ঢাকা, রোববার 12 May 2019, ২৯ বৈশাখ ১৪২৬, ৬ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

তাকওয়া অর্জনে সিয়াম সাধনার ভূমিকা

মনসুর আহমদ : সিয়াম কে আলাহ তার বান্দাদের উপরে ফরয করেছেন যেন সিয়াম পালনের মাধ্যমে তার বান্দাহ তাকওয়ার গুণে বিভূষিত হতে পারে। কোরআন পাকে এরশাদ হচ্ছে : “ইয়া আইউহালাজীনা আমানু কুতিবা আলাইকুমুস্ সিয়ামু কামা কুতিবা আলালাজিনা মিন কাবলিকুম লালাকুম তাত্তাকুন-হে ঈমানদার লোকেরা, তোমাদের প্রতি সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য এই আশায় যে তোমরা তাকওয়া সম্পন্ন হবে।” এ আয়াতে “তোমাদের পূর্ববর্তী লোক” বলে আহলি কিতাব লোকদেরকে বুঝান হয়েছে বলে মুজাহিদ ও কাতাদাহ বর্ণনা করেন। এ আয়াতে সিয়ামের পরিচিত নিয়ম কানুনও কিছু বলে দেয়া হয়নি বা তা কি কি ভাবে অর্জিত হবে তাও স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়নি। আমরা বর্তমানে যে নিয়মে সিয়াম পালন করি তা সংশোধিত রূপ। আবদুর রহমান ইবনে আবু লায়লা হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন’ সিয়ামের উপর দিয়ে তিনটি অবস্থা অতিবাহিত হয়েছে। নবী করীম [সঃ] মদীনায় উপস্থিত হয়ে প্রথমে প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযা চালু করেন। আর সেই সাথে চালু করেন আশুরার রোযা। পরে অল্লাহ নাজিল করেন ‘কুতিবা আলাইকুমুস্। -তাত্তাকুন, আয়াত খানা।
রোযা দুই প্রকারের। এক-আভিধানিক রোযা, আর দ্বিতীয়-শরীয়তের পারিভাষিক রোযা। আভিধানিক রোযার মূল হলো ‘আল ইমসাক’ নিজকে বিরত রাখা। তা পানাহার থেকে বিরত হোক বা অন্য কিছু থেকে। সব ধরনের বিরত রাখাই এর অর্থ। আর আভিধানিক অর্থে তা-ই হচ্ছে সওম বা রোযা। সিয়ামের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিরত রাখা। শরীয়তী পরিভাষার সওম সবকিছু থেকে বিরত থাকার অর্থে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আর শরীয়তের পরিভাষায় ‘সিয়াম’ হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের বিরত থাকার অর্থে। তা হলো পানাহার ও অনুরূপ কার্য এবং স্ত্রী সঙ্গম থেকে রোযার দিনের বেলা বিরত থাকা। এই তিনটি জিনিস থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে শরিয়তী রোযা পালন। আর তা হতে হবে আলাহর নৈকট্য লাভের নিয়তে বা ফরয হিসাবে।
রোযা সহীহ হতে পারে না নিয়ত না  হওয়ার কারণে। আর বিবেক বুদ্ধির পূর্ণতা না হলে নিয়ত ও ইচ্ছাটা পরিপক্ক হতে পারে না।  নিয়ত রোযা সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত এ কারণে যে, শরীয়ত সম্মত রোযা হতে তখন, যদি রোযাদার তার রোযা পালনের মাধ্যমে আলাহর নৈকট্য অর্জনে ইচ্ছুক হয়। আর নিয়ত ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হতে পারে না।
আমরা আল্লাহর বান্দাহ হিসাবে রমযানের দিনে নিজদেরকে বিরত রাখি। এ তো সেই রোযা যার কথা আলাহ বলেছেন এ আয়াতে-ছুম্মা আতেম্মুস্ সিয়ামু ইলাল লাইলি। আর আলাহর কথা : ফামান শাহেদা মিনকুমুশ্ শাহরা ফাল ইয়াসুম হু-তে যে রোযা রাখতে বলা হয়েছে, তা যেমন অভিধানিক অর্থের রোযা, তা শরিয়তের পারিভাষিক রোযাও।
তাকওয়া কি? তাকওয়ার আভিধানিক অর্থ দূরে থাকা, বেচে থাকা; সতর্কতা অবলম্বন করা ও আল্লাহর ভয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, তাকওয়া হল আলাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় সমূহ থেকে দূরে থাকা এবং তার আদেশ সমূহ মেনে চলা। আল্লামা বায়যাবী বলেন, আল্লাহর আদেশ পালন এবং নিষেধ বর্জনের মাধ্যমে তাকে ভয় করাই হল তাকওয়া।
‘আল্লাহ বলে দিয়েছেন, তাকওয়ার শর্ত হচ্ছে আল্লাহর আদেশের আনুকুল্য সন্ধান। ফরয রোযার জন্য রোযাদারের মুত্তাকী হওয়া শর্ত। তা নিয়ত ছাড়া পাওয়া যেতে পারে না। কেননা তাকওয়া আল্লাহর আদেশের আনুকুল্য  সন্ধান ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। সে জন্য মনে স্পষ্ট তীব্র ইচ্ছা ও বাসনা জাগতে হবে। আল্লাহ বলেছেন : ‘লোকদেরকে কেবল মাত্র এই আদেশই দেওয়া হয়েছে যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে আনুগত্যকে একমাত্র তারই জন্য খালেস করে।’  রোযা শরীরের পবিত্রতা আনে ও শয়তানের পথগুলি সংকীর্ণ করে।
আর দীনকে তারই জন্য খালিস করা সম্ভব ইবাদত দ্বারা  শুধু তাকে পাওয়ার ইচ্ছা হলে, তারই সন্তুষ্টি পাওয়ার আগ্রহী হলে এবং তাকে ছাড়া অন্য কাউকে পাওয়ার ইচ্ছা আদপেই না হলে। নিয়তের সাহায্যে ফরয ইবাদত সমূহ সহীহ হওয়ার প্রাসঙ্গিক মৌলনীতি হচ্ছে এগুলি-ই। মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাপারে কোন মতদ্বৈততা নেই যে, সালাত, যাকাত, হজ্জ ও কাফ্ফারা ইত্যাদির শর্ত হচ্ছে সেজন্য নিয়ত জাগিয়ে তোলা। কেননা ফরয সমূহ তো উদ্দেশ্যমূলক, শুধু ফরয কাজটা করে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। অতএব রোযা কাজটির হুকুম এই ইলতের দরুনই লক্ষ্যভুক্ত’..
মুসলিম উম্মাহ সম্পূর্ণ একমত যে, প্রত্যেকটি রোযা ব্যক্তির যিম্মায় ফরয। অতএব তার সহীহ হওয়ার জন্য নিয়ত করা শর্ত। [আহকামুল কোরআন]
রোযার আহকামে বর্ণনার মাঝে আল্লাহ তায়ালা দোয়ার আয়াত ‘উজিবু দাওয়াতাদ্ দায়ে ইযা দায়ানা ..’ নাযিল করে রোযার মাসে বেশি দোয়া করার জন্য উৎসাহ প্রদান করছেন।  হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে ঃ এই মাসেই আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরামের উপরেও গ্রন্থ অবতীর্ণ করেন। রসুলুল্লাহে সঃ বলেছেন ঃ সহীফায়ে ইবরাহীম রমযানের প্রথম তারিখে, তওরাত রমযানের ছয় তারিখে, ইঞ্জিল রমযানের তের তারিখে ও কোরআন রমযানের চব্বিশ তারিখে অবতীর্ণ হয়। মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে রসুলুলাহ সঃ রমযান মাসে বের হন এবং চলতে চলতে যখন “কাদীদ” নামক স্থানে পৌছেন তখন তিনি রোযা ছেড়ে দেন এবং অন্যান্য লোকদেরকেও রোযা ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। রসুল [স.] এরশাদ করেন : যে রমযানে মাসের রোযা বিশ্বাস ও ইয়াকিনের সাথে রাখবে, তার অতীতের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
মানুষের অভ্যন্তরীণ পাশব প্রবৃত্তি মানুষকে মানবিক পূর্ণতায় পৌছতে বাধা সৃষ্টি করে। আর সে কারণে সে ফেরেশতা স্বভাবের অনুগামী হতে পারে না। মানুষের ফেরেশতা স্বভাবকে জোরদার এবং পশু স্বভাবকে দুর্বল করে তোলে রোয আত্মার পবিত্রতা ও প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রোযার চেয়ে ফলপ্রসু কোন আমল নেই। “যখন কোন লোক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ও তার খারাপ প্রভাব দূর করতে চায়, তখন নমুনার জগতে তার এ প্রয়াশের একটি পবিত্র নকশা তৈরী হয়ে যায়। তখন কিছু পুণ্যাত্মা সাধকের সে দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। ফলে অদৃশ্য জগত থেকে সে জ্ঞানগত সাহায্য পেয়ে থাকে। এ ভাবে পবিত্র নকশা ও পুন্যাত্মার সহযোগে যে এক পূণ্যময় পরিম-ল সৃষ্টি হয় তাতে সেই ব্যক্তি আল্লাহর নেকট্য লাভ করে।” [হুজ্জাতুলাহিল বালিগা] সিয়াম সাধনার ফলে মানবিক প্রবৃত্তি পশুপ্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে উচ্চ পরিষদ থেকে সাধ্যানুসারে দ্যুতিময় হয়ে থাকে। তার ফলে ভাল কাজের প্রেরণা ও প্রীতি ও মানসিক শান্তি ও স্বস্তি দেখা দেয়। ফলে তার মাঝে ধীরে ধীরে তাকওয়ার বৈশিষ্ট্য পয়দা হয়ে থাকে।
“দোস্তির রাহে এক পা বাড়িয়ে
এগিয়ে যাওয়া যে ভাই
শুদ্ধির ভারী বোঝার চেয়েও পবিত্রতর পাই।” [যবুর- ই- আজম] ‘
‘বুদ্ধি কখন আত্ম-বিরোধী উক্তিকে চূড়ান্ত বলে মেনে নিতে পারে না। তবে যুক্তিউর্ধ্ব-স্বজ্ঞার প্রতি তাদের আনুগত্যে  বুদ্ধিগত আদর্শ বর্তমান রয়েছে। স্বাধীন ইচ্ছা জ্ঞানের ব্যাপারে বুদ্ধি কর্তৃক আরোপিত শর্ত দ্বারা সীমাদ্ধ নয়। ইচ্ছা শক্তি বুদ্ধিকে স্থায়ী ভাবে হতবুদ্ধি করতে পারে না।’
কতক লোক সিয়াম পালন করেও তাদের সিয়ামের ফায়দা বলতে পিপাসা বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু লাভ হয়না। আর কতক লোক সারারাত সালাতে দাড়িয়ে থাকে। তারা সালাতের ফায়দা বলতে রাত জাগরণ ভিন্ন আর কিছু পায়না।  মহানবী স. বলেছেন : “দরবেশী হালে চললে মানসিকতা পাপপুর্ণ, তাকে আল্লাহ শুধু মন্দ প্রতিদানই দেবেন।” ওমর ইবনুল খাত্তাব বলেছেন : রসুল স. বলেছেন : কাজ হলো ইচ্ছা বা পরিকল্পনার পরিণতি। যে কোন কাজের উদ্দেশ্য অনুযায়ী তার ফল লাভ করে থাকে।”
আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্তরায় পাশব প্রবৃত্তি থেকে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে সিয়াম সাধনা। ধর্মাভ্যাস ও আধ্যত্মিক সাধনা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌছে দেয়। কিন্তু যাদি কেউ ডাক্তারের পরামর্শে বা অন্য কোন কারণে জাগতিক উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন কওে তা হলে তার ধর্মীয় অনুশাসন মানা হল না, আর সে কারণে সে আধ্যাত্মিক ফায়দা থেকে বঞ্চিত হবে। আল্লাহ প্রদত্ত রেজেক থেকে যেমন এক দশমাংশ [ওশর] দান করতে হয়, তেমনি একজন মুমিন প্রতি বছরের এক দশমাংশ রোযা রেখে সারা বছর উপভোগের যাকাত দিয়ে জীবন কালকে পবিত্র করে তোলে। দেহকে আত্মারনিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দৈহিক শক্তিকে দুর্বল করে আত্মার শক্তিকে বাড়িয়ে তুলতে হয়। আর এ জন্য ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও যৌনতা দাবী পরিহার জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ ও কলবে সুচিন্তার চর্চা ও দ্বিতীয় কোন মাধ্যম নিশ্চিত ফলপ্রসু নয় আর তা অর্জন সম্ভব হয় একমাত্র সিয়াম সাধনার মাধ্যমে। খাদ্যপানীয় গ্রহণ যেমন ফেরেশতার অভ্যাস নয়। তেমনি রোযার মাধ্যমে খাদ্য-পানীয় ত্যাগ করে মানুষ ফেরেশতার চরিত্রালোকে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফলে সে খোদার নৈকট্য অর্জন করে তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়; আর তাই হল মানব জীবনের চরম লক্ষ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ