাদের ওপর হালাল ও হারামের যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তা মেনে চলো ‘ (সূরা মায়েদা:৩)

সুতরাং আমাদের প্রতি মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ তাঁর কাছে পুরোপুরি আতœসমর্পণ করতে হবে।

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের অনুসারী হয়ো না, কেননা সে তোমাদের সুস্পষ্ট দুশমন।’ (সূরা বাকার : ২০৮)

অর্থাৎ ইসলামের পথ ছাড়া আর যত পথ ও মত আছে সবই শয়তানের আবিষ্কার। শয়তান আমাদের মধ্যে ওয়াসওয়াসা তৈরি করে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দিয়ে সত্য পথ থেকে সরিয়ে দিতে চায়। কাপুরুষতা, হীনমন্যতা, লোভ-লালসা ও অলীক চিন্তা-চেতনা ঢুকিয়ে দিয়ে চলার পথকে বাধাগ্রস্থ করবে এটাই শয়তানের একমাত্র কাজ। কিন্তু প্রকৃত মুমিনরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারে না।

তাছাড়া ইসলামের আংশিক অনুসরণ আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আংশিক ইসলাম পালনের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- ‘তাহলে কি তোমরা কিতাবের একটি অংশের ওপর ঈমান আনছো এবং অন্য অংশের সাথে কুফরী করছো? তারপর তোমাদের মধ্য থেকে যারাই এমনটি করবে তাদের শাস্তি এ ছাড়া আর কি হতে পারে যে, দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হবে এবং আখেরাতে তাদেরকে কঠিনতম শাস্তির দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে? তোমাদের কর্মকা- থেকে আল্লাহ তা’য়ালা বেখবর নন। (সূরা বাকারা: ৮৫ আংশিক)

সুতরাং রাষ্ট্রীয় নিপিড়ন, ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা উপেক্ষা করে ও সর্বপ্রকার স্বেচ্ছাচারীতার নীতি পরিহার করে যারা আল্লাহর পথে দৃঢ়তার সহিত টিকে থাকবে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যরূপ মহা নেয়ামত এবং কিয়ামতের দিন পুরষ্কার হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ ও মহান আল্লাহর আতিথ্য লাভ করে তারা ধন্য হবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সূরা হামীম আস সাজদাহ’য় বলেন-  যারা ঘোষণা করেছে, আল্লাহর আমাদের রব, অতপর তার ওপরে দৃঢ় ও স্থির থেকেছে নিশ্চিত তাদের কাছে ফেরেশতারা আসে এবং তাদের বলে, ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও তোমাদেরকে যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।’

 আমরা এই দুনিয়ার জীবনেও তোমাদের বন্ধু এবং আখিরাতেও। সেখানে তোমরা যা চাবে তাই পাবে। আর যে জিনিসেরই আকাংখা করবে তাই লাভ করবে।

 এটা সেই মহান সত্তার পক্ষ থেকে মেহমানদারীর আয়োজন যিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।

ইসলামের পথই আসল পথ। জান্নাতে যাওয়ার সোজা রাস্তা। এ রাস্তাকে দৃঢ়তার সহিত আঁকড়ে ধরতে হবে। দুনিয়াবী স্বার্থ ও লোভ-লালসায় পড়ে এ রাস্তার ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ-সংশয় ও কম্প্রমাইজ করা যাবে না। এ ধরনের আপসকামীতার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাত দু’জাহানে সফলতা পাওয়ার কোন সুযোগ বা সম্ভাবনা নেই। সবর-আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সহিত ইসলামের পথে অবিচল থাকলে সফলতা আসবে বলে আল্লাহ তা’য়ালার ওয়াদা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকৃত মুমিন হওয়ার যে শর্ত দেয়া হয়েছে সেটা পূরণ করার ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই বিজয় নিশ্চিত ইনশাআল্লাহ।

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের কল্যাণের জন্য জীবন বিধান হিসেবে আল-ইসলামকে মনোনিত করেছেন। এই একটি মাত্র জীবনবিধান যুগে যুগে নবী-রাসূলদের কাছে প্রেরণ করে তা কায়েম করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন। 

‘তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেই সব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মাদ) যা এখন আমি তোমার কাছে ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম আমি ইবরাহীম (আ) মূসা (আ) ও ঈসা (আ) তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, এ দীনকে কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে পরস্পর ভিন্ন হয়ো না। (হে মুহাম্মাদ) এই কথাটিই এসব মুশরিকের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় যার দিকে তুমি তাদের আহবান জানাচ্ছো। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আপন করে নেন এবং তিনি তাদেরকেই নিজের কাছে আসার পথ দেখান যারা তাঁর প্রতি রুজু করে।’ (সূরা আশ-শুরা: ১৩)

সর্বশেষ নবী ও রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের উদ্দেশ্য হিসেবে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- ‘তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হিদায়াত এবং ‘দীনে হক’ দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি এ দীনকে অন্য সকল দীনের ওপর বিজয়ী করেন, চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অসহনীয় হোক না কেন।’ (সূরা আস-সফ: ৯) 

এছাড়া ফাতাহ:২৮, তাওবা: ৩৩ প্রায় একই  রকম বক্তব্য রয়েছে। মুমিনগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ‘প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে। তাদের প্রতি তাওরাত,ইনজিল ও কুরআনে (জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা বিশেষ। আর আল্লাহর চাইতে বেশী নিজের ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা-বেচা করছো সে জন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।’ (সূরা তাওবা: ১১১) (চলবে)

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ