ঢাকা, রোববার 12 May 2019, ২৯ বৈশাখ ১৪২৬, ৬ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এক মিলিয়ন সামুদ্রিক পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হুমকিতে পরিযায়ীরাও

স্টাফ রিপোর্টার: বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ শিকার এখন পরিযায়ী পাখিরাও। বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে হাঁস গোত্রীয়রা প্লাস্টিক দূষণের বেশি শিকার হচ্ছে। এর ফলে একদিকে মা পরিযায়ী পাখিদের জীবন যেমন বিপন্ন হচ্ছে তেমনি এদের সন্তানরাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অকালে। মূল গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে ৩০০ মিলিয়ন টনের অধিক প্লাস্টিক সামগ্রী মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক বর্জ্য পচনশীল নয় এবং প্রায় ২০ থেকে ৫০০ বছর ব্যবধানে পচে মাটি বা পানিতে দ্রবীভূত হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে ৯০ শতাংশ সমুদ্রসৈকত পাখির পরিপাকতন্ত্রে প্লাস্টিক কতা পাওয়া গেছে। প্রতি বছর প্রায় ১ মিলিয়ন সামুদ্রিক পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হচ্ছে এবং এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালে ৯৯ শতাংশ পাখির পেটে প্লাস্টিক কতা পাওয়া যাবে।
গতকাল শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জিয়োলজিকেল সোসাইটি, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এই তথ্য প্রকাশ করেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাবেক উপ-প্রধান বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে ও ড. মোহাম্মদ মোস্তাফা ফিরোজ। এসময় উপস্থিত ছিলেন, ড. এম এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি পাখি পর্যবেক্ষক এবং গবেষক ইনাম আল হক প্রমুখ।
ড. তপন কুমার দে বলেন, প্লাস্টিকের ছোট ছোট টুকরা ও কতা পানিতে শ্যাওলাসহ ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং পাখি এগুলো আধার হিসেবে গিলে ফেলে। শ্যাওলাযুক্ত ভাসমান প্লাস্টিক কতা, গন্ধ পাখির খাবারের গন্ধের মত। প্লাস্টিক কতা ভাসমান বিধায় খাদ্যের মত মনে হয়। ধারালো প্লাস্টিক কতা পানিতে ভাসমান অবস্থায় শ্যাওলার আবরণে ঢাকা থাকে এবং ক্ষুধার্ত পাখি খাদ্য গ্রহণের সাথে সাথে প্লাস্টিক কতা পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে এবং পরিপাকনালীর ক্ষতিসাধন করে। ধীরে ধীরে পাখিটি দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়। এ ছাড়া পাখিরা অনেক সময় গভীর পানিতে ডুব দিয়ে খাদ্য সংগ্রহ করে থাকে। এ সময় অনেক পাখি প্লাস্টিক ব্যাগ ও পরিত্যক্ত জালে আটকা পড়ে পানির ওপর উঠতে পারে না এবং মারা যায়।
তিনি আরও বলেন, দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার অনেক বেশি। বিশেষ করে প্লাস্টিক ব্যাগ, পানি বা তৈল জাতীয় পদার্থের বোতল, গ্লাস, থালা ও অন্যান্য সামগ্রী ওজনে কম এবং পরিবহনের সুবিধার কারণে দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যবহারের পরে এসব প্লাস্টিক দ্রব্যাদি যত্রতত্র আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেয়ার কারণে জলজ ও স্থলজ পরিবেশ ব্যাপক হারে দূষিত হচ্ছে। বেশির ভাগ পরিযায়ী পাখির চারণভূমি সমুদ্রসৈকত, নদী, খাল, হাওর-বাঁওড়। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী নালা হয়ে সমুদ্রের তলানিতে জমা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের জানান, পরিযায়ী পাখিরা মূলত এ দেশে আসে খাবারের সন্ধানে। এখানে তাদের বংশ বিস্তারের সুযোগের পাশাপাশি এদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। আর পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র হচ্ছে হাওর-বাঁওড়সহ বিস্তীর্ণ জলাভূমি। কিন্তু এসব জলাভুমি প্লাস্টিক কতায় ভরে গেছে। আর এসব পরিযায়ী পাখি এগুলো গিলছে। তা ছাড়া জলাভূমিতে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমও চলছে। এতে করে একসময় দেশে পরিযায়ী পাখির আগমন হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি পাখি পর্যবেক্ষক এবং গবেষক ইনাম আল হক জানান, বাংলাদেশে গ্রীষ্মেও আসে পরিযায়ী পাখি। বাংলাদেশে শীত গ্রীষ্ম মিলে প্রায় ৪০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসে। এর মধ্যে প্রায় ৩৮০টি শীতকালীন অতিথি পাখি এবং অবশিষ্ট পাখি বছরের অন্য সময় বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশে আসে। তিনি জানান, এখন দেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে এসব পাখি আসে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও এরা আসে বাংলাদেশে। তিনি জানান, এ সময়ে আসে ছয় জাতের পাপিয়া যা কোকিল বলে পরিচিত। এ ছাড়া আসবে তিন জাতের শুমচা। আসবে বামন মাছরাঙা। মোট তিনটি পরিবারের ১০ জাতের পরিযায়ী পাখি আসবে। তিনি জানান, গ্রীষ্মে এ দেশে পরিযায়ী পাখি আসে সাধারণত বংশ বিস্তারের জন্য। এ সময়ে এরা ডিম দেবে, বাচ্চা ফুটিয়ে বড় করে আবার নিজ এলাকায় চলে যাবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ বলেন, পরিযায়ী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্মেলনে বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ। বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২’ অনুসারে পরিযায়ী পাখি রক্ষার কথা বলা হলেও অল্পসংখ্যক মানুষ এ সম্পর্কে অবগত। সাধারণ মানুষের জন্য পরিযায়ী পাখিদের সংরক্ষণের জ্ঞান ও সচেতনতায় বাংলাদেশ সরকারের নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। পরিযায়ী পাখি বিষয়ে পাখি আসার জেলাগুলিতে ব্যাপক বিশেষ কর্মশালা গ্রহণ করা দরকার। পরিযায়ী পাখিদের ওপর প্লাস্টিক দূষণের এমন ভয়াবহ বিপর্যয়ের জানান দিয়েই গতকাল শনিবার পালিত হয় বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় পাখি সুরক্ষায় প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ