ঢাকা, সোমবার 13 May 2019, ৩০ বৈশাখ ১৪২৬, ৭ রমযান ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এরশাদ এবং মধ্য রাতের নাটক

আশিকুল হামিদ : তীব্র সংকট তো চলছেই, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অনিশ্চয়তারও সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতিতে সংকট ও অনিশ্চয়তার কোনোটিই অস্বাভাবিক নয় সত্য, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে একটি বিশেষ কারণে। সে কারণটি আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বাত্মক আধিপত্য। সরকার সকল বিষয়েই দেশকে নিজের ইচ্ছাধীন করে ফেলেছে। ক্ষমতাসীনরা কেবল রাতের অন্ধকারে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলার অবিশ্বাস্য কর্মকান্ডে নির্লজ্জ পারঙ্গমতা দেখাচ্ছেন না, রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর মধ্যে ভাঙন ঘটানোর ব্যাপারেও তারা নিত্যনতুন চমক দেখিয়ে চলেছেন।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দলগুলো তো বটেই, ক্ষমতাসীনদের কূটিল কৌশলের শিকার হয়েছে এমনকি দশম সংসদে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে আসা দল জাতীয় পার্টিও। দলটির চেয়ারম্যান এবং সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেকটা ‘ঘণ্টায় ঘণ্টায়’ সিদ্ধান্ত পাল্টে চলেছেন। সর্বশেষ ঘটনায় তিনি তার প্রথম স্ত্রী এবং এতদিন পর্যন্ত  দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে নিয়োজিত রওশন এরশাদকে সরিয়ে দিয়ে তার স্থলে নিযুক্তি দিয়েছেন নিজের ভাই জিএম কাদেরকে। জেনারেল এরশাদের এ পদক্ষেপটিকে গণমাধ্যমের খবরে ‘মধ্যরাতের নাটক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বলা হচ্ছে, রওশন এরশাদকে একেবারে ছাঁটাই বা বিদায় না করা হলেও জিএম কাদেরকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে পদোন্নতি দিয়েছেন এরশাদ। গত ৪ মে মধ্যরাতে নিজের বাসভবনে জরুরিভাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরকে এরশাদ শুধু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধী দলের উপনেতার পদে নিযুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তই জানাননি, একই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, তার অবর্তমানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানও হবেন জিএম কাদের। এ প্রসঙ্গে কৌতূহলোদ্দীপক অন্য কিছু তথ্যও জানা গেছে গণমাধ্যমের খবরে। তেমন একটি খবরে জানানো হয়েছে, এরশাদের বার্ধক্য ও মারাত্মক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে জিএম কাদের আসলে নাকি ‘মিডনাইট ক্যু’ বা মধ্যরাতের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন- যেভাবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ নিজেও অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। দু’জনের মধ্যে পার্থক্য হলো, আওয়ামী লীগের অঘোষিত সমর্থনে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পাশাপাশি একই সঙ্গে গণতন্ত্রেরও সর্বনাশ ঘটিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিলেন এরশাদ। অন্যদিকে জিএম কাদের দখল করেছেন জাতীয় পার্টির সকল ক্ষমতা। এরশাদের সামনে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল বিএনপি, আর জিএম কাদেরের প্রধান এবং একমাত্র প্রতিপক্ষ হলেন রওশন এরশাদ। বলা যায় না, সবকিছু ‘ঠিকঠাক’ না চললে আওয়ামী লীগ সরকারও রওশন এরশাদের পক্ষ নিতে পারে।
জাতীয় পার্টি এবং এরশাদকে বিষয়বস্তু বানানোর পেছনে কিছু বিশেষ কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্য নেতার নাম বলতে বলা  হলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম না বলে উপায় পাওয়া যাবে না। অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখলকারী এই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেই ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ‘বড় সাধের’ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। দীর্ঘ সে আন্দোলনের কথা স্মরণ করলে পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই মুহূর্তের পরিস্থিতি এবং নিকট ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তো অনেক বেশি আশংকাজনক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশাধনী পাস করা থেকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বিরোধী দলের দাবি এবং তার বিপরীতে ক্ষমতাসীনদের অনমনীয়তাসহ বিভিন্ন কারণের নিশ্চয়ই বিস্তারিত উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। সেই সাথে মাত্র মাস চারেক আগে, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে যেভাবে ভোটের বাক্স ভরে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে সেকথা স্মরণ করলে তো গণতন্ত্রের কফিনই সামনে এসে যাবে। এক কথায় বলা যায়, রাজনীতি যেভাবে এগোচ্ছে তার ফলে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় শুধু বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি বাড়ছে গুজবের ডালাপালা।
নিবন্ধের বিষয়বস্তুও জেনারেল (অব.) এরশাদকে একই কারণে বানাতে হয়েছে। এরশাদ শুধু গণতন্ত্র হত্যাকারী ও সাবেক স্বৈরশাসক নন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী মহাজোটের দ্বিতীয় প্রধান শরিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানও। এজন্যই তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটা অনুচিত, যেগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে তার বহুবার উচ্চারিত একটি ঘোষণা- যার মূলকথা হলো, দেশে সংসদ নির্বাচন হলে তার দল জাতীয় পার্টিই ক্ষমতায় আসবে। আসবেও এককভাবেই। উল্লেখ্য, এই ঘোষণা তিনি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রাক্কালে যেমন, ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালেও তেমনি দিয়েছেন। যদিও এবার তার কণ্ঠে আর আগের মতো তেজ বা দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যায়নি।
এর একটি কারণ হিসেবে পর্যবেক্ষকরা ২০১৪ সালের নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে ঢাকায় আগত ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং-এর বহুল আলোচিত ধমকের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জানা যায়, শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার এরশাদকে সেবার রাতারাতি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল সিএমএইচে ভর্তি করা হয়েছিল, যাতে তিনি সুজাতা সিং-এর ‘পরামর্শ’ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন এবং যাতে তার পক্ষে নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া সম্ভব না হয়। এসব তথ্যও পর্যবেক্ষকরাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। 
এই ‘ওষুধে’ কাজও হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি শুধু অংশই নেয়নি, সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থানও অর্জন করেছিল। তবে ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের ‘কপাল’ সম্পূর্ণ খোলেনি। কারণ, নিজে প্রার্থী হলেও নির্বাচনের দিনও তাকে সিএমএইচে কঠোরভাবে প্রহরাধীন রাখা হয়েছিল। দশম জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথও তাকে দলের অন্যদের সঙ্গে নিতে দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এরশাদের ‘ফার্স্ট লেডি’ রওশনসহ ২৮৪ জন ‘নবনির্বাচিত’ সংসদ সদস্য যেখানে দল বেঁধে ৯ জানুয়ারি শপথ নিয়েছিলেন, এরশাদ সেখানে শপথ নেয়ার কম্মটুকু সারার সুযোগ পেয়েছিলেন ১১ জানুয়ারি। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাকে অবশ্য আলাদা মর্যাদা দিয়েই শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছিলেন।
সংসদ সদস্য হলে যে কেউ শপথ নেবেন- এটা স্বাভাবিক হলেও সাবেক এই স্বৈরশাসকের শপথ নেয়ার খবরটুকুকে পৃথকভাবে উল্লেখের বিশেষ কারণ হলো, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে অনেক নাটকীয়তা করেছিলেন তিনি। আওয়ামী মহাজোটের দ্বিতীয় প্রধান দলের চেয়ারম্যান হলেও এবং তার দলের কয়েকজন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনের প্রাক্কালে গঠিত ‘সর্বদলীয়’ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার পদে নিযুক্তি নিলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন এরশাদ। তিনি সেই সাথে জাপা’র যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তাদের উদ্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ জারি করেছিলেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের বলেছিলেন পদত্যাগ করতে। হঠাৎ নেয়া সিদ্ধান্তের কারণ জানাতে গিয়ে এরশাদ বলেছিলেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না সেহেতু দশম সংসদের এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না বরং একতরফা নির্বাচন হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হবে। নির্বাচন বাতিলের এবং নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্যও দাবি জানিয়েছিলেন এরশাদ। দেশজুড়ে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ আন্দোলনের কথাও বলেছিলেন তিনিÑ যদিও এই তথ্যের উল্লেখ করেননি যে, লালমনিরহাটে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে তার ভাই ও শেখ হাসিনার মন্ত্রী জি এম কাদেরের দিকে জুতা ছুঁড়েছিল সাধারণ মানুষ।
আওয়ামী লীগের পর জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণকারী একমাত্র বড় দল হওয়ায় এরশাদের এই বর্জনের ঘোষণায় আলোড়ন উঠেছিল। তার নির্দেশে দুইশ’র বেশি দলীয় প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারও করেছিলেন। এরশাদ নিজেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সশরীরে উপস্থিত না হওয়াসহ কিছু ‘টেকনিক্যাল’ কারণ দেখিয়ে তার সে আবেদন বাতিল করা হয়েছিল। ফলে এরশাদ নিজে না চাইলেও লালমনিরহাটে তিনি প্রার্থী হিসেবে থেকে গিয়েছিলেন। সেখানেই তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে ‘জুতা থেরাপি’র শিকার হয়েছিলেন এরশাদের ভাই এবং ‘সর্বদলীয়’ সরকারের মন্ত্রী জিএম কাদের।
কথা শুধু এটুকুই নয়। শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরশাদকে ঢাকার একটি আসন ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেখানে এরশাদ আগেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচত হয়েছিলেন। অর্থাৎ এরশাদও সেঞ্চুরি হাঁকানো ১৫৪ জনের একজন ছিলেন। সেবার এরশাদ এবং জাতীয় পার্টিকেন্দ্রিক নাটক জমে ওঠার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন রওশন এরশাদ। অনেকটা আকস্মিকভাবে পর্দার অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। শোনা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বোঝাপড়া করে এবং গাঁটছড়া বেঁধেই জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে দেননি রওশন। চিকিৎসার নামে এরশাদকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে বন্দী করার পর রওশনই দলের গুরুত্বপূর্র্ণ সব নেতাকে পরিচালনা করেছেন। তারা সবাই মিলে চেয়ারম্যান এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনের মাঠে থেকে গেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন। এভাবেই শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ৩৫ আসনে বিজয়ী হয়েছিল। বিজয়ী এই এমপিরাই ৯ জানুয়ারি শপথ নিয়েছিলেন। বাকি ছিলেন শুধু এরশাদ। তাকেও একদিন পর শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়েছিল।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়া থেকে শপথ বাক্য পাঠ করা পর্যন্ত দৃশ্যত নাটকীয়তা যথেষ্ট থাকলেও জনগণ কিন্তু এরশাদকে বিশ্বাস করতে পারেনি। এর কারণ, সাবেক এই স্বৈরশাসক সময়ে সময়ে আরো অনেক নাটক করেছেন, কুখ্যাত হয়ে উঠেছেন তার ‘ডিগবাজির’ জন্য। যেমন একবার এরশাদ বলেছিলেন, সরকারকে ‘যথাসময়ে অ্যাটাক’ করবেন তিনি। কথাটার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এরশাদ বলেছিলেন, মহাজোট থেকে তিনি বেরিয়ে যাবেন এবং আগামী নির্বাচনে তার দল এককভাবে তিনশ আসনে প্রার্থী দেবে। এরশাদ বোঝাতে চেয়েছিলেন, জাতীয় পার্টি একাই সরকার গঠন করতে পারবে। কথাটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য নিজের বুকের ওপর আঙুল ঠেকিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাকে ছাড়া নাকি জনগণের উপায় নেই!
এরপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কিছুদিন আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তিনি এমনকি বেহেশতেও যাবেন না এবং বিএনপি না এলে একতরফা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এ ধরনের চটকদার ও বাহারী কথাবার্তা ও ঘোষণার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনের লাইমলাইটেও এসেছিলেন এরশাদ। কিন্তু মাস না পেরোতেই রাতারাতি ভোল পাল্টে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ‘সর্বদলীয়’ সরকারে ঢুকে পড়েছিলেন। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী যে আটজনকে মন্ত্রিসভায় নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে এরশাদ একাই পেয়েছিলেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পাঁচটি পদ। তার দলের একজন উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। এরশাদের ভাই জি এম কাদেরও মন্ত্রীর পদে বহাল থেকেছেন। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, কত বেশিজনকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করা হবে তা নিয়েই এতদিন দরকষাকষি করেছেন এরশাদ। শেখ হাসিনাও যথেষ্ট লম্বা মুলাই ঝুলিয়েছিলেন। সেজন্যই বেহেশতের কথা ভুলে বঙ্গভবনে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন এরশাদ। বলা হয়েছিল, এটা তার আরও একটি ‘ডিগবাজি’।
এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনার কারণেই সংসদ সদস্য হিসেবে এরশাদের শপথ বাক্য পাঠ করার বিষয়টিও ‘ডিগবাজি’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। ‘ডিগবাজি’ তিনি আরো কয়েকবারও খেয়েছেন। কিন্তু একটি বিষয়ে পেরে ওঠেননি এরশাদ। সেখানে কঠিন প্রতিবন্ধক হয়ে থেকেছেন তারই এককালের ‘ফার্স্ট লেডি’ রওশন এরশাদ। সংসদে বিরোধী দলের নেতার আসন থেকে বহু চেষ্টা করেও রওশনকে সরাতে পারেননি এরশাদ। এ ব্যাপারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রওশনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সে কারণে রওশন এবং এরশাদের মধ্যে প্রকাশ্যে সংঘাত হয়েছে। রওশন এমনকি জাতীয় পার্টির নেতৃত্বও দখল করতে চয়েছেন বলে প্রচারণা রয়েছে। কখনো দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে দেখা গেছে তাকে। কখনো আবার এমন ঘোষণাও প্রচারিত হয়েছে যে, এরশাদের অবর্তমানে রওশনই হবেন জাতীয় পার্টির সর্বেসর্বা। এক্ষেত্রে রাজনীতির পাশাপাশি অর্থবিত্ত তথা সম্পত্তির কথাও শোনা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, রওশন নাকি স্বামী এরশাদের সমুদয় অর্থসম্পত্তি দখল করতে চাচ্ছেন! স্বক্ষর জাল করার মতো বিভিন্ন খবর শুনিয়ে এরশাদ নিজেও আসর জমিয়ে তুলেছেন।
এমন এক অনিশ্চিত ও রহস্যপূর্ণ অবস্থার মধ্যে হঠাৎ এক রাতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে জিএম কাদেরকে উত্তরসুরি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন বলেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। কারণ, ক্ষমতার অন্য দাবিদার রওশন এরশাদকে ওই সংবাদ সম্মেলেনে দেখা যায়নি। দলীয় রাজনীতিতেও তাকে দেখা যাচ্ছে না বেশ ক’দিন ধরে। এরই মধ্যে কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়া রওশনের স্থলে জিএম কাদেরকে নিজের উত্তরসুরি বানানোর মধ্য দিয়ে এরশাদ একই ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে সব সময় বেশি খেলেছেন বলেই জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে চাইলেও এবং চেষ্টা করলেও এরশাদের পক্ষে আর খেলা সম্ভব নয়।
কারণ, শুধু বয়সের ভারেই ন্যূব্জ হয়ে পড়েননি তিনি, রোগাক্রান্তও হয়েছেন মারাত্মকভাবে। এখন তাই তার পক্ষে আর রাজনৈতিক অর্থে খেলাধুলা করা সম্ভব নয়। সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে যারা তাকে দেখেছেন তাদের সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, এরশাদের দিন আসলেও শেষ হয়ে এসেছে। জীবনের বর্তমান পর্যায়ে তার দরকার ছিল এমন একজন কিংবা কয়েকজন নেতা ও সহযোগীর, যারা জাতীয় পার্টিকে এরশাদের চিন্তাধারা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু দলের ভেতরে স্বৈরতান্ত্রিক কর্মকান্ড চালানোর মাধ্যমে এরশাদ নিজেই তেমন সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছেন। এখন জাতীয় পার্টির সামনে ভাঙন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। কারণ, এরশাদ মনোনীত জিএম কাদেরকে রওশন এবং তার সমর্থকরা মেনে নেবেন না। অন্যদিকে জিএম কাদেরের লোকজনও রওশনের নেতৃত্ব ও আদেশ মেনে নিতে সম্মত হবেন না। পরিণতিতে ভাঙন ঘটবে জাতীয় পার্টিতে।
দুটি তো বটেই, তারও বেশি দল গঠিত হতে পারে একই জাতীয় পার্টি নাম নিয়ে। এটাই অবশ্য এরশাদের মতো একজন সাবেক স্বৈরশাসক এবং গণতন্ত্র হত্যাকারীর জন্য স্বাভাবিক প্রাপ্য!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ