ঢাকা, রোববার 12 May 2019, ২৯ বৈশাখ ১৪২৬, ৬ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আসছে ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট

এইচ এম আকতার : আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে পারে ৫ লাখ ২৩ হাজার  কোটি টাকা। বাজেটে ভ্যাট আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। ১ মাস ১৮ দিন বাকি থাকলেও এখনও চূড়ান্ত হয়নি ভ্যাটের স্তর। আগামী উন্নয়ন বাজেটের আকার হতে পারে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। তবে আগামী বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা কমিয়ে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হতে পারে। আর আগামী অর্থবছরে প্রণোদনা বাবদ কৃষি খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
জানা গেছে,  কোন পণ্যে কত ভ্যাট হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। তাই এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে ব্যাবসায়ীদের মধ্যে। একাধিক ভ্যাট হার, টার্নওভার ট্যাক্স ও ভ্যাট অব্যাহতির সীমা বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা কাটেনি। এছাড়া কারা রেয়াত নিতে পারবেন, আর কারা নিতে পারবেন না সেটাও খুব বেশি ভাবাচ্ছে এফবিসিসিআইকে।
নতুন আইনে অনলাইনেই রিটার্ন জমা, কর পরিশোধসহ সব কাজই হবে। এক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করবে, তা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো নির্দেশনা দেয়নি। হিসাব রাখার জন্য কেনা দামে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) মেশিন দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো কোনো ব্যবসায়ী তা হাতে পাননি। এমনকি ইসিআর কেনার দরপত্র প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। এদিকে নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে গত ২ মে এনবিআরে একটি সভা হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা বাতিল করা হয়। এটা নিয়েও অনেকটা হতাশা কাজ করছে এফবিসিসিআইয়ে।
এদিকে গত ৫ মে ভ্যাট আইন নিয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে এফবিসিসিআই। সেখানে ভ্যাট আইন নিয়ে এফবিসিসিআই এর উদ্বেগের মূল বিষয় গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায় কোন পণ্যে ভ্যাটের হার কত হচ্ছেঠ, কম হারগুলোর ক্ষেত্রে রেয়াত নেওয়ার সুযোগ থাকছে কি না, সম্পূরক শুল্ক কোথায় বসানো হ”েছ, কোথায় তুলে নেওয়া হচ্ছে, এতে দেশীয় শিল্পের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে তাই ভাবাচ্ছে এফবিসিসিআইকে। এছাড়া ২০১৭ সালের জুন মাসে ভ্যাট আইন দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। কিন্তু এ সময়ে এ আইন সংশোধনে এনবিআরের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশে নতুন ভ্যাট আইন করার জন্য সুপারিশ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তৎকালীন সরকার আইএমএফের ওই সুপারিশ আমলে নেয়নি। যুক্তি ছিল, অভিন্ন ভ্যাট হার করার সময় আসেনি। এরপর ২০০৯ সালে নতুন সরকার আসার পর আইএমএফ নতুন ভ্যাট আইন করার বিষয়ে আবারও তাগিদ দেয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশকে বর্ধিত ঋণ সহায়তার (ইসিএফ) প্রায় ১০০ কোটি ডলার অনুমোদন করে আইএমএফ। এই ঋণ পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল নতুন ভ্যাট আইন করা। সেই আইনটি এবার বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।
 পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের প্রস্তুতি বৈঠকে এই তথ্য জানিয়েছেন অর্থ সচিব রউফ তালুকদার। এ সপ্তহে বাজেটের আকার চূড়ান্ত হতে পারে।
 পরিকল্পনা সচিব নূরুল আমিন জানান, উন্নয়ন বাজেটের আকার হতে পারে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। বৈঠকে জানানো হয়, এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৫৪ দশমিক ৬৩ ভাগ, টাকার অংকে ৯৬ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।
অনুমতি পেলে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর এ সপ্তহে এনইসি বৈঠকে নতুন অর্থবছরের এডিপি চূড়ান্ত হবে বলে জানানো হয়।
সরকার আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে এবারের বাজেটে ধর্মীয় খাতে ব্যয় বাড়িয়ে প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় একটি করে মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করতে বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে প্রাথমিকভাবে ৪২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রাক্কলন করা হয়েছে। যা চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় চার হাজার ২৯৬ কোটি টাকা বেশি। গত পাঁচ অর্থবছর ধরেই এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ছে। এই খাতের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
অপরদিকে প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় একটি করে মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করতে নেওয়া প্রকল্পে ৬ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি সৌদি আরব সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও তাদের অনীহার কারণে বাংলাদেশ সরকারকে নিজ উদ্যোগে বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রকল্পে বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডিও দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নে বেশি নজর দেওয়া হবে। মসজিদ ও মন্দির সংস্কারেও বরাদ্দ রাখা হবে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়ে পাঠানো ডিও লেটারে জেলা সদরে ৬৪টি, সিটি করপোরেশনে ৫টি ও উপকূলীয় এলাকায় ১৬টিসহ মোট ৮৫টি চারতলা মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। ৪৭৫টি উপজেলায় নির্মাণ করা হবে ৩ তলার মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
আরও জানা গেছে, ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করতে আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ চাওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা করে বরাদ্দ দেবে বলে জানিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব আনিছুর রহমান। তিনি বলেছেন, বরাদ্দ পেলে নির্ধারিত সময়েই সুষ্ঠুভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয় ৩৬৯ কোটি টাকা।
সম্প্রতি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে জানানো হয়, মসজিদগুলো নির্মাণে ৫২১টি স্থান চূড়ান্ত করে প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ৪১৯টি কেন্দ্রের ডিজিটাল সার্ভে করা ছাড়াও সেখানকার মাটি পরীক্ষার কাজও সম্পন্ন করা হয়েছে। এপিপি সম্পন্ন হয়েছে ৩৬৬টি। নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে ১০টি স্থানে। একই সঙ্গে নির্মাণ কাজ শুরুর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে ২১১টির এবং এনওএ ইস্যু করা হয়েছে ১০৭টির।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ডিও লেটারে আরও বলা হয়েছে, ব্যয়ের অন্যান্য খাতের মধ্যে গোপালগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্স স্থাপনে ব্যয় ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা, মসজিদ পাঠাগার সম্প্রসারণ ও শক্তিশালী প্রকল্পে ব্যয় ১০ কোটি টাকা, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা ব্যয় ৩৮০ কোটি টাকা, ইসলামিক পুস্তক প্রকাশনা কার্যক্রমে ব্যয় ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা, মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যয় ৬২ কোটি টাকা, প্যাগোডাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্পে ব্যয় ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পে ব্যয় ২৪ কোটি টাকা। অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে আরও প্রায় ৪৩ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, আগামী বাজেটে ভর্তুকি খাতে প্রাক্কলিত বরাদ্দের পরিমাণ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রণোদনা খাতে প্রাক্কলিত বরাদ্দের পরিমাণ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং রফতানি উৎসাহিত করতে নগদ প্রণোদনাও রাখা হচ্ছে চার হাজার কোটি টাকা। আর পাট খাতের জন্য ৫০০ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করছে অর্থ বিভাগ। নগদ ঋণ খাতে আসন্ন বাজেটে পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
সাধারণত, ভর্তুকি ও প্রণোদনা বেশি দেওয়া হয় কৃষি ও খাদ্য খাতে। আর প্রণোদনা বেশি দেওয়া হয় কৃষি, তৈরি পোশাক রফতানি ও পাট খাতে। নগদ ঋণ দেওয়া হয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) অন্যান্য সংস্থাকে। আগামী অর্থবছরে প্রণোদনা বাবদ কৃষি খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
২০১৮-১৯ অর্থ বছরের তুলনায় ১০০ কোটি টাকা কমিয়ে আগামী বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি বছর এই খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। খাদ্যে ভর্তুকির পরিমাণ ধরা হচ্ছে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য খাতের জন্য ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ