ঢাকা, ‍শনিবার 11 May 2019, ২৮ বৈশাখ ১৪২৬, ৫ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে ইসলামী আন্দোলন

মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : ॥২॥
উপরোক্ত আয়াত ছাড়াও আরো বহু দৃষ্টান্ত পবিত্র আল-কুরআনের পাতায় পাতায় রয়েছে। যা দ্বারা একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মহান আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে তাঁর বাণীবাহক নবী-রাসূলগণকে মূলত হেদায়াত ও দীনকে কায়েম ও বিজয়ী করার জন্য তাঁর পথে সংগ্রামের জন্য পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁরা তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত সিনসিয়ার ও সিরিয়াসলি পালন করেছেন।
একইভাবে মুমিনগণের জান ও মাল আল্লাহ তা’য়ালা বেহেশতের বিনিময়ে খরিদ করে নিয়ে তাদেরকেও দীনকে বিজয়ী করতে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এ দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহ তা’য়ালা মুমিদেরকে তাঁর খলিফা ও আনসারুল্লাহর মর্যাদা প্রদান করেছেন।
ইসলামী আন্দোলন আল্লাহ তা’য়ালার নিজেরই আন্দোলন। এ আন্দোলনের মূল অভিবাবক মহান আল্লাহ তা’য়ালা। আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও কুরআনের আন্দোলন হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হবে এটাই স্বাভাবিক। আর এটা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অঙ্গিকারও বটে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
‘এরা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহর ফায়সালা হলো তিনি তার নূরকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন। কাফেররা তা যতই অপছন্দ করুক না কেন।’ (সূরা আস-সফ: ৮)
অর্থাৎ বিজয়ের পূর্ব শর্ত হলো, আমাদেরকে প্রকৃত ও খাঁটি মুমিন হতে হবে। আর ঈমান আনার শর্তই হচ্ছে তাগুতকে অস্বীকার করা। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
‘দীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ (যাকে সে অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে ) সবকিছু শোনেন ও জানেন।’ (সূরা বাকারা: ২৫৬)
এ আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ঈমানের নেয়ামত কারো গলায় জোর করে পরিয়ে দেয়া হবে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে দিয়ে সঠিক বা বেঠিক মত গ্রহণের ব্যাপারে ব্যক্তিকে স্বাধীনতা প্রদান করেছেন। চাইলে সে সত্যকে গ্রহণ করতে পারে আর না করতে চাইলেও এটা তার একান্ত বিষয়। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি ঈমান গ্রহণের দাবি করে তাহলে তাঁকে তাগুতকে অস্বীকার করেই তা করতে হবে। তাগুতকে অস্বীকার না করে ঈমান আনার দাবি অসার ও হাস্যকর।
কেননা তাগুত হচ্ছে কাফিরের চাইতেও ভয়ংকর। ইসলামী চিন্তাবিদগণ তাগুতের সংজ্ঞায় বলেছেন, তাগুত নিজে তো আল্লাহর পথে চলে না অন্যকেও আল্লাহর পথে চলতে বাঁধা প্রদান করে। উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাগুতকে সরাসরি অস্বীকার বা বর্জন করতে বলেছেন। আর কাফিরকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি নিজের পিতা ও ভাইদেরকেও বন্ধুরূপে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন যদি তারা ঈমানের পথের পরিবর্তে কুফরীকে প্রাধান্য দেয়।
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের বাপ ও ভাইয়েরা যদি ঈমানের ওপর কুফরীকে প্রাধান্য দেয় তাহলে তাদেরকেও নিজেদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে তারাই জালেম।’ (সূরা তাওবা: ২৩)
সুতরাং তাগুতি ও কুফুরী শক্তিকে বর্জন ও বন্ধুরূপে গ্রহণ না করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালার প্রত্যাদেশ যেখানে আমাদের কাছে স্পষ্ট অথচ যে তাগুতি শক্তিটি এদেশের ইসলামী আন্দোলনের ক্ষতি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব অসংখ্য তাফসীর মাহফিলে যাদের ভয়ঙ্কর চরিত্র সম্পর্কে বার বার দেশবাসীকে সজাগ ও সচেতন করেছেন, সেই নাস্তিক্যবাদীদের বুদ্ধি ও পরামর্শে এবং তাদেরকে পাশে বসিয়ে ইসলামী আন্দোলনের এত বড় প্লাটফর্মকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার হীন কাজ থেকে মহান আল্লাহ তায়ালা সকলকে হেফাজত করুন এবং তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে মহান আল্লাহর ভাষায় জালিম হওয়া থেকে রক্ষা করুন।
বস্তুত আমরা যারা ইসলামী আন্দোলনের সফলতা চাই তাদেরকে খাঁটি মুমিনের যোগ্যতা অর্জনে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র আল-কুরআনের সুরা মুমিনুনের প্রথম ১১ আয়াতে এবং সূরা ফোরকানের শেষ রুকুতে যে বৈশিষ্টগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো আতœস্ত করে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের অন্য ভাই-বোনদেরকে এ ব্যাপারে মোটিভেশন চালাতে হবে।
সূরা আল মুমিনুনে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ-
‘নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে মু’মিনরা যারা নিজেদের নামাযে বিনয়াবনত হয়, বাজে কাজ থেকে দূরে থাকে, যাকাতের পথে সক্রিয় থাকে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, নিজেদের স্ত্রীদের ও অধিকারভুক্ত বাঁদীদের ছাড়া, এদের কাছে (হেফাজত না করলে) তারা তিরস্কৃত হবে না, তবে যারা এর বাইরে আরো কিছু চাইবে তারাই হবে সীমালঙ্ঘনকারী, নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, এবং নিজেদের নামাযগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে। তারাই এমন ধরনের উত্তরাধিকারী যারা নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে ফিরদাউস লাভ করবে এবং সেখানে তারা চিরকাল বসবাস করবে।’
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সূরা আল ফোরকানের ৬৩ থেকে ৭৬ নাম্বার আয়াতে যা বলেন-
৬৩) রহমানের (আসল) বান্দা তারাই যারা পৃথিবীর বুকে ন¤্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা তাদের সাথে কথা বলতে থাকলে বলে দেয়,
৬৪) তোমাদের সালাম। তারা নিজেদের রবের সামনে সিজদায় অবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়।
৬৫) তারা দোয়া করতে থাকেঃ “হে আমাদের রব ! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও, তার আযাব তো সর্বনাশা।
৬৬) আশ্রয়স্থল ও আবাস হিসেবে তা বড়ই নিকৃষ্ট জায়গা”।
৬৭) তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না বরং উভয় প্রান্তিকের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।
৬৮) তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণ হারাম করেছেন কোন সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তিভোগ করবে।
৬৯) কিয়ামতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেয়া হবে এবং সেখানেই সে পড়ে থাকবে চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায়।
৭০) তবে তারা ছাড়া যারা (ঐসব গোনাহের পর) তাওবা করেছে এবং ইমান এনে সৎ কাজ করতে থেকেছে। এ ধরনের লোকদের অসৎ কাজগুলোকে আল্লাহ সৎকাজের দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন এবং আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।
৭১) যে ব্যক্তি তাওবা করে সৎকাজের পথ অবলম্বন করে, সে তো আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মতই ফিরে আসো।
৭২) (আর রহমানের বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং কোন বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মত অতিক্রম করে যায়।
৭৩) তাদের যদি তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেয় হয় তাহলে তারা তার প্রতি অন্ধ বধির হয়ে থাকে না।
৭৪) তারা প্রার্থনা করে থাকে, “হে আমাদের রব! আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদেরকে নয়ন শীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকীদের ইমাম।”
৭৫) (এরাই নিজেদের সবরের ফল উন্নত মনজিলের আকারে পাবে। অভিবাদন ও সালাম সহকারে তাদের সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে।
৭৬) তারা সেখানে থাকবে চিরকাল। কী চমৎকার সেই আশ্রয় এবং সেই আবাস!
এছাড়াও কুরআন-হাদীসের বিভিন্ন জায়গায় মুমিনের গুণাবলী সংক্রান্ত যেসব আয়াত ও সহীহ হাদীস রয়েছে, সেগুলো আত্মস্ত করে আমাদের জীবনে বাস্তবায়নের পাশাপাশি ইসলামী বিপ্লব বা দীনকে বিজয়ের প্রকৃত পন্থা ভালোভাবে জেনে নিতে হবে।
বস্তুত ইসলামী আন্দোলন ও অন্য দশটি সাধারণ আন্দোলনের বিজয়ের পথ ও পন্থা এক নয়। সাধারন আন্দোলনের বিজয়ের ক্ষেত্রে নগদ পাওয়ার হাতছানি তাড়িয়ে বেড়ায়। তারা সাময়িক বিজয়ের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যেতে পারলেই খুশি। ভোটের আগের রাতে জনগণের রায় কেড়ে নিয়ে হলেও তাতে কোন অসুবিধা নেই।
সাধারন আন্দোলনের মুখ্য লক্ষ্যই থাকে ক্ষমতায় আরোহণ করা। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ইসলামী আন্দোলন ভোটের আগের রাতে নয় বরঞ্চ ভোটের ১ সপ্তাহ আগেই কিংবা ভোট গ্রহণের সারাদিনই নিজেদের প্রভাবাধীন এলাকায় এক চেটিয়া জালভোট দেয়ার সুযোগ পেলেও জনগণের রায় কেড়ে নিয়ে নোংরা পথে ক্ষমতায় যাওয়াকে কখনই বৈধ মনে করে না। এ ধরনের অবৈধ সুযোগ গ্রহণ করে ক্ষমতায় যাওয়ার কোন চিন্তাই করতে পারে না।
কিন্তু কিছু লোকের হাব-ভাব, কথাবার্তা, আচরণ ও ফেসবুকের স্ট্যাটাসে মনে হয় ইসলামী আন্দোলন নামক এ মহান আন্দোলনও যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার তথাকথিত কৌশল গ্রহণ করুক। দুনিয়ার কোথাও কেউ কোনভাবে ক্ষমতায় চলে এলে এবং কিছুদিন টিকে গেলে এটাকেই মহাসাফল্য বলে শোরগোল করছে।
অথচ তাড়াতাড়ি ও যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যাওয়া ইসলামী আন্দোলনের সাফল্যের মানদন্ড নয়। ইসলামী আন্দোলন এক সর্বব্যাপি সাফল্যের নাম। প্রকৃত অর্থে মহান আল্লাহর মাগফিরাত লাভ করে জান্নাত লাভ করাই হচ্ছে প্রকৃত সফলতা।
এ পর্যায়ে ইসলামী আন্দোলনের বিজয়ের সঠিক কর্মপন্থা নিয়ে আলোকপাত করতে চাই। ইসলামী আন্দোলনের বিজয়ের জন্য প্রধান গুণ হচ্ছে মজবুত ও খাঁটি ঈমান। যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ইসলামী বিপ্লবের সফলতার জন্য যে বৈশিষ্ট্য ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অবশ্যই অর্জন করতে হবে তা হলো- ব্যাপক দাওয়াতী কাজ।
দাওয়াতি কাজকে ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে ব্যাপক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। এ লক্ষ্যে গণসংযোগ করতে হবে। প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করতে হবে। প্রতিবেশী পরিবারগুলোর সাথে দাওয়াত ও কল্যাণের উদ্দেশ্যে সেবামূলক তৎপরতা চালানো দরকার। মৌখিক দাওয়াতের পাশাপাশি চারিত্রিক মাধুর্যতার মাধ্যমে ইসলামের বাস্তব সাক্ষ্য তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
এ ব্যাপারে বানিয়ে জামায়াত সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.) তাঁর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের চরিত্র ও মাধুর্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘খোদার পথে যারা কাজ করবেন তাদেরকে উদার হৃদয় ও বিপুল হিম্মতের অধিকারী, সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিশীল ও মানবতার দরদী, ভদ্র ও কোমল স্বভাবসম্পন্ন, আত্মনির্ভরশীল ও কষ্ট সহিষ্ণু, মিষ্টভাষী ও সদালাপি হতে হবে। তাদের দ্বারা কারো কোন ক্ষতি হবে এমন কোন ধারনাও যেন কেউ পোষণ করতে না পারে। তাদের থেকে কল্যাণ ও উপকার সবাই কামনা করবে। নিজের প্রাপ্যের চাইতে কমের উপর সন্তুষ্ট ও অন্যকে প্রাপ্যের চাইতে বেশী দিতে প্রস্তুত থাকবে। মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দিবে। কমপক্ষে মন্দ দিয়ে দিবে না।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ